কাউন্সিলর খায়েরের নির্দেশে ডাকাতিতে গিয়েছিল ওরা

কক্সবাজারে ডুবন্ত ট্রলারে অর্ধগলিত ১০ লাশ উদ্ধারের ঘটনায় করা মামলায় গ্রেপ্তার আরেক আসামি গিয়াস উদ্দিন ওরফে মুনীর (৩২) আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, পাঁচ বছর ধরে ট্রলারে ডাকাতির ঘটনায় জড়িত থাকলেও আলোচিত এই ১০ হত্যাকাণ্ডের সময় উপস্থিত ছিলেন না। তখন তিনি চকরিয়ার একটি লবণমাঠে কাজে ব্যস্ত ছিলেন। সাগরে মাছ ধরার ট্রলারে ডাকাতি করতে গিয়েই পিটুনিতে ওই ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ট্রলারে ডাকাতির ঘটনায় মহেশখালী পৌরসভার এক কাউন্সিলর ও এক জলদস্যুর জড়িত থাকার কথা তুলে ধরেছেন মুনীর।

গত বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টা মুনীরের এই জবানবন্দি নথিভুক্ত করেন কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আসাদ উদ্দিন মো. আসিফ। তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা, আইনজীবী ও আদালতের সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

ডাকাতিতে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেওয়া মুনীর কক্সবাজারের চকরিয়ার বদরখালী এলাকার মো. নুর নবীর ছেলে। সংশ্লিষ্টরা জানান, জবানবন্দিতে মুনীর বলেছেন, পেশায় লবণচাষি হলেও মাঝেমধ্যে সাগরে নেমে মাছ ধরার ট্রলারে ডাকাতি করেন। কারণ সংসারে অভাব-অনটন লেগে থাকে। চার-পাঁচ বছর ধরে ডাকাতির সঙ্গে জড়িত। অনেক ট্রলারে হামলা চালিয়ে মাছ, জাল ও জেলেদের মোবাইল ফোন লুট করেছেন তিনি। তাকে ডাকাতিতে নামিয়েছেন মহেশখালীর সোনাদিয়ার মো. সুমন ডাকাত।

জবানবন্দিতে মুনীর আরও বলেন, শেষবার তিনি অন্য কয়েকজন জলদস্যুর সঙ্গে সাগরে ডাকাতিতে নামেন দ্বিতীয় রোজায়। জলদস্যু সুমনের কথায় ওই সময় মহেশখালী পৌরসভার কাউন্সিলর খায়ের হোসেনের মায়ের দোয়া ট্রলার নিয়ে সাগরে নামেন। তখন ট্রলারে দেখা হয় মহেশখালীর নুরুল কবির (ডুবন্ত ট্রলারে নিহত), চকরিয়ার কোনাখালীর সাইফুল ইসলামসহ (ডুবন্ত ট্রলারে নিহত) আরও সাত জলদস্যুর সঙ্গে। রাত ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে তারা একটি মাছ ধরার ট্রলারে লুটপাট চালান। ট্রলারটিতে মাছ ছিল না। তবে মাছ ধরার জাল, এক ব্যারেল ডিজেল ও পাঁচ-ছয়টি মোবাইল ফোন লুট করা হয়। পরের রাতে আরেকটি ট্রলার থেকে প্রায় ৬০০টি ইলিশ মাছ এবং পাঁচ-ছয়টি মোবাইল ফোন লুট করা হয়। পরদিন দুপুরে লুটের মালামালসহ মায়ের দোয়া ট্রলারটি কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক উপকূলে পৌঁছালে কাউন্সিলর খায়ের ও জলদস্যু সুমন আরেকটি ট্রলার নিয়ে ঘটনাস্থলে আসেন। কিছুক্ষণ পর লুটের মালামালগুলো ট্রলারে তুলে নিয়ে মহেশখালীর দিকে চলে যান খায়ের ও সুমন। ডাকাতির হিস্যা হিসেবে মুনীরকে দেওয়া হয় আট হাজার টাকা। ওই যাত্রায় সাইফুলকে ট্রলারে নিয়ে যান মুনীর। সাইফুলের জীবনে ওটাই প্রথম ডাকাতির ঘটনা ছিল।

জবানবন্দিতে মুনীর দাবি করেন, ডুবন্ত ট্রলারে ১০ জনের অর্ধগলিত যে লাশ পাওয়া যায় তাতে তিনি জড়িত ছিলেন না। থাকলে তিনিও গণপিটুনিতে মারা যেতেন। ৭ এপ্রিল ট্রলার নিয়ে সাগরে ডাকাতিতে নামার জন্য সুমন ও নুরুল কবির তাকে কয়েকবার ফোন করেছিলেন। কিন্তু লবণের মাঠে কাজ থাকায় ওই যাত্রায় তিনি যেতে পারেননি। ডাকাতি করতে গিয়ে ১০ জনের গণপিটুনিতে মৃত্যুর খবর শুনে তিনি সুমনকে ফোন করেন। তখন সুমন বলেছিলেন, তিনি তাদের (নিহত ১০ জন) মরতে পাঠাননি, পাঠিয়েছিলেন মালামাল লুটপাট করতে। রোজার মাসে তাদের (নিহতরা) হত্যা করা হয়েছে, তাই তারা সবাই শহীদ হয়েছেন।

মুনীরের দেওয়া জবানবন্দিতে নাম আসার বিষয়ে বক্তব্য জানতে গতকাল শুক্রবার কাউন্সিলর খায়েরের মোবাইল ফোনে কল করা হলে তিনি মহেশখালী থানার ওসির কক্ষে আছেন জানিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে বারবার কল করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। অবশ্য মহেশখালী থানার ওসি প্রণব চাকমা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘কাউন্সিলর খায়ের মিথ্যা বলেছেন। তিনি আমার রুমে আসেননি।’ কাউন্সিলর খায়েরকে আটক করা হয়েছে কি নাÑ জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘এটি আমি বলতে পারব না। এটি বলতে পারবেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।’

গত ২৩ এপ্রিল বিকেলে কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক উপকূলে ডুবন্ত একটি মাছ ধরার ট্রলার থেকে ১০ জনের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস। ২৫ এপ্রিল কক্সবাজার সদর মডেল থানায় ৪ জন (মহেশখালীর মাতারবাড়ীর বাইট্যা কামাল, করিম সিকদার, আনোয়ার হোসেন ও বাবুল মাঝি) এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করে মামলা করেন ডুবন্ত ট্রলারের মালিক ও মহেশখালীর হোয়ানক ইউনিয়নের বাসিন্দা নিহত সামশুল আলমের স্ত্রী রোকিয়া আকতার।

মামলার এজাহারে বলা হয়, আসামিদের ৪টি ট্রলারের ৫০ থেকে ৬০ জন লোক মিলে সামশুলের ট্রলারটি আটকে পরবর্তী সময়ে সামশুলসহ অন্যদের গলায় রশি পেঁচিয়ে, হাত-পা রশি ও জাল দিয়ে বেঁধে মারধর করে মাছ রাখার হিমাগারের ভেতর আটকে রাখে এবং ওপর থেকে ঢাকনায় পেরেক মেরে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে ট্রলারের তলা ফুটো করে দেয়। এতে সেটি ডুবে যায়। সামশুলের সঙ্গে এজাহারে নাম থাকা চার আসামির পূর্বশত্রুতা ছিল।

এ মামলায় গ্রেপ্তার কামাল হোসেন ওরফে বাইট্যা কামাল এর আগে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে বলেছেন, ঘটনার সময় তিনি কক্সবাজার শহরে ছিলেন। তবে ট্রলারের মাঝি-মাল্লাদের সঙ্গে তার কয়েক দফার কথায় নিশ্চিত হয়েছেন যে ১০ জনের ট্রলারটি সাগরে ডাকাতি করতে নেমেছিল। ডাকাতির একপর্যায়ে কয়েকটি ট্রলারের জেলেরা ১০ জনকে আটক করে প্রথমে পিটুনি দেন। এরপর গুম করার জন্য লাশগুলো বরফ রাখার কক্ষে আটকে রেখে ট্রলারটি সাগরে ডুবিয়ে দেওয়া হয়।

আর মামলার অপর দুই আসামি (ট্রলারের মাঝি) আবু তৈয়ুব ও ফজল কাদের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে বলেছেন, ঘটনাটি তাদের চোখের সামনে ঘটলেও হত্যাকাণ্ডে তারা জড়িত ছিলেন না।