গতকাল মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৩টা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের (কিডনি বিভাগ) ফটক অতিক্রম করে ঢুকতেই চোখ আটকে গেল। দেখা গেল বারান্দার মেঝেতে অসুস্থ এক যুবক পা দুটো সামনের দিকে ছেড়ে দিয়ে বসে আছেন। পায়ে তার ডান্ডাবেড়ি। এক হাতে ঝুলছে হাতকড়া। দুই পায়ের মাঝখানে পড়ে আছে ‘ক্যাথেটার’। রক্তমিশ্রিত প্রস্রাব সেখানে জমা হচ্ছে। পাশে চেয়ারে বসে মোবাইল ফোন দেখছেন কারারক্ষী ফখরুল।
সামনে যেতেই বন্দি যুবকটি এই প্রতিবেদকের দিকে তাকালেন।
নাম জানতে চাইলে কথা বলতে পারছিলেন না। তবু মৃদু স্বরে জানালেন, তার নাম মো. মিজান। বয়স ২৫। গ্রামের বাড়ি কক্সবাজার জেলার চকরিয়ায়। এক বছর আগে চুরির মামলায় কারাবন্দি হন তিনি। এরপর এই প্রতিবেদকের হাতে মোবাইল ফোন দেখেই চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ান কারারক্ষী ফখরুল।
কারারক্ষী ফখরুল বলেন, ‘ছবি কেন তুলছেন। যুবকটি একজন আসামি। ছবি ডিলিট করে দেন।’ এক পর্যায়ে এই প্রতিবেদকের মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে ছবিটি ধারণ হয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখেন তিনি। কারারক্ষী ফখরুল জানালেন, চমেক হাসপাতালের ১৪ নম্বর মেডিসিন ওয়ার্ড থেকে ১৭ নম্বর কিডনি ওয়ার্ডে মঙ্গলবার সকালে বন্দি মিজানকে আনা হয়েছে। সেই সকাল থেকে ওয়ার্ডের বারান্দার ‘ম্যাক্স-১৯’ নম্বর মেঝেতে পড়ে আছেন। তার প্রহরায় নিযুক্ত আছেন দুজন কারারক্ষী।
সরেজমিনে দেখা যায়, ওই ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা রোগীর স্বজনরা বারান্দা দিয়ে আসা-যাওয়ার সময় মেঝেতে পড়ে থাকা অসুস্থ বন্দি মিজানকে এক নজর হলেও দেখছেন। ওই ওয়ার্ডের বারান্দায় আর কোনো রোগী নেই। আছে শুধু মিজানই।
কিডনি ওয়ার্ডের একজন নার্স বলেন, ‘মিজান কিডনি রোগী। ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের মেঝেতে সেই সকাল থেকে পড়ে আছে। তার শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা দরকার।’ ‘একজন অসুস্থ বন্দিকে এভাবে ডা-াবেড়ি দিয়ে ফেলে রাখা উচিত নয়’ বলেন ওই নার্স।
চুরির মামলায় এক বছর আগে (মিজানের দাবি অনুসারে) কারাবন্দি হওয়া অসুস্থ মিজানের পায়ে ডান্ডাবেড়ি কেন জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মুহাম্মদ মঞ্জুর হোসেন বলেন, ‘মিজান মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি কিংবা দুর্ধর্ষ জঙ্গি না হলেও যদি পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে তাহলে সেক্ষেত্রে ডান্ডাবেড়ি পরানো যায়। তাছাড়া সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক যদি বলেন তাহলে আমরা ডা-াবেড়ি খুলে ফেলব। হাসপাতালে যেহেতু সিভিল পোশাকে বন্দি মিজান চিকিৎসাধীন। সেক্ষেত্রে নিরাপত্তার কারণে তাকে ডা-াবেড়ি পরানো হয়েছে। তবে তার সুচিকিৎসার জন্য যা করণীয় সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
অসুস্থ একজন বন্দির পায়ে ডান্ডাবেড়ি লাগানোকে শুধু আইন পরিপন্থী নয়, মানবতা পরিপন্থী কাজ বলে মন্তব্য করে চট্টগ্রাম মহানগর আদালতের সাবেক পিপি ফখরুদ্দিন চৌধুরী গতকাল মঙ্গলবার বিকালে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অসুস্থ বন্দিকে ডা-াবেড়ি পরানো কোনোভাবেই আইন সমর্থন করে না। এটা কারা কর্তৃপক্ষের অতিমাত্রায় বাড়াবাড়ি। কারণ কারা বিধিও ডান্ডাবেড়ি লাগানোর অনুমতি দেয় না।’ আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, বিচারাধীন মামলায় এমন একজন আসামিকে কোনোভাবেই ডা-াবেড়ি পরানো যায় না। এটি সম্পূর্ণ ‘বেআইনি ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ’।
আইনজীবীরা জানান, মূলত জেল কোডের ৫৬ বিধি অনুযায়ী আসামিদের ডান্ডাবেড়ি পরানো হয়। এতে বলা হয়, ‘যখন সুপারিনটেন্ডেন্ট প্রয়োজন মনে করেন যে, (বন্দির অবস্থার কারণে বা চরিত্রের কারণে) কোনো বন্দিকে নিরাপদ প্রহরার জন্য লৌহ-শৃঙ্খলে আটক রাখিতে হইবে, সরকারের অনুমোদনক্রমে মহাপরিদর্শক নির্ধারিত বিধি এবং নির্দেশাবলি সাপেক্ষে তিনি উক্ত বন্দিকে সেভাবে আটক রাখিতে পারিবেন।’ এ ছাড়া ৫৭ বিধি অনুযায়ী দ্বীপান্তরের সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের লৌহ-শৃঙ্খলে আটক করতে পারেন।
প্রসঙ্গত, সম্প্রতি বন্দি বা গ্রেপ্তার আসামিদের বেআইনিভাবে ডান্ডাবেড়ি ও হাতকড়া পরানোর চর্চা রোধ এবং এ বিষয়ে সুর্নিদিষ্ট নীতিমালা করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানিয়ে তিন সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক ও কারা মহাপরিদর্শক বরাবর আইনি নোটিস পাঠান সুপ্রিম কোর্টের ১০ আইনজীবী। এদের একজন মো. আসাদ উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘বেঙ্গল পুলিশ রেগুলেশনের প্রবিধান ৩৩০-এ হাতকড়া সংক্রান্ত বিধান রয়েছে। সেখানে শুধু পালিয়ে যাওয়া রোধে যতটুকু প্রয়োজন, তার বেশি নিয়ন্ত্রণ আরোপ নিষেধ করা হয়েছে।’