‘তোমারে লেগেছে এতো যে ভালো’

‘তোমারে লেগেছে এতো যে ভালো/ চাঁদ বুঝি তা জানে/ রাতেরও বাসরে দোসর হয়ে/ তাই সে আমার টানে’ কিংবা ‘আয়নাতে ঐ মুখ দেখবে যখন/ কপোলের কালো তিল পড়বে চোখে/ ফুটবে যখন ফুল বকুল শাখে/ ভ্রমর যে এসেছিলো/ জানবে লোকে’এসব কালজয়ী গানের গীতিকার খন্দকার গোলাম মোস্তফা (কে জি মোস্তফা) আর সবার কাছে কে জি ভাই হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

ষাট থেকে নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় গীতিকার কে জি মোস্তফার গান আজকের প্রজন্মের তরুণের মনকেও স্পর্শ করে যায়। এমন মিষ্টি প্রেমের গান বাংলা ভাষা যত দিন থাকবে, তত দিনই অসংখ্য তারুণ্যকে মুগ্ধ করবে। গত বছরের ৮ মে দেশের এই প্রথিতযশা গীতিকারকে হারিয়েছে দেশ। বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী দুই দশক ধরে এক ধরনের নিভৃতচারীই ছিলেন।

গতকাল ছিল তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি শুধু গীতিকারই নন, ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী একজন মানুষ। একাধারে সাংবাদিক, কবি, সরকারি চাকরিজীবী ও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক ছিলেন তিনি। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে একটি ছোট্ট রুমে তিনি অবসর জীবনে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা দিতেন। ষাটের দশক থেকে বাংলাদেশের বাংলা সিনেমার যে স্বর্ণযুগের সূচনা হয়, কে জি মোস্তফা সেই আলোর আকাশের একজন উজ্জ্বল তারা।

ষাটের দশকের শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীনই কবি প্রতিভায় তিনি উদ্ভাসিত হন। সেই সময় তার কবিতা যখন ক্যাম্পাসের গন্ডি থেকে সাহিত্যে ছড়িয়ে পড়ে, তখনই নজরে পড়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই কবি ও বিখ্যাত গীতিকার আবু হেনা মোস্তফা কামালের। একদিন কে জি মোস্তফাকে ডেকে তিনি বললেন, ‘তোমার কবিতায় গীতিময়তা এত বেশি যে তুমি যদি গান লেখো তাহলে আমার মনে হয় ভালো করবে।’ সেই থেকে শুরু হয় গান লেখা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সেগুলো গাওয়া হতো। এর মধ্যে তার প্রশংসা ছিড়িয়ে পড়ে। ১৯৬০ সালে মাস্টার্স শেষ বর্ষের ছাত্র। বয়স ২৫। অনুরোধ আসে চলচ্চিত্রের জন্য গান লেখার। প্রতিযোগিতা ছিল অনেক বেশি। তখন উর্দুতে সিনেমা হতো। বাংলায় হতো দু-একটি। এর মধ্যেই পরিচালক এহতেশামের ‘রাজধানীর বুকে’ সিনেমার গানের জন্য অনুরোধ। সুরকার রবীন ঘোষ আর গায়ক তৎকালীন এই উপমহাদেশের গজলসম্রাট তালাত মাহমুদ। সেই গানই হলো‘তোমারে লেগেছে এতো যে ভালো...’। সব সময় মিষ্টি প্রেমের গান।

গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে কবি-সাংবাদিক, গীতিকার কে জি মোস্তফার স্মরণ ও প্রকাশনা আয়োজনে আলোচকরা তার স্মৃতিচারণ করেন এভাবেই। তারা বলেন, তোমারে লেগেছে এতো যে ভালো... এবং আয়নাতে ঐ মুখ দেখবে যখন...। কে জি মোস্তফার লেখা এসব গীতি কবিতা বা গান যতটা মানুষের হৃদয়কে ছুঁয়েছে, তার অন্য কোনো কবিতা হয়তো সেভাবে রেখাপাত করতে পারেনি। একজন নন্দিত ও জনপ্রিয় গীতিকার হিসেবে সমাজে পরিচিত হলেও তিনি ছিলেন মূলত একজন আধুনিক কবি। কবিতা দিয়েই তার সাহিত্য জীবনে প্রবেশ এবং কবিতার পেছনেই তার সারা জীবন অতিবাহিত হয়েছে। তিনি আজীবন কবিতার সেবা করে কাটিয়েছেন।

