রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি : রেশমাদের পিছুটান

রানা প্লাজা নামে এখন কোনো ভবন নেই। এটি স্রেফ ফাঁকা জায়গা। একটি ট্র্যাজেডি বা ঘটনার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাভার সদরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে বাংলাদেশ এমনকি বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রাণহানির শিল্পদুর্ঘটনার সাক্ষী হয়ে। স্থানীয়দের কাছে এটি বিরক্তিকর তথা অসহ্যের জায়গা। বখাটেদের আড্ডাস্থল। সেখানে বসে মাদকের আখড়া। এরা যারপরনাই বেপরোয়া।

চলতি পথের নজরে মনেই হবে না, ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ঢাকার সাভারে এ ভবন দুর্ঘটনা ও দুর্ঘটনাস্থলের হাহাকার চিত্র কাঁদিয়েছে সারা বিশ্বকে। আবার সবাইকে বিস্মিত করেছে দুর্ঘটনার ১৭ দিন পর ধ্বংসস্তূপ থেকে এক তরুণীর জীবিত উদ্ধারের ঘটনা। যা শিরোনাম হয়েছে বিশ্বের সংবাদমাধ্যমে। রানা প্লাজা ধসে সেখানে কর্মরত গার্মেন্টস শ্রমিকদের এক-চতুর্থাংশের ভাগ্যে জুটেছে মৃত্যু, কেউ বা হয়েছেন পঙ্গু। সেদিনের ভয়াল সেই স্মৃতি আর শারীরিক ক্ষত নিয়ে বেঁচে আছেন অনেকে জীবন্মৃত হয়ে। এ প্রজন্মের মনে না থাকলেও সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মী আর শত শত মানুষের আল্লাহু আকবার ধ্বনির মধ্য দিয়ে রেশমাকে উদ্ধারের ঘটনার চিত্র এখনো চোখে ভাসে অনেকের। সেই রেশমা বিষয়ক ফলোআপ সংবাদ নেই।

প্রতি বছরের ২৪ এপ্রিল ইভেন্ট সংবাদ দিবস হিসেবে নিহতদের প্রতি ফুল দিয়ে আহত শ্রমিক, নিহতের স্বজনসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের শ্রদ্ধা নিবেদন। বেঁচে যাওয়া এবং পঙ্গুত্ব নিয়ে বেঁচে থাকাদের নিয়ে একটা সাইড রিপোর্ট। গত ৯ বছরের মতো দশম বছরে এসে এবারও এমনই হয়েছে। দুর্ঘটনার দশ বছর পূর্ণ হলেও এখনো ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন শ্রমিক নেতারা। তারা এই দুর্ঘটনাকে হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করে দ্রুত দোষীদের শাস্তি দাবি করেন। দিনটিকে পোশাক শিল্পে শোক দিবস ঘোষণার দাবি জানানো হয়। নানান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসের মধ্যে আরেকটি দিবস যোগ হলে কী হবে বা হতে পারে, তা আরেক প্রশ্ন। নিহত প্রায় এক হাজার ১৭৫ জন শ্রমিক আর ফিরে আসবে না। দুই হাজারেরও বেশি আহতদেরও সেরে ওঠা হবে না। 

দিবস ঘোষণা করে বা না করেও এ নিয়ে করার অনেক কিছু আছে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় বাবা-মা হারা শিশুদের অনেককেই দেখাশোনা করার মতো কোনো আত্মীয়-স্বজন নেই। এই ধরনের ৩৩ শিশুর ঠাঁই হয়েছে গাইবান্ধায় ‘অরকা হোমস’ নামে একটি হোমে। যাদের অনেকেই এখন স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েছে। কেউ কেউ বিয়েশাদিও করেছে। তারা কেমন আছে, এ সংক্রান্ত সংবাদ চোখে পড়েনি। রানা প্লাজা ধসের ১০ বছরে এসে পোশাক কারখানায় নিরাপত্তা কতটা বেড়েছে এ প্রশ্নেরও কিনারা নেই। যদিও ভবনটি ধসে ৫টি গার্মেন্টসের প্রায় ১২’শ শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু ও সহস্রাধিক গুরুতর আহত হয়ে অধিকাংশেরই পঙ্গুত্ব বরণের পর আলোচনায় ছিল পোশাক কারখানার নিরাপত্তা বাড়ানো। বিদেশিদেরও চাপ ছিল এ নিয়ে। কারখানাগুলোতে নিরাপদ কর্মপরিবেশ কি নিশ্চিত হয়েছে? ভবনগুলো ও কারখানার অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা নির্ভরযোগ্য হয়েছে? এসব প্রশ্নও নিষ্পত্তিহীন।

ওই ভবনধস নেহাত কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং তা সুস্পষ্টভাবেই মালিকপক্ষের অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড বিবেচনায় নিহত ও নিখোঁজ শ্রমিকদের এক জীবনের আয়ের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ ৪৮ লাখ টাকা দেওয়ার দাবি ছিল। আহতদের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণের দাবিও জানানো হয়েছিল। আরেকটি দাবি ছিল ভবনমালিক সোহেল রানার সর্বোচ্চ শাস্তির। রানার কাছ থেকে বিভিন্ন সময় উৎকোচ নিয়ে ভবন নির্মাণে নানা দুর্নীতি ও অনিয়মে  জড়িত সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিও করা হয়েছিল।

