প্রধানমন্ত্রীর তিন দেশ সফর আলোচনা কৌতূহল

আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতিতে বিদেশিরা সক্রিয়। আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে এবার কয়েকগুণ সক্রিয় তারা। বিএনপিসহ সরকারবিরোধী অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও বিদেশনির্ভর হয়ে উঠেছে। তারা সরকারের ওপর অনাস্থা প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক শক্তির ওপর ভর করেছে, এমনটিই বলে আসছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারকে চাপে ফেলতে বিদেশিদের তৎপরতা বাড়ানোর জোরালো চেষ্টাও লক্ষ করা যাচ্ছে সরকারবিরোধী অবস্থানে থাকা দল ও জোটগুলোর।

এমন প্রেক্ষাপটে আজ মঙ্গলবার তিন দেশ সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রায় ১৫ দিনের সফরে সকালে উন্নয়ন সহযোগী দেশ জাপানের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন সরকারপ্রধান। সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সফর শেষ হবে ৮ মে।

প্রধানমন্ত্রীর তিন দেশ সফর নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। রাজনৈতিক মহলের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর এ সফর বিশেষ গুরুত্বের হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোটের আগে শেখ হাসিনার এ সফরকে সাধারণ কোনো সফর হিসেবে দেখলে চলবে না, প্রধানমন্ত্রীর এ সফর দেশের রাজনীতির অনেক জটিলতার সমাধান আসবে, ফলে তা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

সফরকালে বিভিন্ন বৈঠকে বিদেশিরা বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন নিয়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা তুলতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জানা গেছে, এমন কোনো প্রসঙ্গ উঠে এলে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ও চলমান রাজনীতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীও তার অবস্থান পরিষ্কার করবেন। পররাষ্ট্রবিষয়ক দিকগুলো নিয়ে কাজ করা আওয়ামী লীগের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, জাপান সরকার বাংলাদেশের রাজনীতি ও আগামী নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করবেন। কারণ দেশটির অবস্থান হলো তাদের বিনিয়োগ সুরক্ষা। যেহেতু বাংলাদেশে তাদের বড় অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে, সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অস্থিরতা জাপানের বিনিয়োগে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পর্কে সরকারের করণীয় ও সরকারবিরোধী মহলের অসহযোগিতার বিষয়টি নিশ্চয়ই তুলে ধরবেন শেখ হাসিনা। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সরকারি মহল আলোচনা করতে চাইলে সে ক্ষেত্রে সরকারপ্রধান তার সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করবেন বলেও একটি সূত্র জানায়। ওই সূত্রটি জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ সফর মূলত সম্পর্কোন্নয়নের সফর।

এদিকে আওয়ামী লীগের দুজন কেন্দ্রীয় নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের রাজনীতি নির্বাচন ও সরকারের বিষয়ে উন্নয়ন সহযোগী জাপানকে কখনো কোনো অবস্থান গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। অতিসম্প্রতি দেশটির বিদায়ী রাষ্ট্রদূত সর্বশেষ ২০১৮ নির্বাচন নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন রাজনৈতিক অঙ্গনে। যে কারণে এবার জাপানকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন ফ্যাক্টর হিসেবে মনে করছে বিভিন্ন মহল। ফলে জাপান সফরে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হওয়ার সুযোগ আছে। ওই দুই নেতা আরও বলেন, সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা রাজনীতি-নির্বাচন নিয়ে তার সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করবেন। এ ক্ষেত্রে বিরোধী মহলের অপপ্রচার ও অসহযোগিতার কথা জানাবেন বন্ধুরাষ্ট্রের সরকারি কর্মকর্তাদের।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ সফর নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ। জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী। আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি একটু ভিন্নরকম। এর মধ্যে তিন দেশই নির্বাচন বিষয়ে বাংলাদেশকে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে চলেছে। ফলে স্বভাবতই এ সফর গুরুত্ব বহন করে।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ি কমিটির সভাপতি ও আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফর নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ। দেশের জন্য সরকারের জন্য সুফল বয়ে আনবে প্রধানমন্ত্রীর তিন দেশ সফর। রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচন এসব ব্যাপারেও আলোচনা হতে পারে কোনো না কোনো মহলে। এ ছাড়া দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও গতিশীল হবে, নতুন উচ্চতা পাবে।’ তিনি বলেন, ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযেগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বদ্ধপরিকর।’

