জাপানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক যদি মুক্তিযুদ্ধের পর থেকেও ধরা হয়, তাহলেও বলা যায় সম্পর্কটি বেশ গভীর। বাংলাদেশ ও জাপান উভয় দেশই শান্তিপূর্ণভাবে তাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনার নীতিতে বিশ্বাসী। সেই ভিত্তিতেই পারস্পরিকভাবে আমাদের সহযোগিতামূলক সম্পর্কটা ৫২ বছর ধরে গড়ে উঠেছে। লক্ষ করলে দেখা যাবে, আমাদের উন্নয়ন সহযোগী যারা আছে, তাদের মধ্যে দিপক্ষীয়ভাবে সবচেয়ে বেশি আর্থিক সহযোগিতা আমরা পাই জাপানের কাছ থেকে। জাপান বিভিন্নভাবে আমাদের সাহায্য করে। সেটা আপনি শিক্ষা, পরিকাঠামো, প্রযুক্তি, কৃষি বা বড় ধরনের অবকাঠামো বলেন, দেখা যাবে বিভিন্নভাবে তারা আমাদের সাহায্য করে আসছে। এত দিন পর্যন্ত বিষয়টা একপক্ষীয় ছিল বলে মনে করা যেতে পারে। আমরা এটাকে কম্প্রিহেন্সিভ পার্টনারশিপ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের মধ্য দিয়ে সেটাকে আমরা এখন স্ট্র্যাটেজিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই। এর অর্থ হলো এই সম্পর্ককে গভীর এবং বিস্তৃত করার মধ্য দিয়ে পারস্পরিকতার একটা নতুন মাত্রা যোগ করা। এই আলোকে দেওয়া-নেওয়ার সম্পর্কটা আরও গভীরতর হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এই পারস্পরিকতাকে আমরা সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করছি।
প্রধানমন্ত্রীর সফরের পর জাপান-বাংলাদেশের যৌথ বিবৃতিটি যদি লক্ষ করি তাতে দেখা যায়, সেখানে অনেকগুলো নতুন নতুন বিষয় নিয়ে কথা বলা হয়েছে। যেমন একটা বিষয় হচ্ছে আন্তর্জাতিক বিষয়ের সংযুক্ততা। লক্ষ করবেন, সাম্প্রতিককালে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে অনেক ধরনের কথাবার্তা হয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরে ইন্দো-প্যাসিফিক ধারণার আলোকে দক্ষিণ চীন সাগরকেন্দ্রিক বিষয়গুলো নিয়ে অনেক আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দিক থেকে আমরা এসব বিষয়ে বেশি কিছু বলি না বা এসব নিয়ে কম কথাই বলে থাকি। লক্ষণীয় যে এবারের আলোচনায় কিন্তু ইউক্রেন এবং ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যুকে জাপানের দিক থেকে সংযুক্ত করার একটা চেষ্টা হয়েছে। তারা ইউক্রেন যুদ্ধটাকে মনে করে প্রচলিত যে রাষ্ট্রব্যবস্থা আছে, সেই কাঠামোকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে পরিবর্তনের চেষ্টা করছে রাশিয়া এবং এতে করে আন্তর্জাতিকভাবে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। জাপান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন এমনই মনে করে। এখানে কিন্তু আমাদের একটু ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। কিন্তু এবারের যৌথ বিবৃতি লক্ষ করলে দেখা যাবে, এখানে বাংলাদেশ এবং জাপান দুই পক্ষই কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের সঙ্গে আমাদের এই অঞ্চলের যে নিরাপত্তাঝুঁকি, সেটাকে একসঙ্গে দেখার চেষ্টা করছে; অর্থাৎ বলার চেষ্টা করছে, ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে ইউরোপে যে সমস্যা ও জটিলতা তৈরি হয়েছে, তার প্রতিক্রিয়া ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলেও এসে পড়ছে। আমরা বাংলাদেশ কিন্তু এ ধরনের বড় প্রেক্ষাপট নিয়ে সাধারণত মন্তব্য করি না। এসব ইস্যুতে আমরা সক্রিয় অবস্থানও তেমন দেখাই না। কিন্তু এবারের এই বিবৃতিতে এ ক্ষেত্রে লক্ষণীয়। কাজেই এর অর্থ হচ্ছে, ইউরোপের নিরাপত্তাকে সংযুক্ত করে জাপান তার ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তাকে যেভাবে দেখতে চায় আমরা এখানে সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে মোটামুটিভাবে গ্রহণ করছি। এই জায়গায় একটা নতুন ডাইমেনশন আসছে, একটা দেওয়া-নেওয়ার জায়গাও তৈরি হচ্ছে।
দুই-তিন দিন আগেই কিন্তু ইন্দো-প্যাসিফিক এরিয়া নিয়ে আমরা আমাদের ভাবনা বা আউটলুক প্রকাশ করেছি। এ ক্ষেত্রে জাপানিদের ভূমিকা অবশ্য অনেক বেশি সক্রিয়। এখানে যেভাবে বিবৃতিটা এসেছে, তাতে জাপানের সক্রিয় অবস্থান বা দৃষ্টিভঙ্গির একটি নমুনা দৃশ্যমান। আমরা তো বলে থাকি যে সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব। এসব ক্ষেত্রে যেটা হয়, নর্থ কোরিয়া ও সাউথ কোরিয়া সম্পর্কে যখন একটা মন্তব্য থাকে বা চীনের ক্ষেত্রে (এখানে যদিও নাম বলা হয়নি), এখানে একটা ব্যাখ্যার অবকাশ তৈরি হয়। আমরা সচরাচর এই জায়গাগুলো এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। এই বিবৃতিতে কিন্তু এ বিষয়গুলো আছে। এর মানে হচ্ছে, আমি যখন জাপানকে বন্ধু হিসেবে কাছে পেতে চাই, জাপানও তার বন্ধু হিসেবে আমাকে কাছে পেতে চাইছে। কাজেই এখানে একটা দেওয়া-নেওয়ার জায়গা তৈরি হচ্ছে।
মিয়ানমারের কথা ধরলে যেমন রোহিঙ্গা ইস্যুর কথা আসে। এখানে আমরা রোহিঙ্গা ইস্যুর কথা বলি। কিন্তু আমরা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামো কী হবে এবং সেখানে যে আসিয়ানের ৫ দফা আছে, সেটা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সেখানকার রাজনৈতিক নেতাদের ছাড়া হবে কি না- এসব নিয়ে কিন্তু সচরাচর আমরা কথা বলি না। কারণ আমরা মনে করি রোহিঙ্গা সমস্যাটা মিয়ানমার থেকে উদ্ভূত এবং আমরা মিয়ানমারের সঙ্গে সমস্যাটার সমাধান করব। সেখানে কোন ধরনের সরকার আছে কি নেই, সে ব্যাপারে আমরা কম কথা বলি। এখানে কিন্তু স্পষ্ট করেই কথাগুলো বলা হয়েছে।
মাতারবাড়ীর কথা যদি ধরি, সেখানে যে বিদ্যুৎ ও গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প, একে কিন্তু আমরা জাপানের একটি দিপক্ষীয় আর্থিক সহায়তা বলেই মনে করি। কিন্তু বিবৃতিতে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে তাদের যে একটি আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, তা তারা জানিয়েছে। সেখানে তারা একটি আঞ্চলিক হাব করতে চায়। ফলে প্রতিবেশী অন্যদেরও এখানে সংযুক্ত করার বিষয় চলে আসে। আমরা পরস্পরের সঙ্গে কাজ করতে অবশ্যই আগ্রহী। সে কথা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও কিন্তু বলেছেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সাম্প্রতিককালে এই মাতারবাড়ী প্রকল্প এবং বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত ও এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশকে সংযুক্ত করে একটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভ্যালু চেইন ডেভেলপের চেষ্টা করার কথা বলেছেন। আমার কাছে আইডিয়াটা খুব ভালো মনে হয়েছে। জাপান যেভাবে দেখে, আমরা কিন্তু সেভাবেও চিন্তা করতে পারি। এ বিষয়গুলোকে বিবেচনায় নিলে দুই দেশের একটা দেওয়া-নেওয়ার চেহারা ফুটে ওঠে। আপনি যখন স্ট্র্যাটেজিক বিষয় বলেন, তখন কিন্তু এ বিষয়গুলো আসে।
