সরিয়ে নেওয়া হয়েছে প্রায় দুই লাখ মানুষ

সময় যত বাড়ছে, ততই উপকূলের দিকে আগাচ্ছে অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় মোখা। বাড়ছে মোখার কেন্দ্রে বাতাসের গতিবেগও। আজ রবিবার যেকোনো সময় আঘাত হানতে পারে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে। কক্সবাজার জেলা ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্রে পড়লেও এর প্রভাবে বিস্তার ক্ষতি হতে পারে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, বরিশাল, ভোলা বরগুনাসহ আরও কিছু উপকূলীয় জেলায়; বিশেষ করে বেড়িবাঁধ ধসে যাওয়া উপকূলের কিছু এলাকায় দেখা দিয়েছে চরম শঙ্কা। এ ছাড়া যেসব দুর্গম চরে পর্যাপ্ত ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নেই, সেই সব এলাকার মানুষও আছেন চরম ঝুঁকিতে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের নিরাপদে সরানোর কাজ চলছে। কাজ করছে সরকারি-বেসরকারি নানা সংস্থা। ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) আওতায় প্রস্তুত করা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র। ইতিমধ্যে সরবরাহ করা হয়েছে শুকনো খাবার, পানীয়, ওষুধসহ জরুরি মেডিকেল পণ্য। মাইকিং করে দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। নিরাপত্তার স্বার্থে সাগর ও নদীপথে বন্ধ করা হয়েছে নৌ চলাচল।

এদিকে অনেক এলাকার মানুষ গতকাল শনিবার বিকেলেও আশ্রয়কেন্দ্রে যাননি। তাদের কেউ কেউ চুরির আশঙ্কায় ঘরবাড়ি ছাড়েননি আবার কেউ কেউ পূর্বাভাসকে পাত্তা না দিয়ে থেকে গেছেন এলাকায়; বিশেষ করে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর অনেকেই আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে চাননি। গতকাল সকাল থেকেই ওই সব এলাকায় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হলেও মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা গেছে তুলনামলক কম।

দেশ রূপান্তরের সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধি ও সংবাদদতাদের পাঠানো তথ্যে বিস্তারিত :

মহাবিপদে কক্সবাজার : মোখার প্রভাবে গতকাল সকাল থেকেই কক্সবাজারের সমুদ্র প্রচন্ড উত্তাল। স্বাভাবিকের চেয়ে তিন-চার ফুট উচ্চতায় জোয়ার হয়েছে ইতিমধধ্যে। প্লাবিত হয়েছে নিম্নাঞ্চল। আসন্ন মহাবিপদ থেকে লাখো লোকের জানমালের হেফাজতের জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে জেলা প্রশাসন। তবে মোখা ভয়ংকর রূপ নিলে নড়বড়ে বেড়িবাঁধ ও রক্ষণাবেক্ষণহীন সাইক্লোন শেল্টার দিয়ে জনগণের জানমালের হেফাজত করা তেমন সম্ভব হবে বলে মনে করছেন অনেকে। 

যেমন এর আগে একমাত্র আশ্রয়কেন্দ্রটিতে যেতে সাহস পাচ্ছেন না কক্সবাজারের টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের জালিয়াপাড়ার বাসিন্দারা। নাফ নদীর গর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে জালিয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন শেল্টারটি, কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ আশ্রয়কেন্দ্রটি রয়েছে উপজেলা প্রশাসনের তালিকায়। জালিয়াপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ফরিদুল আলম বলেন, ‘সাইক্লোন শেল্টারের একাংশ নাফ নদীর পানিতে বিলীন হয়ে গেছে। কিছুটা মেরামতও হয়েছে, কিন্তু এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে পানি যদি বেড়ে যায়, তাহলে ঝুঁকি আছে। মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ বলে আশ্রয় নিতে চাচ্ছে না।’