দলের আরেক সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্মের শুরু থেকে জাপান বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের এ সম্পর্ক আরও উচ্চতায় যাবে।’ তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফরের কথা ছিল গত বছর। তখন সফরটি স্থগিত হয়। আমাদের অর্থনীতিতে জাপানের অবদান আছে।’ এর বাইরে অন্য দুই দেশ সফরের বিষয়ে জানা নেই বলে জানান তিনি।

তিন দেশ সফর : প্রধানমন্ত্রী আজ মঙ্গলবার প্রথমে পূর্বনির্ধারিত চার দিনের সরকারি সফরে টোকিওর উদ্দেশে রওনা দেবেন। সকাল পৌনে ৮টায় বাংলাদেশ বিমানের বিশেষ ফ্লাইটে জাপানের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন প্রধানমন্ত্রী। এ সফরকালে টোকিওর সঙ্গে আটটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে বলে আশা করছে ঢাকা। এ সফরের পর প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সফর করবেন।

গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন এসব তথ্য জানান। তিনি জানান, জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার আমন্ত্রণে টোকিও, বিশ্বব্যাংকের আমন্ত্রণে ওয়াশিংটন এবং ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লসের রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য লন্ডন যাবেন প্রধানমন্ত্রী।

ড. মোমেন জাপান সফর বিষয়ে বলেন, দুই দেশের মধ্যে কৃষি, মেট্রোরেল ইন্ডাস্ট্রিয়াল আপগ্রেডেশন, শিপ রিসাইক্লিং, কাস্টমস ম্যাটারস, ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি, ডিফেন্স কো-অপারেশন, আইসিটি এবং সাইবার সিকিউরিটি কো-অপারেশন ইত্যাদি খাতে আটটি চুক্তি বা সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। কাল বুধবার দুপুরে জাপানের সম্রাট নারুহিতোর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ সফরে দুই দেশের সম্পর্ক কৌশলগত অংশীদারত্বে উন্নীত হওয়ার বিষয়টি অধিকতর গুরুত্বসহকারে আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি করবে।

জাপান সফরকালে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হবেন তার ছোট বোন শেখ রেহানা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, কৃষিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রীসহ উচ্চপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা।

জাপান সফর শেষে সরকারপ্রধান আগামী শুক্রবার টোকিও থেকে ওয়াশিংটনের উদ্দেশে রওনা হবেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাংকের সম্পর্কের ৫০ বছরপূর্তি উপলক্ষে ওয়াশিংটন ডিসিতে বিশ্বব্যাংকের সদর দপ্তরে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন শীর্ষক সেমিনার আয়োজন করা হবে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট সেই সেমিনারে বক্তব্য রাখবেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ বিষয়ে আরও বলেন, এ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের উন্নয়নের জয়যাত্রা ও গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের কার্যক্রম তুলে ধরা হবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের বোর্ড অব ডিরেক্টরসের একান্ত বৈঠক হবে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী এ সফরের সময় সংবাদপত্র ‘ইকোনমিস্ট’-এ সাক্ষাৎকার দেবেন। পরে প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের আয়োজিত কমিউনিটি ইভেন্টে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। এ ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গারের সৌজন্য সাক্ষাতের কথা রয়েছে। আগামী ৪ মে তিনি লন্ডনের উদ্দেশে ওয়াশিংটন ত্যাগ করবেন।

লন্ডনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লস এবং কুইন কনসোর্ট ক্যামিলার রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। ৫ থেকে ৬ মে লন্ডনে তাদের রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠিত হবে। এ রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ বিষয়ে বলেন, ‘এবার ৭০ বছর পর অনুষ্ঠেয় ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠানে প্রায় ১৩০টি দেশের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানরা (কমনওয়েলথভুক্ত অধিকাংশ দেশের সরকারপ্রধানসহ) অংশগ্রহণ করতে পারেন।

এ সফরে কমনওয়েলথের সেক্রেটারি জেনারেল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। যুক্তরাজ্যের কয়েকজন মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে পারেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী লন্ডনের একটি হোটেলে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনায়ও অংশগ্রহণ এবং যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন।