ঘুরেফিরে আরিফুল হক

সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মেয়র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীকে। তিনি যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। দেশে মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতা থাকলেও প্রবাসী একজনকে ডেকে এনে নির্বাচনে প্রার্থী করায় স্থানীয় আওয়ামী লীগে নানা সমালোচনা ও বিভক্তির সৃষ্টি হয়েছে। সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন পরিস্থিতির কথা জানা গেছে।

ফলে বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে নিয়ে সিলেটবাসীর মধ্যে এবার আলাদা আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কারণ তিনি নির্বাচন করতে চান এমন গুঞ্জন আছে। ২০ মে এ ব্যাপারে তার সিদ্ধান্ত জানা যাবে। সিলেটবাসীর আগ্রহের কারণ প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও মেয়র হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা। তাই আপাতত তাকে প্রার্থী হিসেবে ধরে নিয়ে আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ছক সাজাচ্ছে। তিনি নির্বাচন করলে সরকারি দলের জন্য অস্বস্তি আরও বাড়বে। ফলে ঘুরেফিরে আরিফুল হক চৌধুরী আলোচনায় থাকছেন।

নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী সিলেট সিটির ভোট হবে ২১ জুন। ২৩ মে মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন।

সিলেটের স্থানীয় রাজনীতিতে আলোচনা আছে, যারা দেশে থেকে লড়াই-সংগ্রাম করেছে, সুখে-দুঃখে দলের পাশে সবসময়ই দাঁড়িয়েছে, থেকেছে সেই ত্যাগকে মূল্যায়ন না করে ডেকে এনে মনোনয়ন দেওয়া অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশীদের অবমূল্যায়নের শামিল।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, মনোনয়ন পাওয়ার প্রত্যাশায় যারা দিনরাত খেটেছেন, জনসংযোগ করেছেন ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন সেসব নেতা আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এখন তারা হতাশ।

তবে স্থানীয় নেতাদের এমন মতামতকে না দিয়ে আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই করা হয় জয়ের চিন্তা করে। সেদিক থেকে দলীয় বিবেচনায় যার জয়ের সম্ভাবনা আছে মনে হয়েছে তাকেই মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এখানে হতাশায় নিমজ্জিত না হয়ে ধৈর্যই গুরুত্বপূর্ণ। তারা বলেন, মনোনয়ন বোর্ড বিভিন্ন মানদন্ড আমলে নিয়ে সিলেটে মেয়র পদে মনোনয়ন দিয়েছে। বোর্ড মনে করেছে, আনোয়ারুজ্জামানই যোগ্য প্রার্থী। দলের সিদ্ধান্তের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে স্থানীয় সব নেতাই মেয়র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন।

সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে চেষ্টা করেছেন ১০ নেতা। এ তালিকায় জেলা-মহানগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ পদের নেতাও ছিলেন। সিলেটের সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান মারা যাওয়ায় ওই অঞ্চলে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব সংকট দেখা দেয়। কামরানের ওপর দলের যে আস্থা-বিশ্বাস ছিল মনোনয়নপ্রত্যাশী আর কারও প্রতি ছিল না। তাই সিলেটবাসীকে এক ধরনের চমক দিতে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ড আনোয়ারুজ্জামানকে বেছে নেয়। মেয়র প্রার্থীর দুটি যোগ্যতা রয়েছে, প্রথমত টাকা, দ্বিতীয়ত কর্মীদের কাছে টেনে রাখতে পারা।

মনোনয়নপ্রত্যাশীদের কারোরই ভোট টানার কারিশমা নেই বলে দাবি করেন সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা। তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, কামরান ছিলেন ভোট টানতে পারার মতো নেতা। উনি বেঁচে থাকলে আর যদি অন্য কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হতো, সিলেটবাসী হয়তো মেনে নিত না। এখন মেয়র পদে মনোনয়ন যাকে দেওয়া হয়েছে এবং যারা মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন তারা সবাই একই মানদন্ডের। ফলে এ নগরীর রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক মানুষের মধ্যে এ নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।

সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বে থাকা দুজন নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে কেন্দ্রের বাড়তি তদারকি ও সতর্ক পথচলায় আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী অন্য নেতারাও বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। সহসভাপতি পর্যায়ের ওই দুই নেতা বলেন, মনোনয়নপ্রত্যাশী ১০ নেতা থাকলেও গ্রহণযোগ্য হলেন দুজন। একজন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ জাকির হোসেন, আরেকজন মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আসাদ উদ্দিন আহমেদ। কেন্দ্রীয় তদারকিতে দুই নেতার হাত-পা বাঁধা। জাকির এখনো যুক্তরাজ্যে রয়েছেন। তিনি ছাড়া মনোনয়নপ্রত্যাশী অন্য সব নেতাই আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে গণসংযোগে উপস্থিত থাকছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের উদ্যোগে কর্মিসভার আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, জেবুন্নেসা হক, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমেদ হোসেন ও শফিকুর রহমান চৌধুরী নাদেল উপস্থিত ছিলেন। দলের শক্তিশালী ঐক্যের ওপর জোর দিয়ে যেকোনো মূল্যে মেয়র পদে আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীকে বিজয়ী করতে স্থানীয় সর্বস্তরের নেতাকর্মীকে আহ্বান জানান কেন্দ্রীয় নেতারা।

সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের মধ্যমসারির চার নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতা ও তাদের অনুসারীরা ইচ্ছা না থাকলেও নৌকার প্রার্থীর সঙ্গে আছেন। তারা বলেন, বিএনপি নেতা বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে আওয়ামী লীগের এ অংশটা অন্য চিন্তার সুযোগ পেত। অন্য কোনো প্রার্থী না থাকায় রাগ-ক্ষোভ, দ্বন্দ্ব-বিরোধ থাকলেও আওয়ামী লীগ ওই নেতারা নিরুপায় হয়ে আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীকে মেনে নিতে হচ্ছে। আরিফুল হক প্রার্থী হলে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে দলীয় ঐক্যের বিষয়ে কেন্দ্র থেকে আরও জোরালো নির্দেশনা যাবে। না হলে তো চিন্তার কিছু থাকবে না।

সিলেটের রাজনীতি ও সিটির ভোট দেখভাল করা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দুই নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দলের স্থানীয় অতিক্ষুদ্র একটি অংশ তলে তলে চেষ্টা করে যাচ্ছে আরিফুল হক চৌধুরীকে ভোটে নামাতে। তা সম্ভব না হলে আবদুল হানিফ কটু নামে সাবেক ছাত্রলীগ নেতার পক্ষ নিতে পারে তারা। কটু সিলেট সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন। তিনি গত বুধবার মেয়র পদে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন।

আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে বলেন, আরিফুল হক যাতে নির্বাচনে অংশ না নেন সেজন্য বিশেষ জায়গা থেকে চাপে রাখা হয়েছে। ওই সূত্রটি জানায়, চাপের কারণে ও বিএনপির সিদ্ধান্ত মেনে আরিফুল নির্বাচন নাও করতে পারেন।

সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আসাদ উদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগে ঐক্য সুদৃঢ়। সামনে এটা আরও দৃশ্যমান হবে। তবে নির্বাচন ঘিরে সাংগঠনিক যে শক্তি নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নামার কথা তাতে কিছুটা ঘাটতি আছে। পরিকল্পনায়ও আছে অসামঞ্জস্যতা।

মেয়র প্রার্থী আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘সিলেটের দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ সবার কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত সাড়া পাচ্ছি। ভোটের দিন ঘনিয়ে আসতে আসতে এটা আরও বাড়বে।’