নেপাল থেকে জলবিদ্যুৎ আনতে শিগগিরই চুক্তি

ভারতের ওপর দিয়ে নেপাল থেকে বাংলাদেশে জলবিদ্যুৎ আমদানির বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে ভারত। খুব শিগগির এ ব্যাপারে তিন দেশীয় একটি চুক্তি সই হবে। বাংলাদেশ-ভারত যৌথ স্টিয়ারিং কমিটির ২১তম সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া বহুল আলোচিত রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে যেসব কারিগরি সমস্যা রয়েছে, দ্রুত সমাধানের তাগিদ দিয়েছেন কমিটির সদস্যরা। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।

বিদ্যুৎ খাতে দুই দেশের নানা ধরনের সহযোগিতাসংক্রান্ত সভাটি গতকাল বৃহস্পতিবার খুলনায় ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের কার্যালয়ে আয়োজন করা হয়। এতে বাংলাদেশের পক্ষে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান এবং ভারতের পক্ষে সে দেশের বিদ্যুৎ সচিব শ্রী অলোক কুমার নেতৃত্ব দেন। সভায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে পারস্পরিক সহযোগিতাসংক্রান্ত চলমান কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়।

বৈঠকে উপস্থিত একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নেপাল থেকে বাংলাদেশে জলবিদ্যুৎ আমদানির পরিকল্পনা দীর্ঘদিনের। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে নেপালের সরাসরি সীমান্ত না থাকায় ভারতের ভেতর দিয়ে সঞ্চালন লাইন তৈরি করে এই বিদ্যুৎ আনতে হবে। তিন দেশীয় চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশ ও নেপাল আগে থেকেই একমত হয়েছে। ভারতও এতে রাজি হওয়ায় নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে আর কোনো জটিলতা থাকছে না।

কমিটির সদস্যরা গতকাল বাগেরহাটের রামপালে নির্মাণাধীন কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। এ সময় কেন্দ্রটির নির্মাণকাজের ও এর যন্ত্রপাতি নিয়ে যে অভিযোগ রয়েছে তা পর্যালোচনা হয়। কমিটির সদস্যরা দ্রুত এসব সমস্যা সমাধানের জন্য ওই কেন্দ্রের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভারতীয় কোম্পানি ভেলকে তাগিদ দিলে তারা তা সমাধানের আশ্বাস দেয়। পাশাপাশি আগামী জুন মাসে কেন্দ্রটির দ্বিতীয় ইউনিট চালুর বিষয়ে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

১৩ বছর আগে বাগেরহাটের রামপালে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ উদ্যোগে কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ২০১৮ সালে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত অগ্রগতি ৯০ শতাংশ। পুরো কাজ কবে নাগাদ শেষ হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তার মাঝেই কেন্দ্রটি থেকে আদৌ পুরো সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পাওয়া যাওয়া নিয়েও তৈরি হয়েছে সংশয়।

অভিযোগ উঠেছে, কেন্দ্রটিতে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহারের কারণে পূর্ণ ক্ষমতায় দীর্ঘ সময় ধরে উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটের সক্ষমতা ৬৬০ মেগাওয়াট হলেও ৬০০ মেগাওয়াট লোডে বেশি সময় ধরে চললে বয়লারের টিউব ফেটে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। তখন কেন্দ্রটি বন্ধ করতে হচ্ছে। এমন ঘটনা একাধিকবার সৃষ্টি হওয়ায় ভবিষ্যতে কেন্দ্রটির পূর্ণক্ষমতায় উৎপাদন করা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

সভায় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যুতের উচ্চ ক্ষমতার আন্তঃসংযোগ কাটিহার-পার্বতীপুর-বরানগর ৭৬৫ কেভি ট্রান্সমিশন লাইন বাস্তবায়ন নিয়ে দুই দেশের সমন্বয়ে একটি আলাদা কোম্পানি গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ভারতের কাটিহার থেকে বাংলাদেশের পার্বতীপুর হয়ে আবার দেশটির বরানগর ৭৬৫ কেভি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন গ্রিড ইন্টারকানেকশনের মাধ্যমে সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলোর মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নির্মাণে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা করছে ভারত। কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভারতের প্রস্তাবিত করিডর লাইনটি ৭৬৫ কেভির আর বাংলাদেশের সঞ্চালন লাইন এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৪০০ কেভির। ফলে বাংলাদেশের সঞ্চালন লাইনের সঙ্গে ভারতের প্রস্তাবিত গ্রিড লাইনের সিনক্রোনাইজেশন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া প্রকল্পটিতে এখনো আইনি, বাস্তবায়ন এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে।

ভারত-বাংলাদেশ যৌথ সভায় জিএমআর কর্তৃক নেপালে উৎপাদিত জলবিদ্যুৎ থেকে ভারতের মাধ্যমে বাংলাদেশে ৫০০ মেগাওয়াট আমদানির চুক্তি স্বাক্ষর, ভুটানে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বাংলাদেশ, ভারত ও ভুটানের ত্রিপক্ষীয় বিনিয়োগ এবং বাংলাদেশে সেই বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

নেপালে আপার কার্নালি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কিনতে ২০১৯ সালে জিএমআরের সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) সই করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। তবে প্রাথমিকভাবে ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়ে দুই দেশ ঐকমত্যে পৌঁছেছে।

বৈঠকে শীতকালে চাহিদা কম থাকার সময় বাংলাদেশ থেকে ভারতে বিদ্যুৎ রপ্তানি বিষয়ে আলোচনা হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (বিআইএফপিসিএল) মাধ্যমে ভারতে বিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্ভাবনা ও সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ, আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্যের অগ্রগতি পর্যালোচনা, বাংলাদেশে জ¦ালানি খাতে দক্ষতা বৃদ্ধির প্রকল্প বাস্তবায়ন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা।