যে ক্ষতি হয় অর্থ পাচারে

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে ৭৫৩ কোটি ৩৭ লাখ ডলার পাচার হয়। টাকার অঙ্কে তা প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা। এ তথ্য ওয়াশিংটনভিত্তিক সংস্থা জিএফআইর। যদিও দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশ থেকে পাচার করা অর্থের তথ্যের ভিন্নতা রয়েছে। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশটির বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ ৮৭ কোটি ১১ লাখ সুইস ফ্রাঁ, বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ কমবেশি প্রায় ৮ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা। অর্থনীতির বিশ্লেষকরা মনে করেন, পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ আরও বেশি হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশ থেকে অর্থ পাচার হলে বাণিজ্যে গতিশীলতা কমে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে আয় বাড়াতে অনেকটা নিরুপায় হয়ে নতুন কর আরোপের পথে হাঁটতে হয়। রাজস্ব আদায়ে চাপ বাড়ানো হয়। ধনীরা বিভিন্ন কৌশলে পার পেয়ে গেলেও বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণের ঘাড়ে চাপে। অর্থ সংকটে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি কমে যায়। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট হয়।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদশের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশ থেকে টাকা পাচার হলে সরকার অর্থ সংকটে পড়ে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও অর্থ সরবরাহ কমে। সরকার খরচ চালাতে শর্ত মেনে বাধ্য হয়ে ঋণ নেয়, কর আরোপ করে। যে মানুষটি তিন বেলা ঠিকমতো খেতে পায় না তার কাঁধেও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ঋণ ও কর পরিশোধের দায় চাপে। অর্থ পাচার ভয়াবহ ব্যাধি। এই রোগ সারাতে না পারলে একটি দেশের অর্থনীতির অসুখ বাড়তে থাকে।

অর্থ পাচার কী এবং দেশ থেকে কী পরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছে এমন সব প্রশ্নের জবাবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, রাজস্ব ফাঁিক দিয়ে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া না মেনে বিদেশে অর্থ পাঠানোর নামই অর্থ পাচার। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে বৈধ বা অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ কিংবা সম্পদকে বৈধ করে নেওয়ার চেষ্টা। এ কাজে আমাদের সমাজের প্রভাবশালী কিছু ধনী ব্যক্তি জড়িত।

আন্তর্জাতিক বিধিবিধান মেনে সরকারের তৈরি করা অর্থ পাচার-সম্পর্কিত সর্বশেষ কৌশলপত্রে উল্লেখ আছে, বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কেম্যান আইল্যান্ড ও ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে। অর্থ পাচারকে কেন্দ্র করে দেশে একটি দুষ্টচক্র গড়ে উঠেছে। তারা অবৈধ অর্থ ব্যবহার করে প্রভাব খাটিয়ে নজরদারিতে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্নীতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে।

কৌশলপত্রে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের অবৈধ অর্থ প্রবাহের বড় উৎস সরকারি কর্মকর্তা ও প্রভাবশালীদের দুর্নীতি। অর্থ পাচারে উৎসাহিত হতে বাংলাদেশের নাগরিকরা, চোরাচালান, মাদক ও মানব পাচার, ব্যাংকঋণ কেলেঙ্কারি, জাল-জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া অবৈধভাবে কর্মরত বিদেশিদের আয়, আর্থিকসহ সব ধরনের অপরাধ লুকানো, রাজস্ব ফাঁকি, অন্য দেশে নিরাপদ বিনিয়োগ এবং বিদেশে উন্নত জীবনযাপন ও নাগরিকত্ব লাভ, বিনিয়োগ ভিসা, স্থায়ীভাবে বা দীর্ঘ সময়ের জন্য বসবাসের অনুমোদন, সেকেন্ড হোমের সুযোগ নিতে বাংলাদেশিরা অর্থ পাচারে উৎসাহিত হয়।

অর্থ পাচার দেশের অর্থনীনিতে কী প্রভাব ফেলছে তার উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, ধরি তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ী এহেতেশাম হক। পণ্য আমদানি-রপ্তানি করে ভালো মুনাফা করেছেন। ৬৫ লাখ টাকা দিয়ে একটি গাড়ি ও দুই কোটি টাকা দিয়ে একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। এতে এহেতেশাম হকের কাছ থেকে ৬৫ লাখ টাকা পেলেন গাড়ি বিক্রেতা এবং দুই কোটি টাকা পেলেন আবাসন খাতের ফ্ল্যাট বিক্রেতা। ফ্ল্যাট সাজানোর জন্য এহেতেশাম হক আসবাব, টাইলস, লাইটসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য কিনেছেন। পণ্য কেনায় এসব ব্যবসায়ীর কাছে এহেতেশাম হকের আয় করা অর্থ পৌঁছে গেল। সঙ্গে প্রতি বিক্রেতা মুনাফা পেয়েছে। মুনাফার অর্থ তাদের আয়। এহেতেশাম হকের অর্থ যতবার হাতবদল হয়েছে, ততবারই অর্থনীতিতে কমবেশি গতি এসেছে।

