‘কিছু ব্যক্তির কাছে অর্থনীতি জিম্মি হয়ে পড়েছে’

শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার বলেছেন, অর্থনীতি ও বাজার এই দুই জায়গাতেই সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। যার কারণে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ঝরে পড়ছেন এবং পণ্যের মূল্য বেড়ে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। মানুষ বাজার করতে গিয়ে এখন কাঁদছেন। এই সিন্ডিকেট ধরতে না পারলে এবং ভাঙতে না পারলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের দায়িত্বে থাকা উচিত না। তিনি বলেন, আমরা দেখছি যে ব্যক্তি লুটপাট করে বড়লোক হচ্ছে, তাকে আরও সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ফলে কিছু ব্যক্তির কাছে ব্যাংক থেকে শুরু করে পুরো অর্থনীতি জিম্মি হয়ে পড়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ‘কভিড-১৯ পরবর্তী পরিস্থিতিতে এসএমই খাতের উন্নয়নে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। কর্মশালাটি ইআরএফ ও এসএমই ফাউন্ডেশন যৌথভাবে আয়োজন করে। এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. মাসুদুর রহমানের সভাপতিত্বে কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. মফিজুর রহমান।

এ সময় প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘দেশ এগিয়ে চলেছে, বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল। কিন্তু তার পরও দেশে আজকে যে অরাজকতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে, ব্যবসার নামে আজকে যে লুটপাট হচ্ছে, মানুষের পকেট কাটা হচ্ছে এগুলো সাংবাদিকদের আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে, এগুলো আরও ফোকাস করতে হবে।’

‘আমরা যখন বাজারে যাই তখন দেখি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কেন ঊর্ধ্বগতি? আমাদের কিন্তু কোনো কিছুর অভাব নেই, আমরা প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ। চাল, ডাল, তরিতরকারি, মাছ-মাংস থেকে শুরু করে সবকিছুতেই স্বয়ংসম্পূর্ণ। তার পরও সিন্ডিকেটের কারণে দেশের এ অবস্থা বিরাজ করছে।’

অবাক লাগে বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে লাখ লাখ বেকার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণ কিন্তু মওকুফ করা হয় না। কাদের ঋণ মওকুফ করা হচ্ছে? যারা ব্যাংক থেকে লাখো কোটি টাকা নিয়ে খেলাপি হয়েছে তাদেরটাই বারবার মওকুফ করা হচ্ছে। তারা মওকুফ পেয়ে আবার ঋণ নিচ্ছে। বড় খেলাপিদের এই ঋণগুলো যদি এসএমই ফাউন্ডেশনসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের দেওয়া হতো তবে তাদের ব্যবসা আরও সমৃদ্ধিশালী হতো। কিন্তু সেটা করা হচ্ছে না।

তিনি বলেন, আমার ঢাকা শহরে রাজনীতির বয়স ৫০ বছর, আমি দেখেছি অনেকে ব্রিফকেস নিয়ে ঘুরত, অনেকের কাছে টাকা ছিল না, অন্যের কাছে সিগারেট চেয়ে খেত। আজকে তারা ব্যাংকের মালিক। তারা সরকারি ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে বেসরকারি ব্যাংকের মালিক হয়েছে।’

‘আমি মনে করি, যারা সরকারি ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে বেসরকারি ব্যাংকের মালিক হয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের উচিত তাদের নামগুলো প্রকাশ করা। কেন তারা করেন না, আমি জানি না, এটা একটা বড় প্রশ্ন।’

তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যেভাবে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, এই সিন্ডিকেট যদি আমরা ধরতে না পারি, এই সিন্ডিকেট যদি আমরা ভাঙতে না পারি, দেশের ১৭ কোটি মানুষের যে দুঃখ-কষ্ট যদি লাঘব না করতে পারি তবে আমার মনে হয়, আমাদের মতো লোকের মন্ত্রী থাকা উচিত না।

শিল্প প্রতিমন্ত্রী বলেন, সুগার মিলের যারা আখচাষি তারাই সুগার মিলের শ্রমিক, যার কারণে মিলগুলোতে লুটপাট হয়েছে, আর লুটপাটের কারণে মিলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের চিনির মিলগুলো যদি যথারীতি চালাতাম তবে বাজারে চিনির দাম এত বাড়ত না। এখন চিনির স্বল্পতা দেখা দিয়েছে, চিনি খুঁজে পাওয়া যায় নাÑ এগুলো হতো না।

একইভাবে আমাদের এসএমই খাতের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের যারা মুড়ি-চানাচুর বিক্রি করে চলত, সেখানেও দেশের বড় কোম্পানিগুলো হাত বাড়িয়েছে। যার কারণে ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না।

উন্নত দেশ হওয়ার ক্ষেত্রে এসএমই ফাউন্ডেশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তায় এসএমই ফাউন্ডেশনকে আগামী বাজেটে ৫ হাজার কোটি টাকা দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন শিল্প প্রতিমন্ত্রী। যেভাবে বিভিন্ন প্রকল্পে টাকার অপচয় হচ্ছে এটি না হলে এই টাকা দেওয়া কোনো বিষয় না।

এসএমই ফাউন্ডেশনের চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরে মফিজুর রহমান বলেন, পর্যাপ্ত তহবিলের অভাবে আমরা উদ্যোক্তাদের ভালো সেবা দিতে পারছি না। জনবল সংকটের কারণে ঢাকার বাইরে খুব একটা কার্যক্রম চালানো যাচ্ছে না। বর্তমানে মাত্র ২০০ কোটি টাকা তহবিল দিয়ে ফাউন্ডেশন চলছে। এ ছাড়া ব্যাংক সুদের হার হ্রাসের কারণে আয় কমে গেছে। নিজস্ব ভবন না থাকায় ভাড়া বাবদ অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পণ্য প্রদর্শনের কোনো প্ল্যাটফরম না থাকায় উদ্যোক্তাদের পণ্য বাজারজাতকরণে বাধা তৈরি হচ্ছে।

সেগুলো হলো আয় বৃদ্ধি এবং দেশব্যাপী বর্ধিত কর্মসূচি গ্রহণের জন্য এক হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের দাবি জানান এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান। এ ছাড়া এসএমই নীতিমালাসহ সরকারের বিভিন্ন নীতিমালা বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ; ফাউন্ডেশনের নিয়মিত কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য বাজেট বরাদ্দ, সরকারের অর্থায়নে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদন, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার অর্থায়নে কারিগরি ও উন্নয়ন প্রকল্প, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং ইনকিউবিশন অ্যান্ড ইনোভেশন সেন্টার স্থাপনের দাবি জানান তিনি।