রপ্তানি বাড়াতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৬১টি মিশন রয়েছে। এসব মিশনকে প্রতি বছর রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। বাংলাদেশি পণ্যের দূত হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি রপ্তানির গতি বাড়াতে নতুন নতুন আমদানিকারকের সঙ্গে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকের পরিচয় করিয়ে দেওয়া এসব মিশনের মূল কাজ। তবে এতে ব্যর্থ হচ্ছে অধিকাংশ মিশন। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) ৬১টি মিশনের মধ্যে ৩৪টি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।
এমনকি বিদেশের মিশনগুলোর মধ্যে ১৯টি মিশনের বাণিজ্যিক উইং রয়েছে, যেগুলোর ১০টি তাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) এ তথ্য জানিয়েছে। ইপিবির হিসাবে, চলতি হিসাব বছরের জুলাই-মার্চ পর্যন্ত বিদেশে অবস্থানরত ৬১টি মিশনের মাধ্যমে সরকারের রপ্তানি আয় এসেছে ৪০ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যা রপ্তানি আয়ের ৯৭ শতাংশ।
ইপিবির তথ্য মতে, ৬১ মিশনের মধ্যে লন্ডন, নয়াদিল্লি, টোকিও, সিউল, নিউ ইয়র্ক, ভিয়েনা ও ব্যাংককের মতো ২৭টি মিশন তাদের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সমর্থ হয়েছে। তবে তথ্য-বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাণিজ্যিক উইং থাকা সত্ত্বেও বেশ কটি শহরের বাজার নেতিবাচক ধারায় চলে গেছে। যেমন চীনের বেইজিং শহরের বাণিজ্যিক উইংয়ের মাধ্যমে গত অর্থবছরের ৯ মাসে প্রায় ৫৫ কোটি ডলার আয় হলেও চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৮ কোটি ডলারে।
তা ছাড়া, বাণিজ্যিক উইংগুলোর মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি আয় হওয়া শহরের মধ্যে ওয়াশিংটন অন্যতম। এ উইং থেকে গত বছরের একই সময়ে ৭৬৭ কোটি ডলারের আয় হলেও এ বছরের মার্চে তা ৫ শতাংশ কমে প্রায় ৭২৫ কোটি ডলারে এসেছে।
মিশনের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর দুবাইয়ের অবস্থাও দিন দিন খারাপ হচ্ছে। ২০২১-২২ অর্থবছরের ৯ মাসে ৫৯ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের রপ্তানি আয় হলেও চলতি বছরের একই সময়ে তা ৪৫ কোটি ডলারে নেমেছে। এক বছরের ব্যবধানে ২৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ পিছিয়ে আছে দুবাইয়ের রপ্তানি আয়।
তথ্য বলছে, এখনো পর্যন্ত ৪২ মিশনে কোনো ধরনের বাণিজ্যিক উইং খুলতে পারেনি সরকার। এসব মিশনে বাণিজ্যিক উইং না থাকলেও রপ্তানি আয় এসেছে সাড়ে ৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যা রপ্তানি আয়ের প্রায় ২৩ শতাংশ। ৪২ মিশনের মধ্যে মাত্র ১৮ মিশন তাদের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পেরেছে। এই মিশনগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ ব্রাসিলিয়া, দ্য হেগ, মেক্সিকো সিটি, নিউ ইয়র্ক, ভিয়েনা, ব্যাংকক, আদ্দিস আবাবা, আল জিয়ার্স, লিসবন, থিম্পু, রোম, কলম্বো, বুখারেস্ট, কুয়েত, এথেন্স, স্টকহোম, হংকং ও বৈরুত।
ব্যর্থ হওয়া ৩৪ মিশনের মধ্যে ১৪ মিশন তাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারলেও গত বছরের রপ্তানি আয়ের তুলনায় এ বছর কিছুটা প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ব্রাসেলস, তেহরান, ওটওয়া, রিয়াদ ও কোপেনহেগেনের মতো মিশনগুলো রয়েছে এ তালিকায়।
তবে ব্যর্থ হওয়া ৩৪ মিশনের মধ্যে ২৪টি তাদের লক্ষ্যমাত্রা অনেক দূরে রয়েছে। এ তালিকায় বার্লিন, ইয়াঙ্গুন, মস্কো, দুবাই, জেনেভা ও ওয়াশিংটনের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহর রয়েছে।
ইপিবির হিসাবে, বাণিজ্যিক উইংগুলোর মাধ্যমে সরকারের রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় ৩১ বিলিয়ন ডলার। যেটি রপ্তানি আয়ের ৭৪ শতাংশেরও বেশি।
বাংলাদেশি পণ্যের অন্যতম রপ্তানি গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোয় বর্তমানে শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধায় পণ্য রপ্তানি করা যায়। ২০২৯ সাল পর্যন্ত এ সুবিধা বহাল থাকবে। এটাকে রপ্তানি আয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ভবিষ্যৎ নিয়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার পরও বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে আশাবাদ দেখছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সে অনুযায়ী বাংলাদেশ আগামী ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হবে। এজন্য কিছু সুবিধা কমবে, যেগুলো এত দিন অন্যসব এলডিসির মতো বাংলাদেশ পেয়ে আসছিল।
আইএমএফ প্রাক্কলন করে বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় হবে ৭ হাজার ৫৮ কোটি ডলার, যা ২০২০-২১ অর্থবছরের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। ২০২০-২১ অর্থবছরে রপ্তানি আয় হয়েছিল ৩ হাজার ৬৯০ কোটি ডলার। গত ৩০ জানুয়ারি আইএমএফ ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণপ্রস্তাব অনুমোদন করার পর বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক সম্পর্কে যে প্রাক্কলন করেছে, তাতে এ তথ্য উঠে এসেছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনীতিতে মন্দায় পশ্চিমা দেশগুলোর বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় রপ্তানি থেকে মার্চে বাংলাদেশের আয় ২ দশমিক ৪৯ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। মার্চে বাংলাদেশের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ দশমিক শূন্য ২ বিলিয়ন ডলার। লক্ষ্যমাত্রা থেকে আয় কম হয়েছে সাড়ে ৭ শতাংশ। অবশ্য মার্চে রপ্তানি নেতিবাচক ধারায় চলে গেলেও চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) রপ্তানিতে আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৮ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে সামগ্রিক আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ শতাংশ বেড়ে ৪১ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার হয়েছে।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে রপ্তানির বড় খাতের মধ্যে তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, চামড়াবিহীন জুতা এবং প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তার বিপরীতে পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, হিমায়িত খাদ্য, প্রক্রিয়াজাত
কৃষিপণ্য, প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি কমে গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ৪ হাজার ১৭২ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। আগের বছরের একই সময় পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৮৬১ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ৩ হাজার ৫২৫ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এই আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ১৭ শতাংশ বেশি।