গোলাম মোহাম্মদ কাদের জি এম কাদের নামেই বেশি পরিচিত। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা। তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা, দলীয় কোন্দলসহ নির্বাচন নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আব্দুল্লাহ আল তোফায়েল
দেশ রূপান্তর : তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে রাজনীতিতে অস্থিরতা বিরাজ করছে। সরকার সংবিধানের বাইরে যাবে না, বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবে না। জাতীয় পার্টির অবস্থান কী?
জি এম কাদের : নির্বাচন নিয়ে একটা অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। সঠিক সময়ে নির্বাচন হবে কি না, হলেও কোন পদ্ধতিতে হবে এ নিয়ে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। জাতীয় পার্টি নির্দিষ্ট কোনো সরকার পদ্ধতির পক্ষে নয়। আমরা চাই জনগণের মতের প্রতিফলন হোক। জনগণ ভোটের মাধ্যমে তাদের পরবর্তী নেতা এবং শাসক দল নির্বাচিত করুক। যে পদ্ধতিতেই নির্বাচন হোক, জাপা অংশ নেবে এবং সেভাবেই আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি।
দেশ রূপান্তর : দেশের রাজনৈতিক নেতারা ও সাধারণ মানুষ প্রায়ই জাতীয় পার্টিকে গৃহপালিত বিরোধী দল বলে উপহাস করে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন।
জি এম কাদের : আমরা ভালোভাবে দেখি না। আমরা একটা স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল। আমাদের রাজনীতি আছে, নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন এবং চিন্তাধারা আছে। সেটার দিকে লক্ষ্য রেখেই রাজনীতি করছি। এখন কিছু কিছু কর্মসূচির কারণে অনেকে আমাদের এমন মনে করছে। সব বিষয় যে একেবারে সঠিকভাবে জনগণ ধারণা করছে তা নয়। আবার যাদের বক্তব্য বা সমালোচনার কারণে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে রাজনীতিতে তাদেরও অনেক ব্যর্থতা আছে। দেশ ও জাতির দিকে তাকিয়ে আমরা নিজস্ব ধারায় রাজনীতি করব, অন্য কোনো দলের ধারায় রাজনীতি করব না।
দেশ রূপান্তর : আপনি প্রায়ই বলে থাকেন কারও ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হতে চান না, বিষয়টা ব্যাখ্যা করবেন?
জি এম কাদের : আপনার আগের প্রশ্নই প্রমাণ করে জাপা সম্পর্কে একটা নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে। তাই আমরা জনগণকে জানিয়ে দিতে চাই, আমরা আর কারও সিঁড়ি হব না। আমরা দেশ ও জনগণের স্বার্থে রাজনীতি করি। কৌশলগত জায়গা থেকে যদি মনে করি আমরা এককভাবে ক্ষমতায় যেতে পারব না, তাহলে যারা যেতে পারবে এবং সঠিকভাবে দেশ শাসন করতে পারবে বা দেশের মানুষের মঙ্গল করতে পারবে আমরা তাকে সমর্থন দেব। এই কথাটা এ জন্য বলা হয় যে, আমরা কাউকে নিশ্চিতভাবে সমর্থন দেব, তাকেই ক্ষমতায় নেব বা তাকেই ক্ষমতায় নেওয়ার জন্য আমরা রাজনীতি করছি বিষয়টা এমন হবে না।
দেশ রূপান্তর : জাতীয় পার্টিতে আপনি চেয়ারম্যান, রওশন এরশাদ প্রধান পৃষ্ঠপোষক। আপনাদের দেবর-ভাবীর ক্ষমতার দ্বন্দ্বে নির্বাচনের আগে দল ভাঙার কোনো সম্ভাবনা আছে কি?
জি এম কাদের : আমার মনে হয় না। ভাঙন বলতে আমরা যেটা বুঝি যে, কিছু নেতা একদিকে চলে গেল এটিই ভাঙন। ওই ধরনের ভাঙন আসলে টিকে না। অনেক বড় বড় নেতা চলে গেছেন অনেক সময়, আমাদের দল থেকে গেছেন, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি থেকেও গেছেন। কিন্তু পরবর্তীকালে এরা টিকতে পারেননি। জনসমর্থন ছাড়া এ ধরনের ভাঙন টিকে না। আমার ধারণা যে, মূলস্রোতের বাইরে যারা যেটা করতে চাচ্ছেন তাদের প্রতি জনগণের সমর্থন নেই। তাই এটা নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নই।
দেশ রূপান্তর : রওশন এরশাদকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে নিয়ে এসে সরকার আপনার ওপর একটা চাপ তৈরি করেছে। এ বিষয়ে আপনি কী বলবেন?
