সম্প্রতি মার্কিন দূতাবাস ঢাকার আমন্ত্রণে বাংলাদেশ ঘুরে গেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পেশাদার ফুটবল কোচ শেলাস হাইন্ডম্যান। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ^বিদ্যালয় দলে কোচিং করিয়েছেন তিনি। ছিলেন মেজর লিগ সকারে এফসি ডালাস দলের প্রধান কোচ। বাংলাদেশ সফর নিয়ে তার অভিজ্ঞতা শুনেছেন দেশ রূপান্তরের সামীউর রহমান
বাংলাদেশে এসেছেন কয়েক দিন হলো। আপনি তো বেশ কিছু জায়গায় গেছেন। দেখেছেন ফুটবলের বেশ কিছু অবকাঠামো এবং প্রতিষ্ঠানগুলোতেও গেছেন। প্রাথমিকভাবে কী ধারণা পেলেন বাংলাদেশের ফুটবল সম্পর্কে?
শেলাস হাইন্ডম্যান : চার দিন হয় বাংলাদেশে এসেছি (সাক্ষাৎকার গ্রহণের দিন বুধবার)। দুই দিন লেগেছে লম্বা ফ্লাইটের ধকল সামলে ঠিকঠাক হতে। প্রথমে গিয়েছিলাম মেয়েদের জাতীয় দলের অনুশীলন দেখতে। আমাকে আসলে ওরা অবাক করে দিয়েছে। ভালো অবকাঠামো, ভালো কোচিং এবং সবচেয়ে বড় কথা এই মেয়েরা আসলেই অনেক ভালো ফুটবলার। এরপর একটা স্কুলে যাই, যেখানে স্কুলের বাচ্চাদের সঙ্গে আমরা কাজ করি। আমরা তাদের সাহচর্য উপভোগ করেছি, তবে বুঝতেই পারছেন সেটা আসলে অন্য পর্যায়ের ফুটবল। এরপর আমরা ভিন্নভাবে সূক্ষ্ম খেলোয়াড়দের সঙ্গে এবং তাদের কোচের সঙ্গে কথা বলি। তাদের আমরা ফুটবল এবং জার্সি দিই। বাংলাদেশে আমার সবচেয়ে যা ভালো লেগেছে সেটা হলো, খেলোয়াড়রা সবাই খুব বিনয়ী আর শ্রদ্ধাশীল। গতকাল গিয়েছিলাম নতুন গড়ে ওঠা একটা স্টেডিয়াম দেখতে (বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনা), এত বড় একটা স্টেডিয়াম দেখে আমি তো বিস্মিত। কেবলমাত্র ফুটবল স্টেডিয়াম নয়, এটা একটা স্পোর্টস কমপ্লেক্স। মনে পড়ে, আমি যখন পেশাদার কোচিংয়ে ছিলাম, যখন কনকাকাফ অঞ্চলে নানান জায়গায় খেলতে যেতাম, তখন যেসব বড় বড় ফুটবল দলকে দেখেছি তাদের স্টেডিয়ামও এর ধারেকাছে ছিল না। কোনো কিছুই বাংলাদেশে যা দেখেছি এর ধারেকাছেও না। এর বাইরে আমরা একটা স্কুলে গিয়েছি। ওখানে অনেক রকম খেলা যেমন কারাতে, হকি, ক্রিকেট, বাস্কেটবলের চর্চা হয়। ৯-১০ ধরনের খেলা। ওখানে হাইস্কুলের একদল ছেলেদের নিয়ে কাজ করলাম। ওরা বেশ ভালো। আমার কাছে একটা প্রশিক্ষণসূচি ছিল, যেটা আমি সাধারণ মানের বাচ্চাদের জন্য তৈরি করেছিলাম। ওখানে গিয়ে প্রথম এক-দুটো ড্রিলের পরই আমি বুঝে যাই, ওদের মানের তুলনায় আমার প্রশিক্ষণ অনেক সহজ। ওদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে আমার প্রশিক্ষণসূচিতে বদল আনতে হবে। আমি কলেজ দলগুলোকে যেভাবে প্রশিক্ষণ দিতাম, সেভাবেই তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি। তারা খুব দ্রুতই সবকিছু রপ্ত করেছিল। আমার মনে হয়েছে তাদের মধ্যে পেশাদার খেলোয়াড় হয়ে ওঠার সব গুণ আছে, একদিন ওরা বাংলাদেশের হয়ে খেলবে।
আপনারা কোচিং করিয়েছেন সেই সব দলে খেলেছে এমন কোনো ফুটবলার কি আছে, যে ইউরোপে রিয়াল মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মতো বড় ক্লাবে, অর্থাৎ একদম শীর্ষ পর্যায়ে খেলেছে?
শেলাস : আমার অধীনে খেলেছিল একজনকে আমি পেয়েছিলাম, যে প্রিমিয়ার লিগে খেলার মতো অতটা ভালো ছিল না; তবে সে এখন একটি শীর্ষ ক্লাবের সহকারী কোচ। সে ফিটনেস ট্রেনিং নিয়ে কাজ করছে। কিছুদিন আগে হ্যারি কেইনের সঙ্গে তার একটা ছবি পাঠিয়েছে আমাকে। আমি অনেক খেলোয়াড়কেই কোচিং করিয়েছি যারা পরে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দলের হয়ে খেলেছে। আমার অধীনে খেলা একজন এখন একটা এমএলএস দলের হেড কোচ। আমার বংশলতিকা, এভাবেই বলি আমি, অর্থাৎ যাদের আমি কোচিং করিয়েছি তাদের অনেকেই এখন কোচিংয়ে জড়িত। তারা শীর্ষ দল বা কলেজের কোচ হিসেবে ক্যারিয়ার গড়েছে। এর বাইরে আমি আমার নাতির কথাও বলতে পারি, সে ফুলহামের একাডেমিতে ডাক পেয়েছিল। সে ফুলহামে খেলেছে, বোর্নমাউথে খেলেছে, এখন খেলছে আটলান্টা ইউনাইটেডে (এমএলএসের ক্লাব)। তাকেও বলা যায় ছোটবেলায় আমিই খেলতে শিখিয়েছি!
গোটা পৃথিবী যাকে ফুটবল বলে যুক্তরাষ্ট্রে সেই খেলাটাকে বলে সকার। মার্কিন সংস্কৃতিতে বেসবল, বাস্কেটবল এসব খেলার ভেতর ফুটবল কতটা জায়গা নিয়ে আছে?
শেলাস : ৫০ বছর আগে আমি যখন ১৬ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে আসি, তখন এখানকার মানুষ সকারকে, অর্থাৎ ফুটবলকে অতটা চিনত না। আমার এক ভাই আমাকে নিয়ে গিয়েছিল জার্মানদের একটা ক্লাবে, যেখানে ফুটবল খেলা হতো। এখন সকার যুক্তরাষ্ট্রে অনেক বড় একটা খেলায় রূপ নিয়েছে। ‘সকার আবার কী?’ এই প্রশ্নটা এখন আর কেউ করে না। অনেকের বাচ্চাই সকার খেলছে। অনেকেই সকারের ভক্ত হয়েছে। কারণ তাদের বাচ্চারা সকার খেলে। বাচ্চারা অভিভাবকদের বলছে, চলো, সকার ম্যাচ দেখতে যাই। এখন মার্কিন ফুটবল দলও বেশ ভালো একটা দল হয়ে উঠেছে, অনেক মার্কিন খেলোয়াড়ও ইউরোপে খেলছে।
কথা প্রসঙ্গে বলছিলেন যে আপনি দোহায় বিশ্বকাপ ফুটবল দেখতে গিয়েছিলেন। পরের আসর তো ২০২৬ সালে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রও মেক্সিকো ও কানাডার সঙ্গে সহ-আয়োজক। এতে করে কি মার্কিন সমাজে ফুটবল আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠবে?
শেলাস : আমি ৬টা বিশ্বকাপে গিয়েছি। দোহায় কিন্তু আমাদের পুরুষ দলটা ভালো করেনি আশা অনুযায়ী। তবে আমাদের মহিলা দলটা বেশ ভালো। তারা সেরা দলগুলোর একটা। ১৯৯৪-এর পর আবার বিশ্বকাপ আসছে যুক্তরাষ্ট্রে। এমএলএস কিন্তু আগের চেয়ে অনেক বড় হয়েছে, ২৪টা দল এখন খেলছে এবং প্রতিটি অঙ্গরাজ্য তাদের নিজেদের এমএলএস দল চাইছে। সেন্ট লুইস এ বছরই মাত্র এমএলএসে এসেছে, ওরা চারটা ম্যাচ জেতার পর এখন টিকিটের জন্য হাহাকার চলছে। বিশ্বকাপ মানেই বেশি মানুষ সংযুক্ত হবে, অনেক বেশি প্রচার হবে, অনেক পৃষ্ঠপোষক আসবে। আমি তো মনে করি সকার আগামী ২০ বছরের মধ্যে আমেরিকান ফুটবল ও বাস্কেটবলের মতো জনপ্রিয় হয়ে উঠবে। কারণ এখন বেসবল খেলোয়াড়ের চেয়ে সকার খেলোয়াড়ের সংখ্যা বাড়ছে।
ফ্রান্স দলের দিকে তাকালে দেখা যায়, দলটার বেশির ভাগ ফুটবলারই জাতীয়তায় ফরাসি হলেও তারা আফ্রিকান বংশোদ্ভূত। যুক্তরাষ্ট্রও কি তার বিপুল হিস্পানিক, আফ্রিকান অভিবাসী জনগোষ্ঠীর সুফল নিতে পারবে ফুটবলে?
শেলাস : আমি এ কথাটার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। লাতিন আমেরিকান জনগোষ্ঠী আমাদের এখানে অনেক বড় এবং তাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা বাড়ছেই। তারা মার্কিন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। তাদের রক্তেই আছে ফুটবল (সকার)। তাদের বাবা-মায়েরা ফুটবল পছন্দ করেন। লাতিন সংস্কৃতিতে বাচ্চাকে ছোটবেলায় বল উপহার দেওয়া হয় খেলনা হিসেবে। বাবা যে ক্লাবের সমর্থক তাকে সেই ক্লাবের ছোটদের জার্সি দেওয়া হয়। সেই ঝলক, সেই ট্যাকটিকাল সামর্থ্য তাদের খেলায় থাকবে। মার্কিনি অনেক শিশু হয়তো প্রিমিয়ার লিগের খেলা দেখে আর লাতিনরা দেখে মেক্সিকান লিগ, আর্জেন্টিনার লিগ, ব্রাজিলের লিগ, লা লিগা। আফ্রিকান আমেরিকানরা খেলার মধ্যে অ্যাথলেটিসিজমটা নিয়ে এসেছে। এনবিএ (বাস্কেটবল) দাপিয়ে বেড়াচ্ছে আফ্রিকান আমেরিকানরা। আমার মনে হয়, আমেরিকান সকারের এটাই একটা শক্তির জায়গা, বৈচিত্র্য। আমার একাডেমির একটা ছেলে, আফ্রিকান-আমেরিকান ওয়েস্টন ম্যাককিনি, সে জুভেন্তাসে ডাক পেয়েছে। ভাবা যায়! আলফানসো ডেভিসের কথাই দেখুন, সে বায়ার্ন মিউনিখে খেলবে কে ভেবেছিল।