আবার অনেকে আশ্রয়কেন্দ্রে এলেও তাদের চিন্তা বাড়িঘরে ফেলে আসা জিনিসপত্র নিয়ে। কক্সবাজারের বিমানবন্দর সড়কের আশ্রয়কেন্দ্র সৈকত বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছেন কয়েক শো মানুষ। সেখানে আসমা নামের এক কিশোরী জানায়, তার বাবা নেই। সে তার মা ও দুই বোন মিলে সাগরপাড়ে টংঘর করে থাকত। নিরাপত্তার জন্য তারা শেল্টারে এসেছে। এখানে এসে একটু শান্তি মিললেও ঘরে ফেলে আসা মালামাল নিয়ে দুশ্চিন্তা হচ্ছে তাদের। 

যদিও কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহীন ইমরান দাবি করেছেন, শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত জেলার আট উপজেলার ও দুই পৌরসভার ১ লাখ ৮৭ হাজার ৭০৩ জন লোককে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনা হয়েছে। তাদের ৭৭৫টি আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।

এর মধ্যে কক্সবাজার পৌরসভার ১২টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৩২ হাজার ২১৫ জন এবং সদরের ৫১টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৪ হাজার ৯৯১ জনকে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া রামুর ৪২টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১ হাজার, চকরিয়া পৌরসভার ১৩টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২ হাজার ৬৫২,  চকরিয়া উপজেলার ৯৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৪ হাজার ১৫, পেকুয়ার ৮৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৪ হাজার ৩৫, উখিয়ার ৪৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১১ হাজার ৩৩ জন সেন্ট মার্টিনের ৩৭টি হোটেল-মোটেল ও সরকারি অফিসে ৪ হাজার ৩০৩, টেকনাফের ৫৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২৩ হাজার ১৫৯, মহেশখালীর ৯৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১৫ হাজার ৩২৫ এবং কুতুবদিয়ার ৯২টি আশ্রয়কেন্দ্রে  ৮৪ হাজার ৯৭৫ জন আশ্রয় গ্রহণ করেছে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বিভেষণ কান্তি দাশ জানিয়েছেন, স্থানীয়দের নিরাপদে সরাতে প্রায় ১০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন।

জেলার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ে অবস্থিত ৩৩টি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির। এসব শিবিরে বসবাস করছে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা।

শিবিরের অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. সামছুদ্দৌজা নয়ন বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৫ হাজার স্বেচ্ছাসেবক ও ১ লাখ ৯০ হাজার শেল্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ লক্ষ্যে রোহিঙ্গাশিবিরে কর্মরত জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর, আন্তর্জাতিক অভিবাসন আইওএম ও বিশ^ খাদ্য কর্মসূচিসহ বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির স্বেচ্ছাসেবক, রেডক্রিসেন্টসহ অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবকদেরও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

বাঁশখালীতে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ কম : চট্টগ্রামের উপকূলীয় উপজেলা বাঁশখালীতে দেখা গেছে, আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার অনীহা। গতকাল সেখানে সরেজমিনে দেখা গেছে, সাধারণ জনগণ এখন পর্যন্ত নিজ বাসাবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত না হলেও প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের চাপের মুখে অনেকে বাধ্য হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে বের হচ্ছে। বেশ কিছু লোকজন তাদের আত্মীয় স্বজনের পাকা বাড়িতে চলে যাচ্ছে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে। অনেকে নিজেদের পোষা প্রাণী গরু-ছাগলও নিয়ে যাচ্ছে।

উপজেলা প্রশাসনের পক্ষে জনপ্রতিনিধি ও বাঁশখালীর উপকূলীয় ১০টি ইউনিয়নে সিপিপির ১ হাজার ৪২০ জন স্বেচ্ছাসেবক দুর্গতদের আশ্রয়কেন্দ্রে আনতে কাজ করে যাচ্ছে। বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান চৌধুরী জানান, আগাম প্রস্তুতি হিসেবে ১১০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ইতিমধ্যে লোকজন উঠতে শুরু করেছে। যেখানে প্রায় এক লাখ মানুষ আশ্রয় নিতে পারবে। তাদের খাবার, ওষুধের জন্যও প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

হাতিয়ায় নৌ চলাচলা বন্ধ : ঘূর্ণিঝড় মোখা মোকাবিলায় নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। ২৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র ও ৩ হাজার ৬০০ স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রয়েছে। ১২টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। দুর্ঘটনার আশঙ্কায় বন্ধ রাখা হয়েছে নৌ চলাচল। গতকাল সকাল ১০টা পর্যন্ত হাতিয়ায় মোখার প্রভাব লক্ষ করা যায়নি। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ কায়সার খসরু আশ্রয়কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করে স্বেচ্ছাসেবকদের সরঞ্জামসহ প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। হাতিয়া সিপিপির সহকারী পরিচালক বদিউজ্জামান বলেন, হাতিয়ায় সিপিপির ১৭৭ ইউনিটের ৩ হাজার ৬০০ সদস্যকে লাইফ জ্যাকেট, গাম বুট ও রেইনকোটসহ ১৪ রকম সরঞ্জাম বিতরণ করা হয়েছে।

ঝুঁকিতে বরগুনার লক্ষাধিক মানুষ : বরগুনাসহ উপকূলের দিকে ধেয়ে আসছে অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় মোখা। ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ অনুযায়ী মোখা সরাসরি বরগুনা উপকূলে আঘাত না হানলেও এর প্রভাবে উপকূলীয় জেলা বরগুনার নদ-নদীতে উচ্চ জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা করছে আবহাওয়া বিভাগ। এদিকে নাজুক বেড়িবাঁধের কারণে ঝুঁকিতে রয়েছে লক্ষাধিক মানুষ। পানি উন্নয়ন বোর্ড বরগুনা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার ২২টি পোল্ডারে ৮০৫ কিলোমিটার বাঁধের মধ্যে বর্তমানে প্রায় ৩  কিলোমিটার বাঁধ নদীতে বিলীনের ঝুঁকিতে রয়েছে। বরগুনা সদর উপজেলায়  ১  কিলো ২৫ মিটার, আমতলী ১২০ মিটার, তালতলীতে ৫৪০ মিটার, পাথরঘাটায় ৫৮৫ মিটার, বামনা উপজেলার  ৩৪০ মিটার,  বেতাগীতে ১৯০ মিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে নদীতে বিলীনের মুখে রয়েছে।

বরগুনার জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান বলেন, ঘূর্ণিঝড় মোখা মোকাবিলায় বরগুনায় মোট ৬৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে মোট ২ লাখ ৬৯ হাজার ৫১০ জন আশ্রয় নিতে পারবে। দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলায় ২৯৪ মেট্রিকটন খাদ্যশস্য মজুদ রাখা হয়েছে। দুর্যোগ-পরবর্তী জরুরি ত্রাণ বাবদ ৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ হয়েছে এবং ১৪২ বান্ডিল ঢেউটিন ও গৃহনির্মাণ ব্যয় বাবদ ৪ লাখ ২৬ হাজার টাকা, ২ হাজার কম্বল ও ২ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার মজুদ রয়েছে। এ ছাড়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি জরুরি সাড়াদান কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। জেলার ৪২টি ইউনিয়নে ৪৯টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে।

ঝালকাঠিতে নদীপারের মানুষ আতঙ্কে : ঝালকাঠিতে ঘূর্ণিঝড় মোখার প্রভাব না থাকলেও সকাল থেকে গুমোট আবহাওয়া বিরাজ করছে। শনিবার সকাল থেকেই আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে গেছে। জেলার সুগন্ধা, বিশখালী, হলতাসহ নদ-নদীগুলো ভয়ানক রূপ ধারণ করেছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। জেলায় এখন পর্যন্ত ৬১ সাইক্লোন শেল্টারসহ দুই শতাধিক স্কুল-কলেজ আশ্রয় প্রার্থীদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। মাইকিং করে উপকূলের মানুষকে নিরাপদে থাকার জন্য সতর্ক করছে জেলা প্রশাসন।

জেলা প্রশাসক ফারাহ গুল নিঝুম বলেন, জেলার আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ৮০ হাজার মানুষ আশ্রয় নিতে পারবে। পাশাপাশি গবাদিপশুর জন্যও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আশ্রয় নেওয়া মানুষের জন্য পর্যাপ্ত শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

পিরোজপুরে প্রস্তুত প্রশাসন : ঘূর্ণিঝড় মোখার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পিরোজপুরে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহেদুর রহমান জানান, মোখা মোকাবিলায় পিরোজপুরে প্রস্তুত করা হয়েছে ২১৩টি সাইক্লোন শেল্টার। যেখানে এক লাখ মানুষ আশ্রয় নিতে পারবে। এছাড়া ১৯৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রস্তুত করা হয়েছে, যেখানে আরও ৭০-৮০ হাজার মানুষ আশ্রয় নিতে পারবে।

এদিকে জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার সাপলেজা, বড়মাছুয়া ও ইন্দুরকানী উপজেলার টগরা ফেরিঘাট এলাকার ৩৪৯ বেড়িবাঁধের প্রায় ১৪৪ কিলোমিটার অরক্ষিত রয়েছে স্বীকার করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান বলেন, মঠবাড়িয়ার খেতাছিড়া, কচুবাড়িয়া, বড়মাছুয়া ভাঙন এলাকায় কিছু গাইড ওয়াল করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় জিওব্যাগ ফেলে ভাঙনরোধের চেষ্টা করা হয়েছে। এ ছাড়া হাতে বেশ কিছু জিওব্যাগ প্রস্তুত আছে, যা জরুরি কাজের সময় ব্যবহার করা যাবে।

ভোলার চরাঞ্চলের মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে আনা হচ্ছে : ঘূর্ণিঝড় মোখার প্রভাবে ভোলার আকাশ মেঘাচ্ছন্ন রয়েছে। থেমে থেমে বইছে বাতাস। উপকূলীয় জেলা ভোলায় নদী তীরবর্তী  মাছ ঘাটগুলোতে সর্বসাধারণকে সতর্ক করতে সচেতনতামূলক মাইকিং করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ চরাঞ্চলের মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসক তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী জানান, ঘূর্ণিঝড় মোখা মোকাবিলায় দ্বীপ জেলা ভোলায় সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে ভোলায় ৭৪৬টি আশ্রয়কেন্দ্র ও মুজিব কিল্লা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। খোলা হয়েছে ৮টি কন্ট্রোল রুম। এ ছাড়া সিপিপির ১৩ হাজার ৬০০ জন স্বেচ্ছাসেবকের পাশাপাশি ৯২টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলায় ৩৫০ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য মজুদ রাখা হয়েছে। দুর্যোগ-পরবর্তী জরুরি ত্রাণ বাবদ নগদ ৮ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ১৬৪ বান্ডিল ঢেউটিন, শুকনো খাবার মজুদ রয়েছে।

প্রভাব নেই মোংলায় : ঘূর্ণিঝড় মোখার কোনো প্রভাব এখন পর্যন্ত পড়েনি মোংলা বন্দরে। শনিবার সকাল থেকে আকাশ মেঘলা থাকলেও রয়েছে সূর্যের খরতাপ। রোদ-মেঘে অনেকটা গুমোট আবহাওয়া বিরাজ করছে মোংলাসহ সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকাজুড়ে। তবে উপকূলের কোথাও কোথাও হালকা বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়া অফিস।

