কভিড মহামারীর কারণে দেশ লকডাউনে গেলে মানুষ বাধ্য হয়েই অনলাইন কেনাকাটায় ঝুঁকে পড়ে। এতে জনপ্রিয় হতে থাকে ই-কমার্স খাত। কিন্তু গত বছরের জুলাই থেকে ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, কিউকম, ধামাকা শপিং ও দালাল প্লাসের মতো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতারণার বিষয়টি সামনে আসতে থাকে। এতে এই খাত থেকে আস্থা হারান গ্রাহকরা। কিন্তু সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ ও আইনের কারণে সুরক্ষা বাড়ায় আস্থা ফিরতে শুরু করায় ই-কমার্সে কেনাবেচা বাড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ই-কমার্সে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৭২ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ৭৭২ কোটি টাকা। সে হিসাবে বছরের ব্যবধানে ই-কমার্সে লেনদেন বেড়েছে ৩০০ কোটি টাকা। আর ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই লেনদেনের পরিমাণ ছিল মাত্র ২৪৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন বছরের ব্যবধানে ই-কমার্সে লেনদেন বেড়েছে ৩৩৪ শতাংশ।
জানা যায়, মুন্সিব্জি ডটকমের হাত ধরে ২০০০ সালে দেশে ই-কমার্সের যাত্রা শুরু হয়। ২০০৯ সাল থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অভিযাত্রায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সুবিধা শহর থেকে গ্রামেও বিস্তৃত হলে ই-কমার্সের সম্প্রসারণ হয়। এ সময় সেলবাজার ডটকম, এখানেই ডটকমসহ বেশ কটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান দেশে অনলাইন কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত হয়। কিন্তু ইন্টারনেটের গতি কম থাকাসহ নানা কারণে এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। পরে ২০১২ সালে বিক্রয় ডটকম ও ২০১৪ সালে দারাজের মতো প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের হাত ধরেই দেশে ই-কমার্স ব্যবসা এগিয়ে যায়।
২০২০ সালে কভিড-পরবর্তী সময়ে মানুষ বাধ্য হয়েই ই-কমার্সে ঝুঁকে। এতে খাতটি জনপ্রিয় হতে শুরু করে। এ সময় ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, কিউকম, ধামাকা শপিং ও দালাল প্লাসের মতো প্রতিষ্ঠান অস্বাভাবিক ডিসকাউন্টের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি শুরু করে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর কেনাকাটা বাড়ে কয়েক গুণ। আর এ সুযোগেই প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা শুরু করে। অধিক ক্রয়াদেশ নিলেও গ্রাহকদের পণ্য সরবরাহে ব্যর্থ হয় প্রতিষ্ঠানগুলো। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার হস্তক্ষেপ করে। গ্রেপ্তার হতে থাকেন একে একে প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যুক্ত কর্তাব্যক্তিরা। আর জনপ্রিয়তা হারায় দেশের ই-কমার্স খাত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২১ সালের জুনে ই-কমার্সে লেনদেন বেড়ে রেকর্ড ১ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা হয়েছিল। কিন্তু ই-কমার্স প্রতারণার প্রভাবে এক মাসের ব্যবধানে তা কমে দাঁড়ায় ৭৪২ কোটি টাকায়। তবে সরকারের ডিজিটাল কমার্স আইন ২০২১ প্রণয়নের পর গত বছরের এপ্রিলে আবার হাজার কোটির মাইলফলক স্পর্শ করে এই খাতের বেচাকেনা। ধীরে ধীরে ওই প্রতারণার প্রভাব কমে এ খাতের আস্থা ফিরছে।
খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ই-কমার্সে সরকারের বিশেষ নজরের কারণে প্রতারণা অনেকটাই কমে এসেছে। এ ছাড়া ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকের কাছ থেকে সংগ্রহ করা অর্থ নিজস্ব সেটেলমেন্ট হিসেবে নেওয়াসহ নানা নীতির কারণে এই খাতে আস্থা ফিরছে মানুষের। গ্রাহকদের আগ্রহ যদি বাড়তে থাকে তাহলে এই খাত আরও বড় হবে বলেও মনে করেছেন তারা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছরের এপ্রিলে ই-কমার্সের লেনদেন হাজার কোটি টাকার মাইলফলক স্পর্শের পর থেকে মাত্র দুই চার অঙ্কের নিচে নেমেছে। অর্থাৎ ২০২২ সালের মে আর জুলাই মাস বাদ দিলে প্রতি মাসেই হাজার কোটি টাকার ওপরে লেনদেন হচ্ছে ই-কমার্সে। গত বছরের মে মাসে লেনদেন হয়েছিল ৮৬৭ কোটি টাকা। এর পরের মাস ১০৩ কোটি টাকা আর জুলাইতে ছিল ৯৯২ কোটি টাকা। এ ছাড়া আগস্টে ১ হাজার ৪১ কোটি, সেপ্টেম্বরে ১ হাজার ৮৬ কোটি, অক্টোবরে ১ হাজার ১৩৫ কোটি, নভেম্বরে ১ হাজার ১৬২ কোটি, ডিসেম্বরে ১ হাজার ১৩০ কোটি, জানুয়ারিতে ১ হাজার ১৭৯ কোটি এবং সর্বশেষ ফেব্রুয়ারিতে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৭২ কোটি টাকা।
২০২১ সালে ই-কমার্স খাতে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য বেরিয়ে এলে এই খাতে গ্রাহকদের আস্থাহীনতা তৈরি হয়। অনেক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অগ্রিম টাকা নিয়ে দীর্ঘদিনেও পণ্য বা সেবা সরবরাহ করছে না। এ নিয়ে নানা বিতর্কের মুখে ২০২১ সালের জুনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি নির্দেশিকা জারি করে। বাংলাদেশ ব্যাংক ওই নির্দেশনার আলোকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, পরিশোধ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকের কাছ থেকে সংগ্রহ করা অর্থ নিজস্ব সেটেলমেন্ট হিসেবে ধারণ করবে। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান পণ্য সরবরাহের পর দাম পাবে। লেনদেন নিষ্পত্তিতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যাংক, এমএফএস বা ই-ওয়ালেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান কাজ করতে পারবে। যদিও অনেক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান এখনো এসব নির্দেশনা মানছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।