এবার ধরে নিই এহেতেশাম হক বাংলাদেশে বাড়ি বা গাড়ি না কিনে আরও বেশি দাম দিয়ে কানাডার বেগমপাড়া বা অন্য কোনো দেশে বাড়ি বা গাড়ি কিনলেন। নিয়মমতো ব্যাংকের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাঠাতে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুমতিসহ রাজস্ব পরিশোধ করতে হবে। এহেতেশাম হক সে পথে না গিয়ে হুন্ডিতে কিছু অর্থ পাঠালেন। বাকিটা তার কারখানার জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় ব্যাংকে এলসি খুলে একটি বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কাঁচামাল কেনার কথা বলে পাচার করলেন; অর্থাৎ বেশি দামের ও বেশি পরিমাণের কাঁচামাল আনার মিথ্যা তথ্য কাগজপত্রে উল্লেখ করে কম পরিমাণের এবং কম দামের পণ্য আমদানি করলেন। বন্দরে কতটা কী পণ্য এনেছে তা যাচাই করার ব্যবস্থা না থাকায় কম পরিমাণের এবং কম দামের পণ্য প্রবেশ করাতে কোনো সমস্যা হলো না। এহেতেশাম হক পণ্যের দাম হিসেবে অতিরিক্ত অর্থ বিদেশে বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিয়ে বিদেশে বাড়ি ও গাড়ির বাকি মূল্য পরিশোধ করলেন।

এতে বাড়ি ও গাড়ির মূল্য হিসেবে এহেতেশাম হকের অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যোগ না হয়ে অন্য দেশের অর্থনীতিতে যোগ হলো। বাড়ি সাজাতে যত ব্যয় হবে তার সবটাও অন্য দেশের বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা পাবেন। এহেতেশাম হক হুন্ডিতে এবং শুল্কমুক্ত সুবিধার অপব্যবহার করে অর্থ পাচার করায় সরকার একটি টাকাও রাজস্ব পাবে না।

অর্থ পাচার-সম্পর্কিত এনবিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘অর্থনৈতিক বিশ^ায়নের ফলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যহারে বেড়েছে। গত দশ বছরে বাংলাদেশের বৈশি^ক বাণিজ্যের আকার ১৫০ শতাংশের বেশি হয়েছে। অর্থনৈতিক মুক্ততার মাত্রা গত দশ বছরে ১৭ দশমিক ১৮ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশের বেশি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিধি বাড়ার সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারও আগের চেয়ে বেড়েছে। ছায়া অর্থনীতির আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণে কালোটাকা সৃষ্টি হয়েছে। এসব অর্থ সাদা করার আগ্রহ কম। অধিকাংশই পাচার হচ্ছে। এতে বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাছে সরকার। নব্বইয়ের দশক থেকে মূলত দেশ থেকে ব্যাপকভাবে অর্থ পাচার বাড়তে থাকে। প্রতি বছর গড়ে বাংলাদেশ থেকে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার অর্থ পাচার হয়েছে। ২০০০ থেকে ২০০৭ সময়ে অর্থ পাচারের কারণে ৩৫৯ মিলিয়ন ডলারের রাজস্ব হারিয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে এসব হিসাব কয়েক গুণ বেশি।’

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের অর্থনীতিতে ১৯৭৩ সালে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৭ শতাংশের সমপরিমাণ কালোটাকা ছিল। ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ছিল গড়ে ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০১০ সালে তা সর্বোচ্চ প্রায় ৬৩ শতাংশ পর্যন্ত ওঠে। ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কর্মকর্তা লিয়ান্দ্রো মেডিনা ও অস্ট্রিয়ার অধ্যাপক ফ্রেডারিক স্নাইডার ‘শেডিং লাইট অন দ্য শ্যাডো ইকোনমি : এ গ্লোবাল ডেটাবেইস অ্যান্ড দ্য ইন্টারঅ্যাকশন উইথ দ্য অফিশিয়াল ওয়ান’ নামে একটি গবেষণায় বলেন, বাংলাদেশে ১৯৯১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত গড়ে জিডিপির ৩৩ শতাংশের মতো কালোটাকা ছিল। বর্তমানে এসব হিসাব বেড়েছে। কালো বা অপ্রদর্শিত অর্থের বেশির ভাগই পাচার হচ্ছে।

অর্থ পাচার কমাতে এবং দেশের অর্থনীতিতে যোগ করতে স্বাধীনতার ৫০ বছরে ২১ বার কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হলেও তেমন সাড়া মেলেনি। অসাধু ব্যবসায়ীরা অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালোটাকা সাদা করার চেয়ে পাচারে আগ্রহী।

সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম এক প্রাক-বাজেট আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, গত দুই অর্থবছরে শেয়ারবাজারে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সাড়া একদম কম। এসব অর্থ কোথায় গেছে?