প্রধান সুবিধাভোগী বীমার শেয়ার

বাজার চাঙ্গা করতে মার্জিন ঋণ সুবিধার ওপরই নির্ভর করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। কয়েক দফায় মার্জিন ঋণের হার সর্বোচ্চ বাড়ানোর পর এবার নির্দিষ্ট কিছু সিকিউরিটিজে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়াতে মূল্য-আয় অনুপাতে (পিই রেশিও) আরও সুবিধা দিয়েছে এসইসি। এর সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হচ্ছে সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলো। এসব কোম্পানির প্রায় সবগুলোর পরিশোধিত মূলধন ৩০ কোটি টাকার বেশি এবং নিয়মিতভাবে ১০ শতাংশ কিংবা তার চেয়ে বেশি লভ্যাংশ দিয়ে আসছে।

গত বুধবার নতুন এক নির্দেশনায় যেসব কোম্পানি তিন বছর ধরে একটানা ‘এ’ শ্রেণিভুক্ত রয়েছে এবং যাদের পরিশোধিত মূলধন ন্যূনতম ৩০ কোটি টাকা, সেসব শেয়ারে ৫০ মূল্য-আয়ের অনুপাত বা পিই রেশিও পর্যন্ত ঋণসুবিধা পাবেন বিনিয়োগকারীরা। এর আগে গত ১৮ এপ্রিল তিন বছর ধরে একটানা ‘এ’ শ্রেণিভুক্ত কোম্পানি এবং যাদের পরিশোধিত মূলধন ৫০ কোটি টাকার বেশি সেসব শেয়ারে ৫০ মূল্য-আয় অনুপাত পর্যন্ত ঋণসুবিধা দেওয়া হয়েছিল। এখন এ সুবিধা ৩০ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধনী কোম্পানির জন্য দেওয়া হয়েছে।

মূলত বীমা কোম্পানিগুলোর শেয়ার বর্ধিত এ সুবিধা পাবে বলে জানা গেছে। পরিশোধিত মূলধন ৩০ কোটি টাকার নিচে কোনো সাধারণ বীমা কোম্পানি নেই এবং এ খাতের প্রায় সবগুলো ‘এ’ ক্যাটাগরির। বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ৪৩টি সাধারণ বীমা কোম্পানি রয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে কম পরিশোধিত মূলধন রয়েছে অগ্রণী ইন্স্যুরেন্সের। এ কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন হচ্ছে ৩১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। আর ৩০ থেকে ৫০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনী কোম্পানির সংখ্যা ৩০টির।

দীর্ঘদিন ধরে ফ্লোর প্রাইসে পড়ে থাকা সাধারণ বীমা কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়াতেই মার্জিন ঋণের বর্ধিত সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। ২০২০ সালে বীমা কোম্পানির শেয়ারে কারসাজির মাধ্যমে পুঁজিবাজার চাঙ্গা করতে প্রধান ভূমিকা রেখেছিল। এখন ফ্লোর প্রাইসে পড়ে থাকা এসব শেয়ারে মার্জিন সুবিধার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই ৫০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানির জন্য যে সুবিধা দেওয়া হয়েছিল, ঈদ-পরবর্তী সময়ে তা বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।  

এতদিন পিই রেশিও ৪০ পর্যন্ত রয়েছে, এমন শেয়ারে ঋণ সুবিধা ছিল। এসইসির নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শুধু ভালো মৌলভিত্তির শেয়ার ছাড়া অন্যান্য শেয়ারের বিপরীতে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে ৪০-পিইর বাধ্যবাধকতা বলবৎ থাকবে। পাশাপাশি এ সংক্রান্ত কমিশনের আগের নির্দেশনার কার্যকারিতা রদ করা হয়েছে।

কমিশন সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান বৈশি^ক প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন কোম্পানির আয় বা মুনাফা কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে করে বিভিন্ন কোম্পানির পিই রেশিও ৪০ অতিক্রম করে ফোর্সড সেল বা বাধ্যতামূলক বিক্রি বেড়ে যেতে পারে। মূলত এটি ঠেকাতেই ভালো কোম্পানিগুলোতে ঋণসুবিধা বাড়ানোর এই উদ্যোগ নিয়েছে কমিশন।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়ে। এতে করে ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আয় কমে যাওয়ার শঙ্কায় প্রবল বিক্রিচাপের মুখে পড়ে বাজার। এমন পরিস্থিতিতে বাজারে ধস ঠেকাতে গত বছরের ২৮ জুলাই দ্বিতীয়বারের মতো ফ্লোর প্রাইস আরোপ কমে কমিশন। এরপর থেকেই বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ কমে গিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জের লেনদেন তলানিতে নেমে আসে। মৌলভিত্তির বেশির ভাগ কোম্পানির শেয়ার দর ফ্লোর প্রাইসে আটকে যায়। এই পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার সব ধরনের অবমূল্যায়ন। এর কারণে পুঁজিবাজারের বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করতে শুরু করে। তবে ফ্লোর প্রাইসের কারণে ক্রেতা সংকট থাকায় বিদেশিরাও শেয়ার বিক্রি করতে পারছে না।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ ও পুঁজিবাজারে তারল্য প্রবাহ ধরে রাখতে মার্জিন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও ছাড় দেয় এসইসি। গত বছরের ২২ মে এ-সংক্রান্ত একটি আদেশে সূচক যাই থাকুক না কেন পিই রেশিও ৪০ পর্যন্ত যেকোনো শেয়ারে ১:১ অনুপাতে ঋণ সুবিধা দেওয়া হয় বিনিয়োগকারীদের। এর আগে ২০২১ সালের ১৫ নভেম্বর মার্জিন ঋণে বড় ছাড় দিয়ে আদেশ জারি করেছিল এসইসি। ওই আদেশের মাধ্যমে আগের নির্দেশনায় সূচক ৮ হাজার পয়েন্ট পর্যন্ত ১: দশমিক ৮০ অনুপাতে ঋণ সুবিধা থাকলেও সূচকের ওই সীমা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।