কক্সবাজারের টেকনাফের বাহারছড়ার দুর্গম পাহাড়ে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘ছালেহ বাহিনী’র সঙ্গে গোলাগুলির পর সেখান থেকে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। গত শুক্রবার রাত ১০টা থেকে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে গোলাগুলির পর র্যাব পাহাড়ে অভিযান চালায়। এ সময় ছালেহ বাহিনীর প্রধান ও মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান স্যালভেশন আর্মির (আরসা) নেতা হাফিজুর রহমান ওরফে ছালেহ উদ্দিনসহ (৩০) ওই বাহিনীর ছয় সদস্যকে আটক করা হয়। এ ছাড়াও উদ্ধার করা হয় একটি বিদেশি পিস্তল, ১১টি দেশি বন্দুকসহ বিপুলসংখ্যক গুলি ও ধারালো অস্ত্র।
গতকাল শনিবার দুপুরে র্যাব-১৫ এর কক্সবাজার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এসব তথ্য জানান র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন। এ সময় র্যাব-১৫ কক্সবাজারের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
গ্রেপ্তার অন্য পাঁচজন হলেন নুরুল আলম ওরফে নুরু (৪০), আক্তার কামাল ওরফে সোহেল (৩৭), নুরুল আলম ওরফে লালু (২৪), হারুনুর রশিদ (২৩) ও রিয়াজ উদ্দিন ওরফে বাপ্পি (১৭)। র্যাবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ছালেহ উদ্দিন মিয়ানমারের নাগরিক। তিনি ২০১৯ সালে অবৈধ পথে বাংলাদেশে ঢোকেন। এর আগে ২০১৩ সালে তিনি অবৈধ পথে মালয়েশিয়ায় যান। ২০১৯ সালে ছালেহ উদ্দিন বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে উখিয়া ও কক্সবাজার শহরে অবস্থান নিয়ে মাদক চোরাচালান, ডাকাতি ও মুক্তিপণের জন্য অপহরণ করে আসছিলেন। মিয়ানমারেও তার নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘গতকাল রাতে ছালেহ উদ্দিনসহ তার বাহিনীর সদস্যরা ডাকাতির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এ সময় র্যাব সদস্যরা টেকনাফের বাহারছড়া দুর্গম পাহাড়ে অভিযান চালিয়ে ছালেহ উদ্দিনসহ ওই বাহিনীর ছয় সন্ত্রাসীকে বিপুল অস্ত্র-গুলিসহ গ্রেপ্তার করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে র্যাব জানতে পারে, ১২-১৫ জনের সন্ত্রাসী নিয়ে গঠিত ছালেহ বাহিনী অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়, মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত। এ বাহিনীর সদস্যরা টেকনাফের শালবাগান পাহাড়, জুম্মা পাড়া ও নেচার পার্ক এলাকা, বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালী পাড়া পাহাড়, বড় ডেইল পাহাড়, কচ্ছপিয়া পাহাড়, জাহাজপুরা পাহাড়, হলবনিয়া পাহাড়, শিলখালী পাহাড়ে আস্তানা তৈরি করে অপরাধ কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। তারা বিভিন্ন সময় রিকশাচালক, কখনো অটোরিকশাচালকের ছদ্মবেশ ধরে বিভিন্ন কৌশলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করতেন।’
র্যাব জানায়, ছালেহ উদ্দিনের নেতৃত্বে তার বাহিনীর সদস্যরা গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর বাহারছড়া থেকে ১০ জন কৃষক, গত ২ জানুয়ারি ১ জন, ২৬ মার্চ নেচার পার্ক থেকে ২ জন, ১৫ এপ্রিল হ্নীলার ফুলের ডেইল থেকে ১ জন, ৩ এপ্রিল ১ জন, ৩ মে নেচার পার্ক থেকে ৫ জন রোহিঙ্গা কিশোরকে অপহরণ করেন। পরে মুক্তিপণ আদায় করে অপহৃতদের ছেড়ে দেওয়া হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার সন্ত্রাসীরা র্যাবকে জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত তারা অর্ধশতাধিক মানুষকে অপহরণ করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে খন্দকার আল মঈন বলেন, উখিয়াসহ কক্সবাজারের বিভিন্ন থানায় ছালেহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে অপহরণ, ডাকাতি, মাদকসহ ১০টির বেশি মামলা রয়েছে। গ্রেপ্তার ছয়জনকে গতকাল টেকনাফ থানায় হস্তান্তর করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
পুলিশ ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টেকনাফের হোয়াইক্যং, হ্নীলা ও বাহারছড়া ইউনিয়নে সম্প্রতি অপহরণের ঘটনা বেড়েই চলেছে। ছালেহ, নবী, সালমান, আবু আলাসহ রোহিঙ্গাদের চারটি সশস্ত্র গোষ্ঠী মুক্তিপণের জন্য স্থানীয় লোকজনকে অপহরণ করে দুর্গম পাহাড়ে আটকে রেখে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এলাকাবাসী জানায়, গত ৭ মাসে টেকনাফের পাহাড়কেন্দ্রিক সন্ত্রাসীরা অন্তত ৬০ জনকে অপহরণ করে। সর্বশেষ অপহৃত ৫ রোহিঙ্গা শিশু ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ৪ দিন পর মুক্তি পায়।
টেকনাফ থানার ওসি আবদুল হালিম বলেন, ‘রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রধান ছালেহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে হত্যা, অপহরণসহ ছয়টির বেশি মামলা রয়েছে।’