দেশে বিভিন্ন কোম্পানির নানা ধরনের কোমলপানীয় বিক্রি হচ্ছে এবং এর বাজারও অনেক বড়। কিন্তু সে হিসাব এতদিন ভোক্তা মূল্যসূচকে (সিপিআই) আসত না। তবে এপ্রিল মাসের সিপিআই বা মূল্যস্ফীতির হিসাবে ফুড ড্রিংকসসহ ৭২০টি পণ্যের হিসাব তুলে ধরা হবে। এতদিন মূল্যস্ফীতির হিসাবে ৪২২টি পণ্য বিবেচনায় নেওয়া হতো। এতে মূল্যস্ফীতির হিসাবে পরিবর্তন আসতে পারে। এ ছাড়া ২০২৪ সালের শুরু থেকে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসাব ত্রৈমাসিক তথ্যে তুলে ধরবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। এ বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিনিধিদলকে অবহিত করা হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার বিবিএসের মহাপরিচালক মো. মতিয়ার রহমানের দপ্তরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আইএমএফ প্রতিনিধিদল এ তিনটা বিষয়ে জানতে চায়। বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদনের প্রায় ৩ মাস পর ঢাকায় স্টাফ কনসালটেশন মিশন পাঠায় আইএমএফ। সংস্থাটির এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের প্রধান রাহুল আনন্দের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় অবস্থান করছে।
সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে আধুনিক পদ্ধতিতে মূল্যস্ফীতি (কনজিউমার প্রাইস ইনডেক্স), ডাটাবেজ, জিডিপি (গ্রস ডমেস্টিক প্রডাক্ট) এবং ত্রৈমাসিক জিডিপির তথ্য দেওয়ার অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চেয়েছে আইএমএফ। এ বিষয়ে আইএমএফকে অবগত করেছে বিবিএস। স্বাধীনতার পর থেকে বিগত ৫০ বছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি অর্জনের ধারাবাহিক তথ্যও চেয়েছে আইএমএফ।
বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছে প্রতিনিধিদল। অর্থ বিভাগের সামষ্টিক অর্থনীতি, ট্রেজারি ও ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং বাজেট উইংয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঋণের শর্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতির বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। এ ছাড়া শর্ত বাস্তবায়ন ও সংস্কারে আগামী অর্থবছরের বাজেটে কী থাকছে সেগুলোও আলোচনায় উঠে আসছে। এ ধারাবাহিকতায় আইএমএফ প্রতিনিধিদল বিবিএসের সঙ্গে বৈঠক করেছে।
আইএমএফের সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে বিবিএস ডিজি মতিয়ার রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেছি। তিনটা কাজের অগ্রগতির বিষয়ে প্রতিনিধিদল জানতে চেয়েছে আমরাও তাদের অবগত করেছি। আমরা বলেছিলাম জিডিপি তথ্য স্বাধীনতার পর থেকে বই আকারে প্রকাশ করব তাই করা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতির নতুন মেথডের বিষয়ে জানতে চেয়েছে আমরা এ বিষয়ে অবগত করেছি।’
তিনি আরও বলেন, মূল্যস্ফীতির হিসাব যেভাবে করি এই পদ্ধতিতে আর করছি না এটার পরিবর্তন হচ্ছে। এখন সারা বিশ্বে ৯৫ শতাংশ দেশ আইএমএফ মিক্স মেথডে মূল্যস্ফীতি বের করছে। খাবার ও নানা পণ্যে নতুন নতুন আইটেম নিয়ে আসছি। নতুন করে ফুড ড্রিংকস নিয়ে এসেছি। নতুন মূল্যস্ফীতিতে খাদ্যপণ্য ১৫৩ এর জায়গায় ২৬৩টি হবে। ৭২০ পণ্য মিক্সড মেথডে স্থান পাবে। নতুন মেথডে সিপিআই প্রকাশ হবে।