নতুন করে যা বলা হচ্ছে সেটা হলো, সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়। ঢাকা ও টোকিওতে দুই দেশ তাদের দূতাবাসে সামরিক শাখা খোলার জন্য তৈরি হচ্ছে। জাপান সরকার সাম্প্রতিককালে তাদের উন্নয়ন সহযোগিতার মধ্যে সামরিক উপাদানগুলো নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। সাধারণত জাপান এর আগে কিন্তু সামরিক বিষয়ে তেমন উৎসাহী ছিল না। কিন্তু কিশিদা সরকার আসার পর থেকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাপান এসব বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছে এবং সেখানে আমরাও তাদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী হয়েছি। এটাকেও নতুন ডাইমেনশন হিসেবে ধরা যায়। পাশাপাশি জাপানে ম্যানপাওয়ার এক্সপোর্ট করার বিষয়টিও একটা আইডিয়া হিসেবে এসেছে। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীই এ নিয়ে কথা বলেছেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। এভাবে সম্পর্কের নতুন নতুন এলাকা বা সম্ভাবনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সবকিছু বিবেচনা করে আমি মনে করি যে আমরা কৌশলগত সহযোগিতার সম্পর্ককে সেখানে নিয়ে যেতে চাই, যাকে বহুমুখীকরণও বলা যেতে পারে। কম্প্রিহেন্সিভ ছিল, এখানে কৌশলগতভাবে আমরা স্ট্র্যাটেজিক বলছি; মানে সম্পর্কটাকে আমরা আরেকটু উন্নত স্তরে নিয়ে গেলাম। সেই জায়গায় আমার অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখতে তৈরি থাকতে হবে।
এত দিন ধরে আমরা যেভাবে কূটনীতি করি, সচরাচর আমরা কারোর পথ মাড়াই না, কেউ আমার পথ মাড়াক, সেটাও আমরা চাই না। কিন্তু এখন আপনি যখন বড় খেলায় অংশগ্রহণ করবেন, তখন কিন্তু আপনার পথ অন্য কেউ মাড়াতে আসতে পারে আবার আপনিও অন্যের পথ মাড়িয়ে ফেলতে পারেন। সেই জায়গা থেকে আমাদের কূটনৈতিক অবস্থান ও সক্ষমতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পাশাপাশি সুযোগগুলো কাজে লাগাতে হবে। এই দুটি জায়গা থেকে আমাদের সব পর্যায়ে কূটনৈতিক সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। এখানে আমি মনে করি যে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরটা সেই বিবেচনায় একটা মাইলস্টোন; যা নির্দেশনামূলক বা নতুন সম্ভাবনা ও গতির সঞ্চার করল। সেই জায়গায় আমরা উপকৃত হয়েছি। এরই আলোকে জাপানের প্রায়োরিটি বা প্রাধান্যের কথা মনে রেখে, আমাদের কিন্তু এই বড় প্রেক্ষাপটে সম্পর্কটাকে বজায় রাখার এবং সামনে নিয়ে যাওয়ার জন্য নতুন চিন্তা-ভাবনা, নতুন কর্মপরিকল্পনা, নতুন সক্ষমতা দেখাতে হবে। বলা বাহুল্য, সেটা কূটনৈতিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই করতে হবে। সেই সঙ্গে আমাদের অভ্যন্তরীণ কিছু বিষয় আছে, সেগুলোকেও সমন্বিতভাবে এই প্রস্তুতির মধ্যে নিয়ে আসতে হবে।
লেখক : যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত