একটা খবরে হঠাৎ চোখ আটকে গেল। চমকে উঠলাম প্রথমে। তারপর বিষন্ন হলাম। জিনাত বুক সাপ্লাই লিমিটেড নামের বইয়ের দোকানটির দরজা ৬০ বছর পর বন্ধ হয়ে গেল। গত ৩০ এপ্রিল ঢাকা নিউমার্কেটে এ দোকানটির শাটার নামল চিরকালের মতো। বইয়ের দোকান তো রেসের ঘোড়া নয় যে ট্র্যাকের মাঝপথে দম হারিয়ে বসে যাবে! বইয়ের দোকানটির আলো নিভে যাওয়ার সংবাদে মন বিষন্ন হলো। কত স্মৃতি এক লহমায় চোখের সামনে ভেসে উঠল। ভাবলাম, সেই মানুষটার কথা যিনি আমার কন্যাকে দোকানের কাউন্টারে বসে বলেছিলেন, ‘আপনার বাবা আপনার চাইতে ছোট বয়স থেকে আমাদের দোকানে আসতেন।’ কোথায় যাবেন তিনি এখন? কী করবেন এই অবেলায় কাজ ফুরিয়ে যাওয়া অবসরে?
এ শহরের বইয়ের দোকানকে জড়িয়ে আমার অনেক স্মৃতি। শৈশবে বাবার হাত ধরে জিনাতে যাওয়ার সূত্রপাত আমার। তখন ঢুকতে ভারী কাচের দরজাটা বসেনি। তাদের বইয়ের শেলফে সাজানো সারি সারি বই হাতড়ে হাতড়ে দেখতাম। ইংরেজি বইয়ের প্রাধান্য ছিল দোকানটিতে বরাবরই। আমি রূপকথা আর অ্যাডভেঞ্চারবিষয়ক বই কিনতাম। বয়স বাড়ল আমার এই শহরে। কিন্তু জিনাতে ঢুকে বই খোঁজার অভ্যাসটা নেশায় পরিণত হলো। কী যে দারুণ সব বই জড়ো হতো জিনাতে! কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নিউমার্কেটে গেছি অথচ প্রচুর বইয়ের অদ্ভুত গন্ধমাখা জিনাতে একবার ঢুকিনি এমনটা হয়নি কখনো। অনেক সময় পছন্দের বইটা কেনার টাকা থাকত না পকেটে। তখন কাউন্টারে দাঁড়িয়ে সেলসম্যানদের সঙ্গে বই সম্পর্কিত নানান গল্প ফুরাত না। বইয়ের দোকানের লোকজন সবসময় খুব নিম্নকণ্ঠে কথা বলেন। এটা আমার একটা পর্যবেক্ষণ।
খালেদ ভাইও এমনই নিচু গলায় কথা বলতেন। তাকে পাঞ্জাবি আর প্যান্ট পরিহিত অবস্থায় দেখা যেত বেশি। কাঁধে একটা কাপড়ের ঝোলা আর ঠোঁটে ঝুলছে ছাইয়ের লম্বা মাথা বের হয়ে থাকা সিগারেট। তাকে মাঝেমধ্যে মনে করিয়ে দিতে হতো ছাই ঝাড়ার কথা। ভীষণ মৃদুভাষী ছিলেন একদা ঢাকা শহরে বিখ্যাত বইয়ের দোকান ম্যারিয়েটার কর্ণধার খালেদ ভাই। কোনোদিন হাসিমুখ ছাড়া দেখিনি তাকে। আশির দশকের শুরুর দিকে ঢাকা স্টেডিয়ামের দোতলায় ম্যারিয়েটায় আমার যাতায়াতের শুরু। খালেদ ভাইয়ের কাছে থাকত রাজ্যের বইয়ের খবর। আলাদা আলাদাভাবে তার দোকানে আসা সবার বই পড়ার আগ্রহের ক্ষেত্রটা জানতেন তিনি। বাংলা ও ইংরেজি ভাষার বই আর ম্যাগাজিন আমদানি করত ম্যারিয়েটা। খালেদ ভাই নতুন বই এলেই নিয়মিত ক্রেতাদের নামে আলাদা আলাদা খামে তাদের সম্ভাব্য পছন্দের বই আর পত্রিকা রেখে দিতেন।
ছোট্ট একচিলতে দোকান ছিল ম্যারিয়েটা। বসার জায়গাও ছিল না। বই আর লেখক নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে খালেদ ভাইয়ের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা জমে উঠত তখন। কে আসত না তখন ম্যারিয়েটায়! পত্রিকার সাহিত্য পাতার সম্পাদক, কবি, গল্পকার, সাংবাদিক, ফুটবলার, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী। সবাই বইয়ের পাঠক। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ম্যারিয়েটার চা আর আড্ডার লোভে সন্ধ্যাবেলা আমার ঠাঁই হতো দোকানের সামনের উঁচু রেলিংয়ে। ম্যারিয়েটায় নিয়মিত আড্ডাধারীরা আসতে শুরু করতেন সন্ধ্যা নামার পর। সাংবাদিক খায়রুল আনোয়ার মুকুল, সৈয়দ শহীদ, প্রয়াত আহমেদ ফারুক হাসান, বাংলাদেশে চলচ্চিত্র আন্দোলনের পুরোধা মুহম্মদ খসরু। তখন ম্যারিয়েটায় আমাদের আড্ডায় আসতেন কবি মহাদেব সাহা, মোহাম্মদ রফিক, অরুণাভ সরকার, ত্রিদিব দস্তিদার, প্রয়াত সাংবাদিক মিনার মাহমুদ এবং কখনো কখনো কবি নির্মলেন্দু গুণ। খালেদ ভাইকে তখন দেখতাম তাদের সঙ্গে সাহিত্যের আলোচনায় নিবিড় হয়ে যেতে।
ম্যারিয়েটাও একদিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বন্ধ হয়ে গেছে জিনাতের মতো। খালেদ ভাইয়ের মৃত্যুর পর শাহবাগের আজিজ মার্কেটে কিছুদিন টিমটিম করে টিকে থাকার পর বইয়ের এ চমৎকার দোকানটিরও অপমৃত্যু ঘটে।
সেই কবে উঠে গেছে বিজয়নগরের গলিতে পুরনো বইয়ের দুটি দোকানও। কত দুপুর কেটেছে আমার দোকান মালিক শাজাহান ভাইয়ের সঙ্গে গল্প করে আর পুরনো বই ঘেঁটে। কলকাতা থেকে পুরনো ম্যাগাজিন আর বই আনতেন শাজাহান ভাই। ঘুরতে ঘুরতে চলে যেতাম তার ওখানে। পুরনো বইপত্রের স্তূপে ডুবুরি নামিয়ে কখনো দেখা মিলত অপূর্ব সব হীরক খন্ডের।
কত স্মৃতি এ শহরে ঝাঁপ দিল অন্ধকারে। হারিয়ে গেল কত মানুষের স্মৃতি। পুরানা পল্টনের ফুটপাতে চেনামুখ বইয়ের দোকানিরা বিদায় নিলেন তাদের বইপত্র নিয়ে। অন্তরালে চলে গেল শান্তিনগর মোড়ে লোকসাহিত্য বিশারদ মুহম্মদ মনসুর উদ্দিন সাহেবের বড় ছেলের বইয়ের দোকান হাসি প্রকাশনালয়। ভদ্রলোকের ডাকনাম ছিল ফড়িং। মনে পড়ে, কিশোর বয়সে তার দোকানে বই কিনতে গেলে বসে বই পড়তে বলতেন। নানা ধরনের বই হাতে তুলে দিতেন। সব স্মৃতি কেমন ছায়া ছায়া হয়ে হাত ছেড়ে দিচ্ছে। একটা শহরে ভালো লাগার পাট উঠে যেতে থাকলে হাতের মুঠোয় মৃত সময় ছাড়া আর কী থাকে? হয়তো কেউ বলবেন, ‘বিদায় করার পর একটা পুরনো আয়নার জন্য এতটা শোক না থাকাই ভালো।’