কালো কোট ঐচ্ছিক করার দাবি আইনজীবীদের

তীব্র দাবদাহে জনজীবনে হাঁসফাঁস অবস্থা। এর প্রভাব পড়েছে আদালতেও। প্রতি বছরই গরমের শুরুতে আইনজীবীদের ড্রেস কোড পরিবর্তনে দাবি তোলেন আইনজীবীরা। এবার এ দাবি উঠেছে জোরেশোরে। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার আদালত এলাকায় শফিউল আলম আলাউদ্দিন (৪৪) নামে এক আইনজীবীর মৃত্যুর খবর এসেছে।

চিকিৎসকের বরাতে আইনজীবীরা বলছেন, প্রচ- গরমে তিনি হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে গরমে আইনজীবীদের অসুস্থ হওয়া এবং মৃত্যুর খবর এসেছে। এমন পরিস্থিতির জন্য বিরূপ এ আবহাওয়ায় আইনজীবীদের কালো কোট ও গাউন পরিধানের বাধ্যবাধকতা অনেকাংশে দায়ী বলে মনে করেন আইনজীবীরা। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিসহ (সুপ্রিম কোর্ট বার) আইনজীবীরা প্রধান বিচারপতির কাছে গরমের সময়ে আইনজীবীদের ড্রেস কোড পরিবর্তন চেয়ে আবেদন করেছেন।

অন্যদিকে মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত কালো কোট পরিধান ‘ঐচ্ছিক’ করতে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের আইনজীবী সমিতির ২০ জন আইনজীবী গতকাল বার কাউন্সিলে আবেদন করেছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শুনানিকালে পরিধেয় পোশাকের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আগামীকাল শনিবার সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ বিচারকদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন প্রধান বিচারপতি।

আইনজীবীরা বলেন, সিভিল রুলস অ্যান্ড অর্ডারস, ক্রিমিনাল রুলস অ্যান্ড অর্ডারস, সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ রুলস, ১৯৭৩ এবং আপিল বিভাগের রুলস, ১৯৮৮-তে শীত ও গ্রীষ্মকালে আইনজীবীদের একই ধরনের পোশাক পরিধানের বিধান রয়েছে। বিধান অনুযায়ী, উচ্চ আদালতের আইনজীবীদের ক্ষেত্রে সাদা পোশাকের ওপর কালো কোট ও গাউনের পাশাপাশি সাদা কলার ব্যান্ড পরিধান বাধ্যতামূলক। তবে কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। যেমন কোনো আইনজীবী সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রিট আবেদন করে নিজেই শুনানি করলে তার ক্ষেত্রে গাউন, কলার ব্যান্ড পরার বাধ্যবাধকতা নেই। অন্যদিকে অধস্তন আদালতে শুনানিকালে আইনজীবীরা সাদা পোশাকের ওপর শুধু কালো কোট, কালো টাই ও গাউন পরিধান করবেন।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলেন, কালো কোট ও গাউন পরিধানের বিষয়টি মূলত ব্রিটিশ ভাবধারা ও আবহাওয়া বিবেচনায় নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনায় বিভিন্ন সময়ে এ ড্রেস কোডের পরিবর্তনও দেখা গেছে। ২০২০ সালের মার্চ থেকে করোনাভাইরাস সংক্রমণের জেরে বিভিন্ন সময় আইনজীবীদের ড্রেস কোডের পরিবর্তন আসে। ২০২১ সালের ৩১ মার্চ ও ২০২২ সালের ১৯ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে আইনজীবীদের কালো কোট ও গাউনের বিষয়টি শিথিল করা হয়।

অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এত গরম তো এর আগে ছিল না। অসহ্য এ গরমে শার্ট পরেই টেকা যাচ্ছে না। সেখানে কালো কোট ও গাউন এ গরমকে আরও উসকে দেয়। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা কিছুটা মানিয়ে নিতে পারলেও ঢাকার বাইরে গরমের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় অধস্তন আদালতের অবস্থা ভয়াবহ হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন জানিয়েছি। অন্তত গরমের কয়েকটা মাস যেন আইনজীবীদের পোশাকের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়। এখন সারা দেশের আইনজীবীদের সুবিধার্থে আশা করি প্রধান বিচারপতি বিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত নেবেন।’ সুপ্রিম কোর্ট বারের সম্পাদক আবদুন নূর দুলাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রচ- গরমে এ পোশাক নিয়ে আইনজীবীরা অস্বস্তিতে আছেন। আজ (গতকাল) সমিতির সর্বসম্মতি সিদ্ধান্তক্রমে ড্রেস কোড পরিবর্তন চেয়ে প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন করেছি। তিনি আমাদের আশ্বস্ত করেছেন।’

গরমের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এর আগে গত ১৯ এপ্রিল মানবাধিকার সংগঠন ল অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশনের পক্ষে ব্যারিস্টার হুমায়ুন কবির পল্লবসহ কয়েকজন আইনজীবী ড্রেস কোড পরিবর্তনের দাবিতে প্রধান বিচারপতি বরাবর একটি আবেদন জানান। এতে বলা হয়, সারা দেশে হাজার হাজার আইনজীবী প্রতি বছরের মার্চ মাস থেকে অক্টোবর পর্যন্ত উচ্চমাত্রার গরম আবহাওয়ার কারণে অসহনীয়, অবর্ণনীয়, শারীরিক কষ্ট সহ্য করে পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন। নিয়মের বিধান অনুযায়ী অতিরিক্ত গরমেও কালো কোট, গাউন পরিধানের কারণে প্রতি বছর হিটস্ট্রোকে আইনজীবীরা মৃত্যুবরণ করেন। অনেকে অসুস্থ হন।

আইনজীবী হুমায়ুন কবির পল্লব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইতিমধ্যে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল ও বার কাউন্সিলের সচিব বরাবর নোটিস পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রচ- গরমেও আমরা এমন পোশাক পরতে বাধ্য হচ্ছি যেটা আমাদের আবহাওয়া, শারীরিক ও মানসিক অবস্থার সঙ্গে যায় না। আশা করি গ্রীষ্ম ও শীত বিবেচনায় আইনজীবীদের পোশাকের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট উদ্যোগ নেবে।’ ঢাকা বারের আইনজীবী বাহাউদ্দিন আল ইমরান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অসহ্য গরমে আইনজীবীরা শারীরিকভাবে অসুস্থ হচ্ছেন। এজন্য মার্চ থেকে আট মাস কালো কোট ঐচ্ছিক অর্থাৎ কেউ চাইলে পরবেন এমন নিয়ম চেয়ে আবেদন করা হয়েছে।’

গতকাল বিকেলে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ সাইফুর রহমান এক বিবৃতিতে বলেন, ‘দেশব্যাপী তাপপ্রবাহের কারণে আদালতে মামলা শুনানিকালে পরিধেয় পোশাকের বিষয়ে প্রধান বিচারপতি আগামীকাল শনিবার বেলা ১১টায় জ্যেষ্ঠ বিচারপতিদের সঙ্গে আলোচনা করবেন।’