তিন প্রকল্পে ১২৫ কোটি ডলার দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক

বিশ্বব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ শুক্রবার বাংলাদেশকে সবুজ ও আরও সহনশীল উন্নয়ন এবং বৃহত্তর অন্তর্ভুক্তি অর্জনে সহায়তা করার জন্য তিনটি প্রকল্পে ১২৫ কোটি মার্কিন ডলার দিচ্ছে।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাটি চার বছরের (২০২৩-২৭) জন্য নতুন কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক (সিপিএফ) তৈরি করেছে, যা বাংলাদেশের ২০৩১-এর মধ্যে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করবে। বিশ্বব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সিপিএফ নিয়ে আলোচনা করেছে।

গত বৃহস্পতিবার বিশ্বব্যাংকের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য অনুমোদন করা সহায়তার মধ্যে ৫০ কোটি ডলার দেওয়া হচ্ছে পুষ্টি, উদ্যোক্তা এবং সহনশীলতা অর্জনে কৃষি ও গ্রামীণ রূপান্তর (চঅজঞঘঅজ) কর্মসূচির আওতায়। এ প্রকল্পটি কৃষি-খাদ্যব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনা, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, উদ্যোক্তা তৈরি ও জলবায়ু সহনশীলতা অর্জনে সহায়তা করবে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। আর ৫০ কোটি ডলার প্রথম সবুজ এবং জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় দেওয়া হবে। এতে বাংলাদেশ পরিবেশবান্ধব ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের সহনশীলতা উন্নয়নে ব্যয় হবে। বাকি ২৫ কোটি ডলার টেকসই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ও সহনশীল রূপান্তর (ঝগঅজঞ) কর্মসূচির আওতায় দেওয়া হচ্ছে। এই প্রকল্প ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের খাতকে আরও গতিশীল করবে, দূষণ কমাবে, সম্পদ ব্যবহারে দক্ষতা বাড়াবে এবং জলবায়ু সহনশীল প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়তা করবে।

বাংলাদেশ সরকারের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, এই পরিকল্পনার সঙ্গে মিল রেখে সিপিএফ বাংলাদেশে বৈচিত্র্যময় ও প্রতিযোগিতামূলক বেসরকারি খাতের বিকাশে সহায়তা করবে, যাতে আরও বেশি কর্মসংস্থান ও উন্নত চাকরির বাজার তৈরি হয়। এ ছাড়া সবার জন্য সুযোগ আরও বাড়ানোর লক্ষ্যে আর্থসামাজিক অন্তর্ভুক্তিকে এগিয়ে নেবে। উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়াসহ তিনটি অর্জন বাংলাদেশের কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।

এই অগ্রাধিকারগুলো বিবেচনায় নিয়ে সিপিএফ আটটি লক্ষ্যমাত্রা মনোযোগের কেন্দ্রে রেখে কারিগরি এবং আর্থিক সহায়তার একটি শক্তিশালী কর্মসূচি প্রস্তাব করেছে। এই আট লক্ষ্যমাত্রা হলো বড় পরিসরে বেসরকারি খাতের উন্নয়নের জন্য ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা; দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি এবং সহনশীলতা অর্জনে আর্থিক মধ্যস্থতাকে শক্তিশালী করা; উন্নত সেবা প্রদানের জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা বাড়ানো; মানবসম্পদ উন্নয়ন পরিষেবার জন্য গুণগত মান এবং ন্যায়সংগত অধিকার নিশ্চিত করা; নারী এবং পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়ানো; অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য স্থানীয় এবং ডিজিটাল সংযোগ শক্তিশালী করা; দ্রুত জলবায়ু সহনশীলতা মজবুত ও স্থায়িত্বেন জন্য ব-দ্বীপ ব্যবস্থাপনার উন্নত কার্যকারিতা; সবুজায়ন বাড়ানো এবং জ¦ালানি স্থানান্তরে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারে উৎপাদনশীলতা।

বাংলাদেশ ও ভুটানে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর আবদুল্লায়ে সেক বলেন, ‘এই কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক (সিপিএফ) বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ও বাংলাদেশের মধ্যে পাঁচ দশকের শক্তিশালী অংশীদারত্বের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু বাংলাদেশের লক্ষ্য আরও সমৃদ্ধ হওয়া, উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশের চাহিদা পূরণের জন্য দেশটির আরও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং নীতির প্রয়োজন হবে। এই সিপিএফ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারের সংস্কার কর্মসূচিকে সমর্থন করবে এবং অন্তর্ভুক্তি ও সহনশীলতাকে সহায়তা করবে।’

সিপিএফ তৈরিতে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ সরকারি-বেসরকারি অংশীজন, সুশীল সমাজ, থিঙ্ক ট্যাংক, শিক্ষাবিদ, গণমাধ্যম এবং অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে দেশব্যাপী এবং অনলাইনে ব্যাপক আলোচনা করেছে।

বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সদস্য দ্য মাল্টিলেটারাল ইনভেস্টমেন্ট গ্যারান্টি এজেন্সির (মিগা) ভাইস প্রেসিডেন্ট অব অপারেশন্স জুনায়েদ কামাল আহমেদ বলেন, ‘স্বল্প সময়ের মধ্যে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য রয়েছে বাংলাদেশের এবং সেটা জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়ংকর চ্যালেঞ্জের মুখে। এই লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশের প্রয়োজন হবে ক্রমবর্ধন হারে বেসরকারি পুঁজি এবং বৈশি^ক আর্থিক বাজারে প্রবেশ।’

বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের আরেক সদস্য ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) কান্ট্রি ম্যানেজার মার্টিন হোল্টম্যান বলেন, ‘বাংলাদেশ বিশে^র অসামান্য উন্নয়ন প্রবৃদ্ধির গল্পগুলোর মধ্যে একটি। আরও বৈচিত্র্যময় এবং প্রতিযোগিতামূলক বেসরকারি খাতের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে বাড়তি সংস্কার রপ্তানি বাড়াবে এবং মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।’ তিনি বলেন, ‘জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা এবং প্রশমনে সবুজ বিনিয়োগ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।’

এই তিনটি প্রকল্পের অনুমোদনের ফলে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) চলমান কর্মসূচি দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশে মিগার বর্তমান কর্মসূচি ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি। আইএফসির প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের কর্মসূচি চলমান রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বব্যাংকের আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে যাচ্ছেন। গতকাল শুক্রবার তিনি জাপান সফর শেষ করে ওয়াশিংটনের উদ্দেশে যাত্রা করেন।

বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাসের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের সঙ্গে সংস্থাটির অংশীদারিত্বের সুবর্ণজয়ন্তী পালন উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী ১ মে সংস্থার ওয়াশিংটন সদর দপ্তরে এ অনুষ্ঠান হবে। তার আগে গতকাল বাংলাদেশের তিনটি প্রকল্পে ১২৫ কোটি ডলার অর্থায়ন অনুমোদন করল বিশ্বব্যাংক।