বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটি স্থাপনে নতুনভাবে মাত্র ৬৯৩ কোটি টাকার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রোপোজাল (ডিপিপি) জমা দেওয়া হচ্ছে। অথচ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের আগের উপাচার্যের সময়ে ২০২১ সালের জুন মাসে ১০ হাজার ৪৫১ কোটি টাকার ডিপিপি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) জমা দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে ইউজিসি সেই ডিপিপি পর্যালোচনা করে প্রথম পর্যায়ে অ্যাকাডেমিক প্ল্যান অনুযায়ী জরুরি ভৌত কাঠামো, আসবাবপত্র এবং জরুরি কিছু ইকুইপমেন্ট নিয়ে নতুন করে ডিপিপি প্রণয়নের অনুরোধ করেন। কিন্তু তখন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ডিপিপি সামান্য পরিবর্তন করে মাত্র ৪০০ কোটি টাকা কমিয়ে ১০ হাজার ১০০ কোটি টাকা প্রস্তাব করেন। আর সেই ডিপিপি গত বছরের মার্চে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে ইউজিসিকে অনেকটা বাধ্য করা হয়েছিল।
তবে গত বছর ২৫ মে দেশ রূপান্তরের প্রথম পৃষ্ঠায় ‘১০ হাজার কোটির বিশ্ববিদ্যালয়!’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। এরপর এ প্রতিবেদনটি সারা দেশেই আলোচিত হয়। ফলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও সেই ডিপিপি ফেরত পাঠিয়ে দেয়। তবে গত বছরের শেষদিকে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে নতুন ভিসি হিসেবে যোগদান করেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহফুজুল ইসলাম। তিনি একটি বাস্তবসম্মত ডিপিপি প্রণয়নের উদ্যোগ নেন। অবশেষে সেই ডিপিপি প্রণয়নের কাজ প্রায় শেষের পথে। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপনে এবার মাত্র ৬৯৩ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হচ্ছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটির বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহফুজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়টির বয়স বলতে গেলে ছয় বছরের ওপরে। এখনো ভাড়া বাড়িতে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। তাই আমরা জরুরি ভিত্তিতে আমাদের নিজস্ব ক্যাম্পাসে যেতে চাই। এ ছাড়া সরকারের আর্থিক অবস্থার ব্যাপারটিও আমরা বিবেচনায় নিয়েছি। সব মিলিয়ে ৬৯৩ কোটি টাকার ডিপিপি প্রণয়ন করা হচ্ছে। এ মাসেই তা জমা দেওয়া হবে। এ টাকা পেলে ভালোভাবেই নিজস্ব ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু করা যাবে। পরবর্তী সময়ে হয়তো আরও অবকাঠামোসহ অন্যান্য জিনিসপত্রের প্রয়োজন হবে। সেগুলো নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তবায়নের সুযোগ তো রয়েছেই।’
সূত্র জানায়, ৬৯৩ কোটি টাকার ডিপিপিতে মোট জমির পরিমাণ রাখা হয়েছে ৬০ একর। এর মধ্যে ৫০ একর সরকারি জায়গা। আর বাকি ১০ একর ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গা। এ ছাড়া এই জমির পুরোটা বাউন্ডারির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ক্যাম্পাসে ২২ তলা একটি ভবন নির্মাণ করা হবে। সেখানেই মূলত অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চলবে। অন্যান্য জরুরি ভৌত কাঠামো, আসবাবপত্র এবং কিছু ইকুইপমেন্ট কেনার জন্যও ডিপিপিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহফুজুল ইসলাম আরও বলেন, ‘আমরা ৫০ একর সরকারি জমি পেতে ইতিমধ্যে প্রক্রিয়া শুরু করেছি। আমরা হয়তো প্রথম তিন-চারতলা প্রশাসনিক কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ রাখব। আর তারপরের তলাগুলোতে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এতে খুব সহজেই আমাদের সব কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারব।’
আগের ভিসির সময়ে ১০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে সব অবাস্তব ব্যয় ধরা হয়েছিল। সেখানে বাউন্ডারি ওয়াল ২০০ কোটি, দুটি বক্তৃতা মঞ্চ ১০৬ কোটি, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র ২০০ কোটি, ১১ তলাবিশিষ্ট একটি প্রশাসনিক ভবন ১৭১ কোটি, আইসিটি ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফর টিচিং লার্নিং ২১২৫ কোটি, গবেষণা যন্ত্রপাতি ৭৪৩ কোটি, সার্ভিস অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স ৮৪৬ কোটি, আরবিকালচার, গার্ডেনিং ও সৌন্দর্যবর্ধন ৭৬ কোটি, ফুটবল-ক্রিকেট গ্রাউন্ড ৭৯ কোটি, স্পোর্টস কমপ্লেক্স ৬৬ কোটি, আট লেন ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড ইভেন্টস ৮০ কোটি, মসজিদ ৭৯ কোটি, স্কলার প্লাজা ৭১ কোটি, লাইব্রেরি ৪০ কোটি, সুইমিং পুল ২৩ কোটি, উপাচার্য বাংলো সাড়ে ৫ কোটি, পাঁচটি ব্রিজ ৫৫০ কোটি টাকাসহ বিভিন্ন কাজে অবাস্তব ব্যয় ধরা হয়েছিল। এমনকি অনেক অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটা ও অবাস্তব সব নির্মাণকাজের জন্যও হাজার হাজার কোটি ব্যয় ধরা হয়েছিল আগের ডিপিপিতে।
জানা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটি স্থাপনের জন্য ২০১৬ সালের ২৬ জুলাই জাতীয় সংসদে আইন পাস হয়। ২০১৮ সালের ১২ জুন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মুনাজ আহমেদ নূরকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হিসেবে চার বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। গত বছর ১১ জুন অধ্যাপক নূরের মেয়াদ শেষ হয়। এরপর দ্বিতীয় উপাচার্য হিসেবে গত বছর ১৬ নভেম্বর নিয়োগ পান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহফুজুল ইসলাম।