খন্দকার গোলাম মোস্তফা ওরফে কে জি মোস্তফা সারা জীবন অতিবাহিত করেছেন গান ও কলাম লেখা, সাহিত্য চর্চা, পান্ডুলিপি সম্পাদনা, হোমিওপ্যাথির চিকিৎসা দেওয়াএসব কাজে। এ ছাড়া প্রেস ক্লাবের সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনাসহ কবিতা পত্রর কাব্য-সাহিত্য আসরও পরিচালনা করেছেন। তিনি ছিলেন সরল ও নির্লোভ। জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও চাকচিক্যহীন সাধারণ মানুষের জীবন কাটিয়েছেন তিনি।

বক্তারা বলেন, বাংলা ভাষা সাহিত্যের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে যিনি সংগীত ও সাহিত্য উভয় অঙ্গনেই নিষ্ঠা ও শ্রম দিয়ে অতিবাহিত করেছেন। সৃষ্টি করেছেন কালজয়ী সব গান। এ দেশের বহু কবি-সাহিত্যিক তার হাত ধরে সাহিত্য জগতে প্রবেশ করে প্রতিষ্ঠা লাভ করলেও তিনি ছিলেন অবহেলায়। রাষ্ট্র তাতে প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত করেছে। তবে রাষ্ট্র তাকে সম্মান না জানালেও বাঙালির স্মরণে একজন কে জি মোস্তফা বেঁচে থাকবেন বহুমাত্রিক পরিচয়ে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মুহম্মদ নূরুল হুদা বলেন, যুক্তির বাইরে গিয়ে আবেগের মধ্য দিয়ে যারা নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চান, কবিরা সম্ভবত তা-ই করেন। তাদের মধ্যে কে জি মোস্তফা একজন। তিনি সেই সৃষ্টিশীল কাজটিই করেছিলেন।

তিনি বলেন, ‘গীতিকার হিসেবে এবার একজন একুশে পদক পেয়েছেন। কাজেই কে জি মোস্তফাকে যদি আমরা সম্মানিত করতে চাই। সম্মাননা পাওয়ার বিষয়ে যে ধরনের নিয়ম রয়েছে তা অনুসরণ করে যদি আবেদন করা হয় অবশ্যই তাতে আমাদের সহযোগিতা থাকবে।’

সাংবাদিক মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, ‘আমাদের জন্য গর্ব যে আমাদের একজন কে জি মোস্তফা ছিলেন। তিনি যদি আর কিছু না-ও লিখতেন তাহলে তার দুই-তিনটি গানের জন্য অমর হয়ে থাকবেন।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের যারা সৃজনশীল মানুষ রয়েছেন, তাদের স্মরণ করা ক্লাবেরই দায়িত্ব। ক্লাবকে ওউন করতে হবে আমাদের একজন কে জি মোস্তফা ছিলেন, আমাদের একজন ব্রজেন দাস ছিলেন, আমাদের একজন জাকারিয়া পিন্টু আছে। অথচ সে কোথায় হারিয়ে গেছে, আমরা কেউ জানি না। তাদের স্মরণ করার মধ্য দিয়ে আমরা সমৃদ্ধ হতে পারি।’

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ বলেন, ‘কয়েকজন সাংবাদিকের নামে স্মারকগ্রন্থ বেরিয়েছে। তারা নিজেরাই স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু কে জি ভাই এ ধরনের উদ্যোগ নেননি। নিজের নামে বই করার জন্য তিনি আগ্রহী ছিলেন না। তিনি অত্যন্ত সরল সাদাভাবে জীবন যাপন করতেন। আমরা কখনো বুঝতে পারিনি তিনি কত বড়মাপের প্রতিভাবান মানুষ ছিলেন। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কত বড় অবদান রেখে গেছেন। অথচ তিনি একটা দুঃখ নিয়ে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। কারণ আমরা জাতীয় ব্যক্তিদের সম্মান করতে জানি না। তবুও তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন।’

প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান বলেন, ‘কে জি মোস্তফা অমর সৃষ্টি তৈরি করে গেলেও রাষ্ট্র তাকে মূল্যায়ন করেনি। তিনি যেসব গান, কবিতা রচনা করে গেছেন তা অমর হয়ে থাকবে। বাংলা ভাষা যত দিন থাকবে, তত দিন তিনি এসবের মাঝে বেঁচে থাকবেন।’

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মোল্লা জালাল বলেন, ‘কে জি মোস্তফাকে স্বাধীনতা পদক বা একুশে পদক দেওয়ার জন্য কোনো দিন প্রপোজাল দেওয়া হয়নি। তার প্রতি যে আমাদের দায়িত্ব পালন করার কথা, সে বিষয়ে কেউ মনোযোগ দেয়নি। আগামী দিনে জাতীয় প্রেস ক্লাব কে জি ভাইয়ের জন্য সম্মাননা চাইতেই পারে। আমার বিশ্বাস, তার মতো একজন গীতিকার সম্মাননা পাওয়ার যোগ্য।’