এসব দাবি কার্যত অবিরাম দাবিনামা হয়েই রয়েছে। ১০ বছর পরও হৃদয়বিদারক ওই ঘটনার ভুক্তভোগী শ্রমিকরা কোনো বিচার পেলেন না। পেলেন না কোনো ক্ষতিপূরণ। উপরন্তু ৭ এপ্রিল সোহেল রানার জামিনের আদেশ হয়। দু’দিন পর চেম্বার আদালত তার জামিনাদেশ স্থগিত করেছে। আগামী মাসে শুনানির তারিখ রয়েছে। ইউরোপ ও আমেরিকার ব্র্যান্ডগুলো শ্রমিকদের জন্য দেওয়া অনুদানকে প্রচার করা হয়েছে মালিকপক্ষের দেওয়া ক্ষতিপূরণের মতো করে। বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর অনুদান ও ক্ষতিপূরণ এক জিনিস নয়।

বিচারের ধীরগতি বাংলাদেশে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ১০ বছরেও এর বিচার না হওয়ার পেছনে অসম ক্ষমতার কিছু বিষয়-আশয়কে প্রাসঙ্গিক করা হচ্ছে। এমন অঘটন বা হত্যা মামলাটির বিচার এমন ধীরগতিতে আরও নানান কথা আসছে। এমন তো নয়, রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় কারা কীভাবে দায়ী, তা কেউ জানেন না। রানা প্লাজা তৈরির প্রতিটি পদে পদে ছিল অনিয়ম ও জালিয়াতি। যা ভবনটিকে একটি মৃত্যুকূপে পরিণত করে। ভবনমালিক রানা একাই তা করেননি। ভবন নির্মাণ ও তদারকির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও ভবনে স্থাপিত গার্মেন্টস কারখানার মালিকদের চরম অবহেলাও প্রমাণিত। তারা সবাই ক্ষমতাধর। আর হতাহতরা নিম্ন বা নিরীহ শ্রেণির।

১০ বছরেও এই ঘটনার বিচার না হওয়ার পেছনে অসম ক্ষমতার কথা আসছে। রানা প্লাজা বা অন্যান্য জায়গার ভুক্তভোগী শ্রমিকরা অসংগঠিত। তাদের নেতাদের মধ্যেও ধরিবাজের সংখ্যা কম নয়। অভিযুক্ত ভবনমালিক, কারখানামালিক কিংবা বিভিন্ন তদারকি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা নানাভাবেই ক্ষমতাধর। আইনি-বেআইনি নানা উপায়ে তাদের পক্ষে বিচারে বাধা দেওয়ার সক্ষমতা আছে। বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামোতে ক্ষমতাসীনদের দরিদ্র, শ্রমজীবী সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে জবাবদিহি করতে হয় না বরং বিভিন্ন দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে সন্তুষ্ট রাখলেই চলে। এটাই অপ্রিয় সত্য।

শুধু রানা প্লাজা নয়, ২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক পোশাকশ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনারও বিচার হয়নি। সেখানে এত শ্রমিকের অকালমৃত্যুতে মালিকপক্ষের চরম গাফিলতি প্রমাণিত। ২০১৬ সালে টঙ্গীতে ট্যাম্পাকো ফয়েলস প্যাকেজিং কারখানায় ৩১ জন, ২০১৯ সালে কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া এলাকায় প্রাইম প্লাস্টিক কারখানায় ১৭ জন, ২০২১ সালে নারায়ণগঞ্জের হাসেম ফুড ফ্যাক্টরিতে ৫৪ শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনায়ও কারও শাস্তি হয়নি। এত কথা ও ঘটনার ফাঁকে বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতে রেশমার মতো নারী শ্রমিকের সংখ্যা ধীরে ধীরে পড়তির দিকে চলে যাওয়ার বিষয়টি আলোচনার আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। এ শিল্পটিতে এক সময় সিংহভাগ শ্রমিকের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল নারী। বিভিন্ন গবেষণা বলছে, তা এখন ৬০ শতাংশের কম। বাড়ছে পুরুষকর্মীদের হার। কেন এমনটি হচ্ছে? তা ইতিবাচক না নেতিবাচক? খোলাসা হচ্ছে না। কারখানাগুলোতে স্বয়ংক্রিয় মেশিনের সংযোজন এবং কর্মপরিবেশে গুণগত পরিবর্তন না আসা এর একটি কারণ হতে পারে। প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নারীদের পিছিয়ে যাওয়া ভালো খবর নয়।

কিছু কারখানায় ব্যয় কমিয়ে আনতে শ্রমিক কমানোর পথ ধরেছে। উৎপাদন বাড়াতে মাল্টি টাস্কিং মেশিনারিজ ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে সেখানেও কাজের সুযোগ কমছে রেশমাদের। গার্মেন্টস শিল্পে তাদের গতি ও জ্যোতি ফেরাতে প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ জরুরি হয়ে পড়েছে। আর বছর দুয়েক পর ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ-এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটবে। হাতে সময় খুব কম। আমাদের পোশাক শিল্পের কর্মপরিবেশ নিয়ে বিদেশিদের অভিযোগ কিছুটা হলেও কমেছে। কিন্তু, ভালো হয়েছে বলতে বেশ

কৃপণতা। দোষ ধরতে সময় লাগে না। তার ওপর করোনার সময়ে পশ্চিমা ক্রেতারা পোশাকের দাম বাড়ায়নি। বিদেশি ১৮-২০ শতাংশ কর্মী যে উচ্চ বেতনে কাজ করছে সেই সন্তুষ্টি প্রকাশ করে না। তবে, নারীশ্রমিকদের পিছুটানের বিষয়টি নিয়ে টোকা দেয়। ভবিষ্যতে এ ইস্যুতে আবার কোন বাগড়া বা প্রশ্ন তুলে বসে ঠিক নেই। অভিজ্ঞতা কিন্তু সেই শঙ্কার বার্তা দেয়। আমাদের কোনো গলদ বের করতে তাদের সময় লাগে না। তাই দ্রুত এ বিষয়ে ভাবনার দুয়ার খোলা সময়ের দাবি।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন

mostofa71@gmail.com