মূল্যস্ফীতি বিদেশি ঋণ ও নির্বাচনী বাজেট

নিত্যপণ্যের বাজারে বৈশাখের তপ্ত দিনের মতোই উত্তাপ ছড়াচ্ছে। গত প্রায় এক বছর ধরে খাদ্যপণ্য ও খাদ্য বহির্ভূত পণ্যের দাম বেড়েই চলছে। মূল্যস্ফীতি তালিকায় দেখা গেছে গত বছরের আগস্ট মাসে বিগত কয়েক বছরের চেয়ে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ। এর পর কিছুটা কমলেও  চলতি বছরের মার্চ মাসে আবার তা ৯ দশমিক ৩৩-এ পৌঁছায়। এই মূল্যস্ফীতি সামনের দিনগুলোতে আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও বিশ্বের অনেক দেশেই মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতি একই। তবে আমাদের জন্য এটি অসহনীয় এ কারণে বাংলাদেশ মূলত ৬ এর ঘরের মূল্যস্ফীতিতে অভ্যস্ত। যা এখন তা প্রায় দ্বিগুণ হতে চলছে। এর ফলে অনেক নিত্যপণ্যের দামই বেড়েছে দ্বিগুণ বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারও বেশি। এই দাম বৃদ্ধি অনেক উচ্চবিত্তকেও শঙ্কিত করছে, আর নিম্নবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জন্য ভয়ংকর। এ কারণে দেশের মানুষ অধীর হয়ে বসে আছে কখন কমবে জিনিসপত্রের দাম। অনেকের ধারণা আগামী অর্থবছরের বাজেটে দাম কমার ইঙ্গিত থাকতে পারে। যুক্তি হিসেবে তারা বলতে চায় আসন্ন ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট বর্তমান সরকারের মেয়াদের শেষ ও নির্বাচনী বাজেট, শুধু এ কারণেই সরকার দ্রব্যমূল্যের লাগাম টানার চেষ্টা করবে।

বাংলাদেশ মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতির কারণগুলো মোটামুটি চিহ্নিত। যদিও কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের বেশিরভাগ খাদ্যপণ্যই আমদানি-নির্ভর। আর খাদ্য-বহির্ভূত পণ্যের কথা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। সেখানে দ্রব্যমূল্য কমার সম্ভাবনা আসলেই কি আছে? করোনা পরবর্তী বিশ্বে যে অর্থনৈতিক মন্দা চলছে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। শুধু এই অজুহাতেই বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি চলছে। বাংলাদেশের পরিস্থিতি আসলে কী?

বাজার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় চাল, চাল, তেল, চিনি, মাছ, মাংস, মুরগিসহ একজন মানুষের খেয়েপড়ে জীবন ধারণের জন্য যা কিছু প্রয়োজন সব কিছুর দামই গত এক বছর ধরেই বাড়ছে। বেড়েছে শিক্ষা ব্যয়, যাতায়াত খরচ, চিকিৎসা খরচ। ছোটখাটো বিনোদন যেমন কোথাও পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে যাওয়া এখন সাধারণের জন্য বিলাসিতা। সাধ ও সাধ্যের দ্বন্দ্ব নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের ঘরে। বাজার পরিস্থিতি এমন হলেও বাড়েনি চাকুরেদের আয়। ব্যবসায়ীরা দ্বিগুণ লাভে মরিয়া। এর ওপর আছে সিন্ডিকেটের চক্কর। ডিম, মুরগি, পেঁয়াজ, চিনির সিন্ডিকেট গত কয়েক মাসে হাতিয়ে নিয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা।

বাজারে কোনো পণ্য সিন্ডিকেটের চক্করে পড়লে সরকার কিংবা বাজার ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিতরা তাৎক্ষণিক কোনো পদক্ষেপে যান না। চক্রগুলো কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর মীমাংসায় আসেন।

বাংলাদেশে যেহেতু বেশিরভাগ পণ্য আমদানি করে, তাই বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাংলাদেশে ডলারে সংকট চলছে দীর্ঘদিন ধরে। এ কারণে আমদানি-রপ্তানি বাধাগ্রস্ত। এদিকে দেশে রিজার্ভের পরিমাণও ক্রমাগত কমছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে (সোমবার) রিজার্ভের পরিমাণ ২৯ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারে ঠেকেছে। বিদেশি মুদ্রার সংকট মেটাতে রিজার্ভ থেকে প্রতিনিয়তই বাজারে ডলার ছাড়তে হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংককে। পাশাপাশি পরিশোধ করতে হচ্ছে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) বিল। এতে দেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে গত ৭ বছর পর রিজার্ভ ৩০ বিলিয়নের নিচে নেমে আসছে। এর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছর শেষে রিজার্ভ ছিল ৩০ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এই রিজার্ভ দিয়ে ৫ মাসের কিছু বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো যাবে। তবে আইএমএফের হিসাবে ব্যবহারযোগ্য যে রিজার্ভ রয়েছে তা দিয়ে ৪ মাসের আমদানি ব্যয়ও মেটানো যাবে না। এতে বিদেশি মুদ্রার সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করবে।

বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়তে রিজার্ভ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। আমরা জানি রিজার্ভ বাড়ানোর অন্যতম দুটি মাধ্যম হলো রপ্তানি আয় বৃদ্ধি ও রেমিট্যান্স বাড়ানো। কিন্তু গত মাসে এই দুটির সূচকই কমেছে। এছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন বা উন্নয়ন প্রকল্পের বিপরীতে বিদেশি ঋণ নিলেও সাময়িকভাবে রিজার্ভ বাড়ে। কিন্তু ঋণ পেতে দাতা সংস্থাগুলোর শর্ত মানতে হয়। যেমন চলতি বছর জানুয়ারিতে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের অনুমোদন করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। কিন্তু এই ঋণ পেতে বাংলাদেশকে মানতে হবে বেশ কিছু শর্ত। আইএমএফ বলেছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভর্তুকি কমাতে হবে, করের হার বাড়াতে হবে, ভ্যাটের আওতা বাড়াতে হবে, রিজার্ভ আগামী জুনের মধ্যে ২৪ বিলিয়ন ডলার রাখাসহ ব্যাংকিং খাতে সংস্কারে বেশ কিছু শর্ত দিয়েছে। এখন এসব শর্ত বাস্তবায়ন না হলে বাংলাদেশ তাদের ঋণ পাবে না। এ কারণে সরকার গত জানুয়ারি থেকে কয়েক দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাটের আওতা বাড়ানো, আয়কর হার বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। আইএমএফকে খুশি করতে ধাপে ধাপে শর্ত পালনের চেষ্ট করছে। প্রকৃতপক্ষে আইএমএফর শর্তগুলো বাস্তবায়নের যৌক্তিকতা রয়েছে। দীর্ঘদিন ভর্তুকির মধ্যে থাকা বিদ্যুৎ খাতে এ সংস্কার আরও আগেই নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক সন্তুষ্টির জায়গায় থেকে সরকার তা করেনি। যে কারণে একসঙ্গে চাপ বাড়ছে জনগণের ওপর। এছাড়া আসছে বাজেটে ভ্যাটের আওতা বাড়ানো বা করের আওতা বাড়ানো সবকিছুরই দায় জনগণের ঘাড়েই পড়ছে। কিন্তু জনগণ কি সেই ভার বহন করতে পারবে?

পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত ভোক্তা মূল্যসূচকে (সিপিআই) দেখা গেছে, গত এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ২৪ শতাংশ। এই মাসের সূচকের একটি বিশেষত্ব ছিল শহরাঞ্চলে মূল্যস্ফীতি ছিল বেশি ৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ। আর গ্রামাঞ্চলে ছিল ৮ দশমিক ৯২ শতাংশ। যা ছিল মার্চ মাসে প্রকাশিত মূল্যসূচকের ঠিক উল্টো। অর্থাৎ আগে গ্রামে মূল্যস্ফীতি বেশি থাকত। এবার শহরে। আইএমএফের শর্ত অনুসারে শুধু বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। কিন্তু সব শর্ত বাস্তবায়ন হলে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কেননা ভ্যাটের হার বাড়লে দ্রব্যমূল্য বাড়বে, ভর্তুকি কমলে দ্রব্যমূল্য বাড়বে, ডলারের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়বে। আর আমদানি ব্যয় বাড়া মানেই দ্রব্যমূল্য বাড়বে। এই প্রেক্ষাপটে খুব সহজেই বোঝা যাচ্ছে দেশে নিত্যপণ্য বাড়া ছাড়া কমার সম্ভাবনা নেই কোনোভাবেই।

তবে আশার জায়গা একটাই তা হলো আগামী অর্থবছরের বাজেট। যেহেতু জাতীয় নির্বাচন আসন্ন এবং এটি বর্তমান সরকারের মেয়াদের শেষ বাজেট, তাই সাধারণ জনগণকে সন্তুষ্ট ও খুশি রাখতে সরকারের একটা পদক্ষেপ থাকতে পারে আগামী বাজেটে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। এটা কমিয়ে আনার চেষ্টা এবং আর নতুন করে ব্যয় বৃদ্ধি না হলেই কেবল জনগণ সরকারের ওপর খুশি থাকতে পারে। আর ভোটের বাজারে সেই চেষ্টা করার ইঙ্গিত কিছুটা পাওয়া গেছে।

আসন্ন ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব তৈরির আগে রেওয়াজ অনুযায়ী গত ১৩ এপ্রিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পরার্মশক কমিটির সভায় বসেছিলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।। সেখানে তিনি ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, ‘আগামী অর্থবছরের বাজেটে ব্যবসায়ীরা খুশি হবেন। এবারের বাজেট নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, আপনারা ঠকবেন না।’ ব্যবসায়ীদের ভ্যাট, আয়করসহ বিভিন্ন বিষয়ে একগুচ্ছ প্রস্তাব শুনে ধাপে ধাপে তার সবই মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি জসিম উদ্দিন এ সভায় সামগ্রিকভাবে আটটি প্রস্তাব তুলে ধরেন ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে। এর মধ্যে পৃথকভাবে ভ্যাট ব্যবস্থা নিয়ে ১১৬টি এবং আয়কর বিষয়ে ১১৯টি প্রস্তাব এবং এর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে লিখিত প্রস্তাব অর্থমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেন তিনি।

অর্থমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের খুশি করার আশ্বাস দিয়েছেন ভালো কথা, কিন্তু সাধারণ মানুষও যাতে বাজেটে খুশি থাকতে পারে, দ্রব্যমূল্য কমানোর প্রচেষ্টা যেন থাকে বাজেটে সেটাই প্রত্যাশা।

লেখক: সাংবাদিক

Zakpol74@gmail.com