কক্সবাজারের নাজিরারটেক পয়েন্ট সাগরে ডুবন্ত অবস্থায় একটি মাছ ধরার ট্রলার থেকে উদ্ধার করা ১০ মরদেহের পরিচয় মিলেছে। মরদেহগুলো জেলে নাকি জলদস্যুদের এ নিয়ে রহস্য তৈরি হয়েছে।
এ ঘটনায় ট্রলার মালিক নিহত শামসুল আলম মাঝির স্ত্রী রোকেয়া বেগম বাদী হয়ে মামলা করবেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এ বিষয়ে গতকাল সোমবার দুপুরে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘যে ১০ জনের মরদেহ পাওয়া গেছে, তাদের মধ্যে পাঁচজনকে শনাক্ত করেছেন স্বজনরা। ময়নাতদন্ত শেষে তাদের মরদেহ হস্তান্তর করা হবে। বাকি পাঁচজনের মধ্যে দুই থেকে তিনজনের লাশ একাধিক স্বজন দাবি করায় ডিএনএ পরীক্ষার পর হস্তান্তর করা হবে।
কারা, কী কারণে এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয় জানিয়ে পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত ও কারণ জানতে জেলা পুলিশের পাশাপাশি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষজ্ঞ দলসহ একাধিক টিম কাজ করছে।’
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, স্বজনদের দেওয়া তথ্যমতে যে পাঁচজনের পরিচয় চূড়ান্তভাবে শনাক্ত করা হয়েছে তারা হলেন মহেশখালী উপজেলার হোয়ানক ইউনিয়নের হরিয়ারছড়া এলাকার ছনখোলা পাড়ার ট্রলার মালিক শামসুল আলম ওরফে শামসু মাঝি (৪০), শাপলাপুর ইউনিয়নের মিঠাছড়ি এলাকার মো. সাইফুল ইসলাম (১৮), একই এলাকার মো. সাইফুল্লাহ (২৩) ও শওকত ওসমান (১৮) এবং চকরিয়া উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের জঙ্গলকাটা এলাকার মো. তারেক জিয়া (১৮)।
তিনি আরও বলেন, এ ছাড়া চূড়ান্তভাবে পরিচয় শনাক্ত না হলেও মর্গে লাশ খুঁজতে আসা স্বজনদের দাবি অনুযায়ী বাকি পাঁচজন হলেন মহেশখালী উপজেলার শাপলাপুর ইউনিয়নের মিঠাছড়ি এলাকার নুরুল কবির (২৩), একই এলাকার মোহাম্মদ পারভেজ মোশারফ (১৪), ওসমান গণি (১৭), চকরিয়া উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের বটতলী এলাকার সাইফুল ইসলাম (৩৬) এবং একই ইউনিয়নের জঙ্গলকাটা এলাকার মো. শাহজাহান (২৩)।
স্বজন, পুলিশ ও অন্যান্য সূত্র থেকে জানা গেছে, গত রবিবার বিকেলে কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর মোহনাসংলগ্ন নাজিরারটেক পয়েন্টে সাগরে একটি ডুবন্ত ট্রলারের হিমঘর (বরফবেষ্টিত মাছ রাখার স্থন) থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় অর্ধগলিত ও বিকৃত ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করেন পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।
তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হলেও কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল মর্গে আনার পর স্বজনদের অনেকে ভিড় জমান। পরে স্বজনরা মর্গে নিহতদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ, পোশাক ও অন্যান্য জিনিসপত্র দেখে মৃতদেহগুলো শনাক্ত করেন।
মরদেহ শনাক্ত করতে আসা ওসমান গণির মা জোহরা বেগম জানিয়েছেন, পরিবারের কাউকে না বলে তার ছেলে সাগরে মাছ শিকারে যায়। কিন্তু কয়েক দিন পর শোনেন ট্রলারটি জলদস্যুর কবলে পড়েছে। এরপর তার কোনো খোঁজ মিলছিল না। পরে রবিবার উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোতে তার সন্তান আছে কি না, দেখতে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে গেলে শার্ট ও প্যান্ট দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
শামসুল আলম মাঝির স্ত্রী রোকেয়া বেগম বলেন, ‘আমার স্বামীসহ ট্রলারে থাকা সবাইকে হত্যা করা হয়েছে। আমি অবশ্যই হত্যা মামলা করব।’
ট্রলারের গায়ে নাম লেখা না থাকা নিয়ে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, ‘সুনির্দিষ্টভাবে এখনই কিছু বলা সম্ভব হচ্ছে না। অন্য ট্রলার মালিক, সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে পুলিশ কথা বলবে। সেখান থেকে পাওয়া তথ্য এবং অন্য উৎস থেকে পাওয়া তথ্য মেলানোর পর প্রকৃত চিত্র জানানো সম্ভব হবে। তাই এই মুহূর্তে এ ব্যাপারে কিছু বলা ঠিক হবে না।’
ওসি মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম জানান, ট্রলার থেকে মৃতদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এখনো মামলা হয়নি। এটি একটি বড় হত্যাকা-ের ঘটনা। এ নিয়ে সিআইডি-পিবিআইসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। তাদের কাজ শেষ হলে পুরো ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করা হবে।
রফিকুল ইসলাম আরও বলেন, ‘উদ্ধার হাওয়া তিনজনের হাত-পা বাঁধা ছিল, একজনের হাত এবং অপরজনের শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন ছিল। এ ছাড়া ট্রলারের হিমাগার বাইরে থেকে বন্ধ ছিল এবং ট্রলারটির নিচে ফুটো ছিল। এসব দেখে আমরা নিশ্চিত এটি পরিকল্পিত হত্যাকা-।’