এদিকে শুক্রবার বিকেলে ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত জারির পর মোংলা বন্দরে অবস্থানরত দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজের পণ্য বোঝাই-খালাস কাজে নিয়োজিত শ্রমিক-কর্মচারীদের সন্ধ্যায় নামিয়ে আনা হয়েছে। ফলে জাহাজের পণ্য ওঠানামার কাজ বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট স্টিভিডরস কোম্পানি ও শিপিং এজেন্ট প্রতিনিধিরা।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দীপংকর দাশ বলেন, যদিও ঘূর্ণিঝড় মোখা আমাদের এদিকে আঘাত হানার তেমন আশঙ্কা নেই, তারপরও আমরা সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত, খাবার ও ওষুধ মজুদ করা হয়েছে।

বরিশালে লঞ্চ চলাচল বন্ধ : ঘূর্ণিঝড় মোখার কারণে বরিশালের অভ্যন্তরীণ রুটের সব ধরনের লঞ্চ চলাচল বন্ধ করেছে বিআইডব্লিউটিএ। গতকাল সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিআইডব্লিউটিএর নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিদর্শক মো. কবির হোসেন। তিনি বলেন, ‘শনিবার সকাল থেকে বরিশালের অভ্যন্তরীণ রুটে কোনো লঞ্চ ঘাট থেকে ছেড়ে যায়নি। আপাতত সব ধরনের লঞ্চ চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। সেই সঙ্গে বরিশাল নদীবন্দর এলাকার আশপাশ থেকে বিভিন্ন রুটে যাতায়াতকারী স্পিডবোটগুলোর চলাচলও বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

নৌযান বন্ধে বিচ্ছিন্ন রাঙ্গাবালী : নৌপথ নির্ভর পটুয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা রাঙ্গাবালী। স্পিডবোট, লঞ্চ ছিল যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় মোখার কারণে নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ায় শুক্রবার শেষ বিকেল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে দ্বীপ উপজেলা রঙ্গাবালী। ফলে দুর্ভোগে পড়েছে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মানুষজন। পটুয়াখালী নদীবন্দরের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর দিনেশ কুমার সাহা বলেন, ঘূর্ণিঝড় মোখার কারণে সারা দেশে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ নৌপথে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে সতর্কসংকেত মেনে বিভিন্ন নৌপথে ফেরি চলছে। পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত নৌযান চলাচল বন্ধ থাকবে বলে জানান তিনি।

দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে লঞ্চ চলাচল বন্ধ : রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ও মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া নৌরুটে লঞ্চ চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে বিআইডব্লিউটিএ। শুক্রবার রাতে এ ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিআইডব্লিউটিএ দৌলতদিয়া লঞ্চঘাটের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মো. আফতাব হোসেন। তিনি জানান, বিআইডব্লিউটিএর পরিচালকের নির্দেশে শুক্রবার রাত থেকেই পরবর্তী নির্দেশ দেওয়ার আগ পর্যন্ত দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে সব ধরনের লঞ্চ চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় মোখা ক্রমশ উপকূলের দিকে প্রবল বেগে এগিয়ে আসতে থাকায় এবং এর তীব্রতা বাড়তে থাকায় এ ঘোষণা দেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব কেটে গেলে পুনরায় লঞ্চগুলো চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে।

নারায়ণগঞ্জ থেকেও সব রুটে লঞ্চ চলাচল বন্ধ : বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় মোখার প্রভাবে নারায়ণগঞ্জ থেকে লঞ্চ চলাচল বন্ধ করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের উপপরিচালক (নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক) বাবু লাল বৈদ্য বলেন, ঘূর্ণিঝড় মোখার কারণে হেড অফিসসহ নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের কন্ট্রোলরুম খোলা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় বাতিল করা হয়েছে সব কর্মকর্তার ছুটি। শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে নারায়ণগঞ্জের সব নৌপথে লঞ্চ চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে। এ ছাড়া যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে সব বন্দরে মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে।