ব্রিটিশ শাসনের ক্ষয়িষ্ণু সময়ে স্বাধীনতার দাবিতে উথাল-পাতাল অবস্থা দেখেছেন। পাকিস্তান শাসনের শৃঙ্খল মুক্তির আন্দোলনে ছিলেন সক্রিয়। স্বাধীনতার পরের নানা বাঁকবদলের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন। আমৃত্যু মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে শামিল থাকা ঐক্য ন্যাপের সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক পঙ্কজ ভট্টাচার্য মারা গেছেন। গত রবিবার রাতে রাজধানীর হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
৮৪ বছর বয়সী পঙ্কজ ভট্টাচার্য শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছিলেন। গত সোমবার (১৭ এপ্রিল) তাকে রাজধানীর পান্থপথে হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় ঈদের দিন শনিবার তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের পরিচালক ডা. লেনিন চৌধুরী জানান, রবিবার রাত ১২টা ২০ মিনিটে পঙ্কজ ভট্টাচার্যের মৃত্যু হয়েছে। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ঐক্য ন্যাপের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আজ মঙ্গলবার রাজধানীর পোস্তগোলা মহাশ্মশানে তার শেষকৃত্য হবে। তার স্ত্রী বিশিষ্ট নারীনেত্রী রাখী দাস পুরকায়স্থ ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে মারা যান।
ঐক্য ন্যাপের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আজ বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত পঙ্কজ ভট্টাচার্যের মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হবে।
বরেণ্য রাজনীতিক পঙ্কজ ভট্টাচার্যের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি বিভিন্ন দল ও সংগঠনের নেতারা।
পঙ্কজ ভট্টাচার্য ১৯৩৯ সালের ৬ আগস্ট চট্টগ্রাম জেলায় রাউজান থানার নোয়াপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা প্রফুল্ল কুমার ভট্টাচার্য ও মা মনি কুন্তলা দেব। বাবা ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক। মা-বাবা দুজনই ছিলেন স্বদেশি আন্দোলনের নিবেদিত প্রাণ। ১৯৪৬ সালে চট্টগ্রাম শহরে এসে স্কুলে ভর্তি হন তিনি। এ সময়টি ছিল উত্তাল। একদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে মাত্র, অন্যদিকে স্বাধীনতার দাবিতে উত্তাল ভারত। এ ছাড়া তেভাগা, টংক ও নানকার আন্দোলনের অভিঘাতে আলোড়িত হয় গ্রামবাংলা। স্বাভাবিকভাবে এসবের প্রভাব চট্টগ্রাম শহরেও পড়েছিল ব্যাপক। শৈশব ও কৈশোরের সন্ধিক্ষণে পঙ্কজ ভট্টাচার্যের মনেও এ আবহের ছাপ পড়েছিল গভীরভাবে।
আন্দোলন সংগ্রামের উজ্জীবিত পঙ্কজ ভট্টাচার্য রাজনীতির কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে বিতাড়িত হয়ে ভর্তি হন চট্টগ্রাম মুসলিম স্কুলে। ১৯৫৮ সালে চট্টগ্রাম কলেজে ছাত্র হিসেবে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশ নেন। এ সময় ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গেও পরিচিত হন। ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হন। তিনি ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন, পাশাপাশি কমিউনিস্ট পার্টির কার্যক্রমেও ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। ১৯৬২-এর ছাত্র আন্দোলনে আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সারা দেশে ছাত্র-সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে পঙ্কজ ভট্টাচার্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৩ সালে তিনি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সহসভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৪-৬৫ সালে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের কার্যকরী সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬০ সালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৬৬ সালে পঙ্কজ ভট্টাচার্য ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে (ন্যাপ) যোগদান করেন। এ সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ব্যাপক জানমালের ক্ষতি সাধিত হলে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে সংখ্যালঘু এলাকায় পাহারা ও ত্রাণকার্যক্রম পরিচালনায় পঙ্কজ ভট্টাচার্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৬৭ সালে স্বাধীন বাংলা ষড়যন্ত্র মামলার পঙ্কজ ভট্টাচার্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। বঙ্গবন্ধু আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আগেই স্বাধীন বাংলা ষড়যন্ত্র মামলায় তিনি তিন মাস কারাবাসে নির্যাতিত হন। স্বাধীন বাংলা ষড়যন্ত্র মামলা ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা একই সূত্রে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা করা হলেও পাকিস্তান ন্যাপ এ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়ে পড়বে এ বিবেচনায় স্বাধীন বাংলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করা হয়।
স্বৈরাচার আইয়ুব-ইয়াহিয়ার ষড়যন্ত্রে সাড়ে তিন বছরের অধিক সময় পঙ্কজ ভট্টাচার্যকে কারান্তরালে থাকতে হয়। ১৯৬৯ সালের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের গেরিলা বাহিনী গঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৭২ সালে পঙ্কজ ভট্টাচার্য ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারী শাসনের পতনের প্রাক্কালে তিন-রাজনৈতিক জোটের রূপরেখা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি। ১৯৯৩ সালে বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে মানবমুক্তির নয়াদিগন্তের সন্ধান ও কৌশলে পঙ্কজ ভট্টাচার্যসহ সমমনা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের জাতীয় কনভেনশনের সিদ্ধান্তে গণফোরাম গঠন করা হয়।
২০১০ সালে পঙ্কজ ভট্টাচার্য ঐক্য ন্যাপ প্রতিষ্ঠা করেন। সারা জীবন তিনি বাম রাজনীতির আদর্শ নিয়ে জীবন কাটিয়েছেন। রাজনীতির বাইরে তিনি একজন কৃতী ফুটবলার ছিলেন। চলতি বছর অমর একুশে বইমেলায় পঙ্কজ ভট্টাচার্যের আত্মজীবনীমূলক বই ‘আমার সেই সব দিন’ প্রকাশিত হয়।
প্রবীণ এ রাজনীতিকের মৃত্যুতে এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রয়াতের আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং শোকাহত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। এ ছাড়া শোক প্রকাশ করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। আরও শোক জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আমির হোসেন আমু, সিপিবির সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম ও সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ।