বিদ্যুৎ স্টেশনের নিরাপত্তা দিতে পুলিশ সদরের চিঠি

ঢাকাসহ সারা দেশে বিদ্যুৎ স্টেশনগুলোতে নিরাপত্তা বাড়াতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বাহিনীর সব ইউনিটকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এ চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের সব ইউনিট, রেঞ্জ ও জেলার শীর্ষ কর্মকর্তারা বৈঠক করেছেন এ সংক্রান্ত করণীয় নিয়ে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, তিন দিন আগে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পুলিশের সব ইউনিট, রেঞ্জ ডিআইজি ও পুলিশ সুপারদের কাছে বিদ্যুৎ স্টেশনে নিরাপত্তা দেওয়ার পাশাপাশি নজরদারি বাড়াতে চিঠি পাঠানো হয়েছে। একটি মহল লোডশেডিংয়ের অজুহাত তোলে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে চাচ্ছে, পুলিশ এমন তথ্য পেয়েছে। যেসব এলাকায় বেশি বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে তারও একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে।

পুলিশ সূত্র বলছেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় নাশকতা বা বিশৃঙ্খলা এড়াতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে বাড়তি পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। থানার ওসিদের বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন জেলার পুলিশ সুপাররা। এমনকি বাড়তি ফোর্সও প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। তাছাড়া রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোও নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে। বিদ্যুৎ অফিসের পাশাপাশি ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার ৫০ থানার ওসিদের বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন বলে পুলিশের একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে।

জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিদ্যুৎসহ যেকোনো সমস্যা নিয়ে কোনো মহল যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য বিশেষ নজরদারি করা হচ্ছে। ঈদের ছুটিতে আমরা পর্যাপ্ত নিরাপত্তার উদ্যোগ নিয়েছি। আশা করি বড় ধরনের কোনো ঘটনা ঘটবে না। তারপরও পুলিশ সতর্ক আছে।’

একই কথা বলেছেন ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেকোনো বিশৃঙ্খলা এড়াতে প্রতিটি থানা এলাকায় কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে। ঢাকায় যেসব বিদ্যুৎ অফিস রয়েছে সেখানে বাড়তি নিরাপত্তা নেওয়া হয়েছে। তাছাড়া এমন কিছু এলাকা আছে সেখানেও বাড়তি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, একদিকে তীব্র তাপপ্রবাহ, অন্যদিকে বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং বেড়ে গেছে। কোনো কোনো এলাকায় দিন-রাত অন্তত ১০-১২ বার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। ফেনী ও কুমিল্লায় গত কয়েক দিন ধরে বেশিরভাগ এলাকায় বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করা নিয়ে লোকজন অনেকটা বিরক্ত। দুদিন আগে ফেনীর ফুলগাজীতে ঘন ঘন লোডশেডিং হওয়ায় লোকজন হামলা চালিয়েছে উপজেলার মুন্সীরহাট পল্লী বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে। বিক্ষুব্ধ লোকজন ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং কাঁটাতারের বেড়া ভেঙে ফেলে। খবর পেয়ে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এর আগে গত রবিবার রাতে ছাগলনাইয়া পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে হামলা চালায় এলাকার লোকজন। তারা বিদ্যুৎ অফিসের আসবাবপত্র, দরজা ও জানালার কাচ ভাঙচুর করে। এ ঘটনায় ওই অঞ্চলের পল্লী বিদ্যুতের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) জানে আলম বাদী হয়ে মামলা করেছেন। এ ঘটনায় রাকিবুল হাসান নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

ফুলগাজী থানার ওসি আবুল হাসিম গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হামলার পর বিদ্যুৎকেন্দ্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। একটি চক্র পরিস্থিতি অশান্ত করার চেষ্টা করছে বলে আমরা তথ্য পাচ্ছি।’

ছাগলনাইয়া থানার ওসি সুদীপ রায় বলেন, ‘এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় এ ঘটনা ঘটেছে। বিদ্যুৎ অফিস এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসগুলোতে বাড়তি সতর্কতায় পাহারা দিচ্ছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।’

ফেনী জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারবিরোধী একটি গ্রুপ দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে চাচ্ছে। আর এ জন্য আমরা ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জোনাল অফিস চরচান্দিয়া, মতিগঞ্জ ইউনিয়নের সুলাখালী সাব-জোনাল অফিস, বগাদানায় কুটির হাট সাব-জোনাল অফিস (অভিযোগ কেন্দ্র), চরদরবেশের কাজীরহাট সাব-জোনাল অফিস, মঙ্গলকান্দির ডাকবাংলো সাব-স্টেশনে বাড়তি নিরাপত্তা দিচ্ছি। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আমাদের সহায়তা করছেন। তারা এসব স্টেশন পাহারা দিচ্ছেন।’

পুলিশ সূত্র জানায়, গত এক সপ্তাহ ধরে পুরো ময়মনসিংহে বিদ্যুৎ বিভ্রাট চলছে। এ নিয়ে এলাকার লোকজনের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিদ্যুৎকেন্দ্র, অন্য সরকারি দপ্তর, কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের নিরাপত্তা চেয়ে মঙ্গলবার পুলিশ সুপারের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩। চিঠিতে বলা হয়েছে, ময়মনসিংহ সদর (আংশিক), গৌরীপুর, ঈশ্বরগঞ্জ, তারাকান্দা, ফুলপুর, হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া উপজেলায় চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ অত্যন্ত কম। অতিমাত্রায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে তীব্র গরমে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন গ্রাহকরা। তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আঞ্চলিক দপ্তর ক্যাম্পাস ও বিভিন্ন বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রে হামলার আশঙ্কা রয়েছে। উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা। কোনো হামলার ঘটনা ঘটলে নির্দিষ্ট এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘিœত হতে পারে। এ কারণে নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে ময়মনসিংহ জেলার পুলিশ সুপার মাছুম আহম্মদ ভূঞা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চিঠি পাওয়ার পর সব বিদ্যুৎ স্টেশনে কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জেলার প্রতিটি থানায় বিশেষ বার্তা দেওয়া পাঠানো হয়েছে।’

ডিএমপির একটি সূত্র জানায়, ঈদের ছুটির আগে ও পরে ঢাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সাদা পোশাকের গোয়েন্দাদের পাশাপাশি পেট্রলপাম্প, বিভিন্ন মার্কেট, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন স্থানে পুলিশ মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা করছে পুলিশ। গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলো ডিএমপির সদর দপ্তর থেকে সিসিটিভিতে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কারোর অস্বাভাবিক চলাচল দেখলেই ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে ব্যবস্থা। অনলাইনে গুজব, উসকানি বা মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর বিষয়ে সজাগ রয়েছে সাইবার মনিটরিং টিম।

শাহ আলী থানার ওসি আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ পাওয়ার পর থানা এলাকায় বিশেষ নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে আমরা পোশাকে, সাদা পোশাকে টহল বাড়িয়েছি।’ পল্লবী থানার ওসি পারভেজ ইসলাম বলেন, যেকোনো ধরনের নাশকতা রোধে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।