জি এম কাদের : সরকার কী জন্য ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে সেটা তো আমি বলতে পারব না। তবে বিভিন্ন সময় অস্বস্তি তৈরি করার জন্য, জাপাকে বিপদে ফেলে দুর্বল করার জন্য অতীতেও অনেক চেষ্টা করা হয়েছে, যা ফলপ্রসূ হয়নি।
দেশ রূপান্তর : সরকারের সঙ্গে আপনার একটা দূরত্ব দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে আপনার দেওয়া বক্তব্যে সেই ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। হঠাৎ করে সরকারের ওপর নাখোশ হলেন কেন?
জি এম কাদের : আমি কারও ওপর নাখোশ এই কথাটা সত্য না। আমি সত্য কথা বলি, সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলার চেষ্টা করি। এখন সরকার যদি কোনো কারণে সেটাতে অস্বস্তিবোধ করে বা অসন্তুষ্ট হয় বা আমাকে তাদের শত্রু মনে করে তাহলে সেটা আমার দোষ নয়। আমি যেটাকে যেভাবে দেখি সেভাবেই কথা বলি, তথ্যমতে কথা বলি। আমি সার্বিকভাবে কতগুলো প্রশ্ন যেগুলো জনগণের মনে আসে, বা জনগণ যেগুলো বলতে চায়, বুঝতে চায়Ñ এগুলো আমি বলি বা বুঝাই আমার পক্ষ থেকে। ভুল-ত্রুটি হলে যাদের দায়িত্ব ছিল এটাকে ঠিক করে দেওয়ার তারা ঠিক করে দিতে পারেন। কিন্তু এ পর্যন্ত আমার কথার কেউ ভুল-ত্রুটি ধরেনি।
দেশ রূপান্তর : একটা গুঞ্জন চালু আছে, আপনি সরকারবিরোধী বক্তব্য দিয়ে আসন্ন নির্বাচনে দর-কষাকষি পরিবেশ তৈরি করছেন। বিষয়টি ব্যাখ্যা করবেন।
জি এম কাদের : দেখুন, জাপা সংসদে প্রধান বিরোধী দল। আমাদের কাজ সরকারের ভুল কাজের সমালোচনা করা আর ভালো কাজের প্রশংসা করা। জনগণ চায়, জাপা রাজনীতিতে আরও সক্রিয় হয়ে উঠুক, মানুষের কথা সংসদে এবং বাইরে উপস্থাপন করুক। তাই আমরা যখন জনগণের পক্ষে কথা বলি সেটা কখনো কখনো সরকার বা অন্য কারও পক্ষে কিংবা বিপক্ষে যেতে পারে। এটাকে আসন বাড়ানো বা দর-কষাকষির কৌশল মনে করা ঠিক হবে না।
দেশ রূপান্তর : অতি সম্প্রতি আদালত থেকে জাতীয় পার্টির সিদ্ধান্ত গ্রহণে আপনার ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। এর কারণ কী ব্যাখ্যা করবেন?
জি এম কাদের : আদালতের বিষয়ে কিছু বলা ঠিক হবে না।
দেশ রূপান্তর : আসন্ন নির্বাচনে জাপা এককভাবে না জোটবদ্ধভাবে অংশ নেবে?
জি এম কাদের : আমরা এখন পর্যন্ত একক নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। নির্বাচনের আগে আমরা জোট করব কি না, করলে কার সঙ্গে করব, সেটা ঠিক করব। তবে এটা ঠিক যে, যদি জোট করতে হয় তাহলে আমাদের শক্তির ওপর দর-কষাকষির নির্ভর করে। তো শক্তিটা বাড়াতে হবে। শক্তি বাড়াতে হলে দুটো জিনিস বাড়াতে হয় একটা হলো সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হয় আর গ্রহণযোগ্য একটা রাজনীতি জনগণের সামনে তুলে ধরতে হয়, জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য। আমরা আপাতত সেটাই করছি।
দেশ রূপান্তর : আলোচনা আছে, আপনি বিএনপির সঙ্গে তলে তলে আঁতাত করছেন। আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে জোট করার সম্ভাবনা কতটা?
জি এম কাদের : এখন তো আমি কোনো সম্ভাবনাকে বাদ দিচ্ছি না। আবার এখনই নিশ্চিত করে কোনো কিছু বলতে পারছি না। শেষ পর্যন্ত কি পরিস্থিতি দাঁড়াবে, এটা আমরা নিশ্চিত নই।
দেশ রূপান্তর : সম্প্রতি একটা বড় ইস্যু হচ্ছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। যা নিয়ে সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন। এ অবস্থায় জাপার অবস্থান কী? আপনারা কি আইনটি বাতিল বা পরিবর্তন চান?
জি এম কাদের : আমি সংসদে ইতিমধ্যে এ আইন নিয়ে কথা বলেছি। সংশোধন করার কথা তো সরকারও বলেছে। আমরা সংসদে বলেছি যে, আইনটি সংশোধন দরকার এবং করা উচিত। বর্তমানে এ আইনের ব্যাপক অপব্যবহার হচ্ছে। সাংবাদিকদের ওপর এক ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। গণমাধ্যম টিকবে কি না, স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে কি নাÑ এ নিয়ে জনগণের মাঝে শঙ্কা আছে।
গণমাধ্যম রাষ্ট্রের জন্য অত্যাবশ্যকীয় একটি উপাদান। যেকোনো গণতান্ত্রিক সমাজে তো বটেই, সামাজিক জীবনযাপন করতে গেলেও তাদের কথা বলার স্বাধীনতা, মনের ভাব প্রকাশ করার স্বাধীনতা এগুলো থাকতে হবে।
দেশ রূপান্তর : আপনার দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে সবচেয়ে আনন্দের অথবা মজাদার একটা অভিজ্ঞতার কথা যদি বলতেন।
জি এম কাদের : ১৯৯৬ সালে আমি যখন প্রথমবার এমপি হই, তখন জাতীয় পার্টি খুব খারাপ সময় পার করছে। সাধারণভাবেই মাঠে-ময়দানে স্বাধীনভাবে রাজনীতি করা যাচ্ছিল না। একদিকে আমার কোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল না, অন্যদিকে জাপা নিয়ে রাজনৈতিক নেতিবাচক প্রচারণা। তারপরও আমি জিতে গেলাম। যেটা অপ্রত্যাশিত ছিল। সেই সময়টা আমার খুব আনন্দের ছিল।
দ্বিতীয়ত, এমপি হওয়ার পরে আমি একদিন বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। সেদিন আমি অনেক মিটিং করে কিছুটা ক্লান্ত ছিলাম। তো এ সময় একটা লোক আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। তখন সঙ্গে যারা ছিলেন, তারা বললেন এমপি সাহেব বিশ্রাম নিচ্ছেন, আপনি এক ঘণ্টা পর আসেন। তখন লোকটা বলছেন, আমি ভোট দিয়ে তাকে এমপি বানিয়েছি, এখন কথা বলবে না মানে? এখনই কথা বলতে হবে, আমি যাব তার কাছে। তখন আমি নিজেই গেলাম লোকটার কাছে। এই যে দাবি করার অধিকার, যেহেতু তিনি ভোটে অংশগ্রহণ করেছেন, আমাকে নির্বাচিত করেছেন, এতে আমি একটা সম্মান পেয়েছি তিনিও কিন্তু একটা অধিকার পেয়েছেন আমাকে জবাবদিহি করার। তো এটাই আমার মনে হয়েছে আমার জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
দেশ রূপান্তর : আপনার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে থেকে এমন একটি ঘটনা বলেন, যেটা আপনাকে খুব কষ্ট দিয়েছে বা মর্মাহত করেছে।
জি এম কাদের : ঘটনাটা আমার জীবনে একটা ধাক্কা দিয়েছে। তখন এমপি হয়ে লালমনিরহাটে বন্যাদুর্গত এলাকায়, সরকারি নগদ টাকা বিতরণের একটা অনুষ্ঠান ছিল। সেখানে জেলা প্রশাসকসহ আরও অনেকেই ছিলেন। বলে রাখা ভালো, এর বছরখানেক আগে লালমনিরহাট জেলাকে কিন্তু নিরক্ষরমুক্ত জেলা হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। টাকা বিলি করতে গিয়ে দেখি একেকজন এসে বলছে, ‘আমি সাইন দিতে পারব না আমি টিপ সই দিব’, তখন জেলা প্রশাসককে বললাম এই আপনাদের নিরক্ষরমুক্ত জেলার অবস্থা। সেদিন আমি বুঝতে পারলাম সরকারি তথ্য-উপাত্তে যে কতটা গলদ থাকে এবং এটা কতটা আইডিয়ার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়।
দেশ রূপান্তর : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
জি এম কাদের : আপনাকে ও দেশ রূপান্তরের পাঠকদেরও অনেক ধন্যবাদ।