গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হবে আগামী ২৫ মে। ইতিমধ্যে এই নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য প্রার্থীরা তাদের মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। গত বুধবার ছিল মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। আজ রবিবার মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের কাজ সম্পন্ন হবে। আর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন আগামী ৮ মে। এবারের নির্বাচনে গাজীপুরবাসীসহ সারা দেশের মানুষের দৃষ্টি মূলত মেয়র পদপ্রার্থীদের ঘিরে। এবারও গাজীপুর সিটির মেয়র নির্বাচনে আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন তিনি। তবে তিনি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী মাঠের লড়াইয়ে টিকে থাকতে পারবেন কি না তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন তার কর্মী-সমর্থকরা।
২০১৮ সালে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তিন বছর দায়িত্ব পালন করে ২০২১ সালের ১৯ নভেম্বর আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার হন জাহাঙ্গীর আলম। ওই বছরের ২৫ নভেম্বর হারান মেয়র পদ। এক বছর দুই মাস পর ২০২৩ সালের ২৩ জানুয়ারি জাহাঙ্গীর আলম দলে ফেরার চিঠি পান। কিন্তু ফিরে পাননি মেয়র পদ।
গাজীপুর সিটি করপোরেশন ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই মেয়র পদে আলোচনায় আসেন তরুণ রাজনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম। ওই বছর তিনি দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। যদিও পরে তিনি নির্বাচন থেকে সরে গিয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে অ্যাডভোকেট আজমত উল্লা খান দলীয় মনোনয়ন পেয়ে বিএনপির প্রার্থী অধ্যাপক এম এ মান্নানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে পরাজিত হন।
২০১৮ সালে ফের আলোচনায় আসেন জাহাঙ্গীর আলম। তখন তিনি গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক। সেবার তিনি দলীয় মনোনয়ন পেয়ে নৌকা প্রতীকে মেয়র পদে নির্বাচন করেন। বিপুল ভোটে বিএনপির প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারকে পরাজিত করে মেয়র পদে নির্বাচিত হন। তখন থেকেই গাজীপুরে জাহাঙ্গীর-বিরোধীরাও থাকেন তৎপর। সুযোগ বুঝে জাহাঙ্গীর-বিরোধীরা তার গোপনে ধারণ করা একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। ওই অডিওতে জাহাঙ্গীর আলমের কণ্ঠে মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্য শুনতে পাওয়া যায়। এরপর নগর জুড়ে জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলতে থাকে। একপর্যায়ে আওয়ামী লীগ থেকে তাকে শোকজ ও পরে আজীবন বহিষ্কার করা হয়। তিনি হারান মেয়রের পদও।
চার মাস আগে জাহাঙ্গীর আলমকে আওয়ামী লীগে ফিরিয়ে নিলেও ফিরে পাননি মেয়র পদ। এর মধ্যে গত ৩ এপ্রিল গাজীপুর সিটি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। এবারের নির্বাচনেও তিনি মেয়র পদে প্রার্থী হিসেবে প্রচার-প্রচারণা চালাতে থাকেন। কিন্তু এবার তিনি দলের মনোনয়ন পাননি। আওয়ামী লীগ গাজীপুর সিটির জন্য মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট আজমত উল্লাকে মনোনয়ন দেয়। আর জাহাঙ্গীর আলম ফের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মনোনয়নপত্র জমা দেন। তিনি ছাড়াও তার মায়ের নামেও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় তিনি গ্রেপ্তার হওয়া বা গুম হওয়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করেন।
নির্বাচনী মাঠে জাহাঙ্গীর আলমের বিপুলসংখ্যক কর্মী-সমর্থক রয়েছে। আসন্ন নির্বাচনে তারা জাহাঙ্গীর আলমের পক্ষে কাজ করার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। কিন্তু তারা মাঠে নামছেন না জাহাঙ্গীর আলমের নির্বাচন করতে পারা না পারার বিষয়ে সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত।
কর্মী-সমর্থকদের দাবি, জাহাঙ্গীর আলম যদি নির্বাচনের মাঠে টিকে থাকতে পারেন তবে তার জয় অনেকটা নিশ্চিত। আর যদি নির্বাচনী মাঠে না থাকেন তবে তার বিপুলসংখ্যক কর্মী বাহিনী কী করবেন সেজন্য জাহাঙ্গীর আলমের দিকনির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছেন।
জাহাঙ্গীর আলম মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দিনই সাংবাদিকদের বলেছেন, নির্বাচন থেকে স্বেচ্ছায় তার সরে যাওয়ার কোনো পথ নেই। যদি না চাপ দিয়ে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
গাজীপুর নগরীর ছয়দানা মালেকের বাড়ি এলাকায় নিজের বাসভবনে গতকাল শনিবার দুপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন জাহাঙ্গীর আলম। এ সময় তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বী মেয়র পদপ্রার্থী আজমত উল্লা খানকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘তার (আজমত উল্লা) ওপর অনেক ছায়া আছে। আর আমি হচ্ছি একা। আমি একা দাঁড়িয়েছি। আসেন ভোট করি, ভোটের মাধ্যমে প্রমাণ হোক কে ভালো মানুষ, কে দুর্নীতিবাজ, কে ভালো লোক। আমি সে প্রমাণটা দিতে চাই। টঙ্গীতে আজমত উল্লা খান ১৮ বছর পৌরসভার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেখানে তিনি একটা ড্রেনও করেননি। একটি গাছও লাগাননি। একটি স্কুল, কলেজ ও মসজিদও করেননি। তিনি টঙ্গীবাসীর কাছে এসবের প্রমাণ দিক।’
আজমত উল্লা খানকে তার সঙ্গে মুখোমুখি বসার আহ্বান জানিয়ে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘যেকোনো চ্যানেলে বা যেকোনো মঞ্চে একসঙ্গে সামনাসামনি বসতে চাই। আমি লুকোচুরি করে কিছু করতে চাই না। তিনি (আজমত উল্লা) ১৮ বছরে কী করেছেন আর আমি তিন বছরে কী করেছি সেটার প্রমাণ দিতে চাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০১৮ সালে এই নগরীর মানুষ আমাকে ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত করেছিল। আমি তিন বছর দায়িত্ব পালন করেছি। আমি আদালতের কাছে গিয়েছি। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে গিয়েছি। সব জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করেছি। একটা মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে চিঠি দিয়ে আমাকে মেয়র পদ থেকে সরানো হয়েছে। এক দিনে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, এক দিনে প্যানেল মেয়র দেওয়া হয়েছে। এক দিনেই বিচারকাজ শুরু হয়েছে। যে বরাদ্দ মন্ত্রণালয় আমাকে দেয়নি সে ব্যাপারে আমাকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। যারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছেন তারা কেউ গাজীপুর নগরীর ভোটার না।’