বিশ্বের প্রায় সব দেশ জিডিপির হিসাব বছরে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতেই প্রকাশ করে থাকে। বাংলাদেশ করে বছরে একবার। প্রকৃত জিডিপির হিসাব কমতির দিকে থাকলে তা প্রকাশ করতে দেড় থেকে দুই বছর লাগিয়ে দেওয়ার উদাহরণও রয়েছে দেশে। আবার যে কাজ বিবিএস করার কথা, তা অনেক সময় অর্থ মন্ত্রণালয়ও করে বসে।
ত্রৈমাসিক জিডিপি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তথ্য বছরে চারবার প্রকাশ করবে সরকার। তবে তা শুরু হবে ২০২৪ পঞ্জিকা বছর থেকে। তথ্য-উপাত্ত নিয়ে আমরা কাজ করছি। এটা প্রস্তুতির অংশ হিসেবে। আইএমএফ এ বিষয়ে জানতে চেয়েছে।
ভিডিও কলের জন্য ইমো, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ যেন অপরিহার্য হয়ে গেছে। স্কুল-কলেজপড়ুয়া অনেক শিক্ষার্থী এখন অনলাইনে প্রাইভেট পড়ে। এসব চালাতে ইন্টারনেট সংযোগ নেওয়া হয়, কিংবা ‘এমবি’ কেনা হয়। এসবে অনেক খরচ হয়। আবার যাতায়াতের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। উবার-পাঠাও তো আছে। আগে যেখানে গ্রামগঞ্জে মোটরসাইকেল, ইজিবাইক তেমন একটা দেখা যেত না, এখন এসব যানবাহনের সংখ্যা ব্যাপক বেড়েছে। ফলে আপনার যাতায়াতে বৈচিত্র্য যেমন এসেছে, খরচও বেড়েছে।
খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন এসেছে। দেড় যুগ আগে রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় ও জেলা শহরে তেমন একটা ফাস্টফুড, কফিশপ ছিল না। এমনকি মোড়ে মোড়ে চায়ের দোকানও খুব একটা বেশি ছিল না। এখন অহরহ এসব দেখা যায়। এর মানে, এসবের চাহিদা বেড়েছে, মানুষ টাকাও খরচ করছে।
আবার সরু চাল খাওয়া বেড়েছে। সয়াবিন ও পাম তেলের একচ্ছত্র বাজারে আঘাত হেনেছে রাইস ব্র্যান, সূর্যমুখী তেল। দৈনন্দিন জীবনে টিস্যু পেপার, বোতলজাত পানীয়, প্যাকেটজাত খাবার ইত্যাদির ব্যবহার বেড়েছে।
দেড় যুগে এভাবেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও ভোগে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। মূল্যস্ফীতির হার দিয়েই এসব মাপা হয় কত খরচ বাড়ল, কত কমল। জিনিসপত্র বা সেবার মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে নিজের আয় বৃদ্ধির সংগতি আছে কি না এ সবই মূল্যস্ফীতি গণনার ওপর নির্ভরশীল।
বিবিএস মূল্যস্ফীতির হিসাবে আমূল পরিবর্তন আনছে। ২০০৫-০৬ ভিত্তি বছর অনুযায়ী এখন মূল্যস্ফীতি গণনা করা হয়। এর পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি হিসাব করা হবে ২০২১-২২ ভিত্তি বছর ধরে।
নতুন ভিত্তি বছরে গত দেড় যুগে মানুষের খরচের ধরনে যেসব পরিবর্তন এসেছে তাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। যেমন ২০০৫-০৬ ভিত্তি বছর মাত্র ৪২৬টি পণ্য ও সেবা দিয়ে মূল্যস্ফীতি হিসাব করা হয়। নতুন ভিত্তি বছরে আরও প্রায় ৩০০ পণ্য ও সেবা বাড়ছে। নতুন হিসাবে সব মিলিয়ে ৭২২টি পণ্য ও সেবা থাকবে।