মে দিবসের কর্মসূচি দিয়ে ফের মাঠে নামছে বিএনপি

সরকারের পদত্যাগ, সংসদ ভেঙে দেওয়া ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ ১০ দফা দাবি আদায়ে বিএনপি চলমান আন্দোলন নতুন করে শুরু করতে যাচ্ছে। মহান মে দিবসে আগামী সোমবার রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বিক্ষোভ সমাবেশ, পদযাত্রাসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে ঈদ-পরবর্তী আন্দোলন। বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।

তারা জানান, সমমনা দলগুলো নিজেদের মতো করে এ কর্মসূচি পালন করবে। এরপর ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে শরিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে যৌথ ইশতেহারের পাশাপাশি পরবর্তী আন্দোলন কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হবে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে কাজ না হলে হরতাল, অবরোধের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে দাবি মানতে সরকারকে বাধ্য করা হবে।

ঈদ-পরবর্তী আন্দোলন-সংগ্রামের কর্মসূচির ধরন সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা পয়েন্ট অব নো রিটার্নে চলে গেছি। আমাদের পিছু হটার কোনো সুযোগ নেই। কোনো বিকল্প নেই। দাবি আদায়ে বিএনপি আগামী দিনে শান্তিপূর্ণভাবে এমন আন্দোলনের কর্মসূচি চালিয়ে যাবে, যা দেশবাসী অতীতে কখনো দেখেনি। শান্তিপূর্ণভাবে আমরা রাজপথ দখলে নেব। এরপর সরকার হটকারী কোনো সিদ্ধান্ত নিলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রয়োজনে হরতাল, অবরোধের মতো কর্মসূচি চালিয়ে যাব।’

দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশ যাবে কোন পথে ফয়সালা হবে রাজপথে। আমরা রাজপথেই অবৈধ আওয়ামী লীগ সরকারকে মোকাবিলা করব। আইয়ুব, ইয়াহিয়া, স্বৈরাচার এরশাদ গেছে যে পথে শেখ হাসিনা যাবেন সে পথে।’

ড. মোশাররফ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সফরে গেছেন। জাপানে রাষ্ট্রীয় সফর হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে ব্যক্তিগতভাবে যাচ্ছেন। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা যুক্তরাজ্য সরকারের কেউ তাকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানাবে না। কারণ অবৈধ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ধরনা দিতে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা। দেশের জনগণ সরকারকে প্রত্যাখ্যান করেছে। এখন বহির্বিশে^র বন্ধুপ্রতিম দেশগুলো তাকে প্রত্যাখ্যান করছে। দেশের অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে তার এসব সফরে রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় হবে। যেখানে কৃচ্ছ দেখানোর কথা, সেখানে বিশাল লটবহর নিয়ে বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।’

আগামী দিনের আন্দোলন-সংগ্রামের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপি জনগণের দল। জনগণ এখন সরকারের হাতে জিম্মি। তাদের উদ্ধারে পরিবর্তন আবশ্যক। ঈদের আগে-পরে ব্যাপার নয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঐক্য নিয়ে আমরা জনগণের কাতারে দাঁড়াব। ফ্যাসিস্ট সরকারের হাত থেকে দেশের গণতন্ত্র ফিরিয়ে নেওয়ার যে দায়িত্ব তা অস্বীকার করা যায় না। তাই পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কর্মসূচি নির্ধারণ করা হবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরের বিষয়টি তারা পর্যবেক্ষণ করছেন। পাশাপাশি তারা আন্দোলন কর্মসূচি নিয়ে সবার সঙ্গে আলোচনা করছেন। এরপর সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আন্দোলন স্বল্পমেয়াদি নাকি দীর্ঘমেয়াদি হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিএনপি ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি থেকে বিরত থাকবে জানিয়ে ওই নেতা বলেন, সরকার বাধ্য করলে হরতাল, অবরোধের মতো ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি দিয়ে সরকারের পতন নিশ্চিত করা হবে।

গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক সুব্রত চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামী দিনের আন্দোলন-সংগ্রামের রূপরেখা চূড়ান্ত করতে বিএনপির সঙ্গে বৈঠকে বসবেন তারা। এ সময় যৌথ ইশতেহার ও আন্দোলন কর্মসূচির ধরন নিয়ে আলোচনা হবে। ইতিমধ্যে ঐক্যবদ্ধভাবে সারা দেশে গণমিছিল, সমাবেশ, মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচির মতো কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। এখন নতুন কিছু কর্মসূচি সামনে নিয়ে আসার বিষয়ে আলোচনা হবে বৈঠকে।’

গণসংহতি আন্দোলন সূত্রে জানা গেছে, মে দিবস উপলক্ষে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো নিজেদের মতো করে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ ও পালন করবে। এরপর ২ বা ৩ মে বিএনপির লিয়াজোঁ কমিটির সঙ্গে দলটির বৈঠক হবে। বৈঠকে আলোচনা করে পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করা হবে।

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে একটি যৌথ ইশতেহার ঘোষণার প্রস্তুতি চলছে। সেটি আগামী বৈঠকে চূড়ান্ত করা হবে। পাশাপাশি কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হবে। আলোচনা করে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।’

ঈদ-পরবর্তী আন্দোলন-সংগ্রামের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঈদ-পরবর্তী আন্দোলন-সংগ্রামের কর্মসূচি নির্ধারণে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের সাংগঠনিক সম্পাদকদের সঙ্গে গত পরশু বৈঠক করেছেন। যুগ্ম মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন। সবার সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করা হবে।’

তিনি বলেন, সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক হবে। দলের স্থায়ী কমিটির সভায়ও আলোচনা হবে। এরপর ঠিক হবে আন্দোলনের কর্মসূচির ধরন।

২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি সরকার পতনের ডাক দিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধ ডাকে বিএনপি। পরে অবরোধের পাশাপাশি ডাকা হয় হরতাল। কিন্তু সেই দুটি কর্মসূচিই একপর্যায়ে ভেস্তে যায়। আর ওই বছরের শেষ দিকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপি। তখনকার সেই অবরোধ ভেস্তে যাওয়ার পর বিএনপি আর কোনো বড় কর্মসূচিতে যায়নি। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচিত সরকারের অধীনেই অংশ নেয় দলটি।