যতটা তীব্রগতিতে আঘাত হানবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল তার চেয়ে কম গতিতে গতকাল রবিবার বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উপকূল অতিক্রম করেছে ঘূর্ণিঝড় মোখা। অতি প্রবল এ ঝড়ের ঝাপটা বাংলাদেশ অংশে মূলত গেছে কক্সবাজারের টেকনাফ ও সেন্টমার্টিন দ্বীপের ওপর দিয়ে।
ঘূর্ণিঝড় মোখার তাণ্ডবে তছনছ হয়ে গেছে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন। টানা প্রায় চার ঘণ্টার ঝোড়ো হাওয়া ও ভারী বৃষ্টিতে দ্বীপটির বিভিন্ন এলাকায় বিধ্বস্ত হয়েছে ১ হাজার ২০০ ঘরবাড়ি, হোটেল ও রিসোর্ট। তীব্র বাতাসে গাছ উপড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে গোটা উপকূলীয় অঞ্চল। গতকাল রাত ১টায় এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড়ে ১১ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া কক্সবাজারের মহেশখালীতে লবণের মাঠে বৃষ্টির মধ্যে কাজ করার সময় ঠাণ্ডাজনিত কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ে তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
ঘূর্ণিঝড় মোখার প্রভাবে উপকূলবর্তী কক্সবাজার জেলার আট উপজেলায় প্রায় সাড়ে ১২ হাজার ঘরবাড়ির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া ঝড়ের প্রভাবের শিকার হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৩৪ হাজার মানুষ। গতকাল সকাল থেকে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব পড়তে শুরু করে কক্সবাজার জেলা শহর, টেকনাফ উপজেলা ও সেন্টমার্টিন দ্বীপ এবং অন্যান্য উপজেলায়। দুপুরের দিকে বৃষ্টি ও বাতাসের বেগ বাড়তে থাকে। বিকেল ৪টার পর উপকূলসংলগ্ন এলাকায় তা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। টানা এক ঘণ্টার বেশি প্রচণ্ড বাতাস ও বৃষ্টির পর আবহাওয়া ধীরে ধীরে শান্ত হতে থাকে। জেলা প্রসাশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, রাস্তাঘাটে গাছপালা উপড়ে বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে প্রচুর। সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ ও সেন্টমার্টিনে।
ঘূর্ণিঝড় মোখার প্রভাবে কক্সবাজারের উপকূলবর্তী উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পেরও কয়েকশ ঘরবাড়ি ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে উপকূলে আঘাত হানার পর বাংলাদেশের কক্সবাজার এবং মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলে তাণ্ডব চালিয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় মোখা। বৃষ্টি ঝরিয়ে শক্তি হারিয়ে পরিণত হয়েছে স্থল গভীর নিম্নচাপে। দিনের আলোতেই বাংলাদেশ উপকূল পার হয় ঘূর্ণিঝড় মোখা। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসও তেমনই ছিল। তবে যে গতিতে উপকূল অতিক্রম করার কথা ছিল, সেই গতি থেকে তা কমে আসে। ঘণ্টায় সর্বোচ্চ গতি রেকর্ড হয়েছে ১৪৭ কিলোমিটার। সেন্টমার্টিনে দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে সর্বোচ্চ এ গতিতে বাতাস প্রবাহিত হয়েছিল। ঘূর্ণিঝড়ের চোখ বেলা ৩টার সময় অতিক্রম করার আগমুহূর্তে বাতাসের গতিবেগ হঠাৎ বেড়ে গিয়েছিল। পরে আবারও কমতে থাকে বাতাসের গতিবেগ।
সেন্টমার্টিনে যখন ঘণ্টায় ১৪৭ কিলোমিটার গতিতে বাতাস প্রবাহিত হয়েছে, তখন টেকনাফে রেকর্ড হয়েছে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১২১ কিলোমিটার এবং কক্সবাজারে ৮৩ কিলোমিটার। বাতাসের গতি থাকলেও জলোচ্ছ্বাস দেখা যায়নি। সেন্টমার্টিন ও টেকনাফ এলাকায় উপস্থিত থাকা স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রবল বেগে বাতাস প্রবাহিত হয়েছে। কিন্তু সাগরে জোয়ারের বাড়তি উঁচু ঢেউ ছিল না। তবে এ ঢেউ না থাকার কারণ বিষয়ে জানা যায়, ঝড়টি যখন অতিক্রম করে ওই এলাকায় ছিল ভাটার সময়। সমুদ্রের স্বাভাবিক পানি যখন সাগরমুখো থাকে, তখন সাগর থেকে ঝড়ের সঙ্গে বায়ুতাড়িত হয়ে আসা পানির গতি বেশি না হওয়ারই কথা। আর বাস্তবে হয়েছেও তাই।
এ বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো কারণে যদি উপকূলে আঘাতের সময় পিছিয়ে যেত এবং তাহলে হয়তো জোয়ার পেত। তখন জলোচ্ছ্বাস হতো।’ তবে তিনি আরও বলেন, ‘এবারের ঝড়ে উপকূলের মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়েছে। ফলে মানুষ মৃত্যু থেকে বাঁচতে পেরেছে।’
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কথার সঙ্গে বাস্তবেরও মিল রয়েছে। এবারের ঝড়ে মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়েছে। সেন্টমার্টিনের অনেক মানুষ যেমন দুদিন আগেই টেকনাফে গিয়ে আশ্রয় নেয় তেমনি যারা সেন্টমার্টিনে ছিল তারাও সেখানকার আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়। শুধু সেন্টমার্টিন নয়, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকাগুলোতেও জেলা প্রশাসনের সহায়তায় মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়েছে।
ঝড়ের সময় চট্টগ্রাম এলাকায় হালকা বৃষ্টি হলেও কক্সবাজার, টেকনাফ ও সেন্টমার্টিন এলাকায় ভালোই বৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হাসান বলেন, ‘ঝড়ের প্রভাবে আজ (গতকাল রবিবার) ও কাল (আজ সোমবার) বৃষ্টি থাকতে পারে।’ ঘূর্ণিঝড়টি কতক্ষণ সময় নিয়ে উপকূলে উঠেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সকাল ৯টা থেকে ঝড়ের অগ্রভাগ অতিক্রম করা শুরু করলেও ঝড়ের কেন্দ্রভাগ (চোখ) অতিক্রম করতে শুরু করে দুপুর ৩টা থেকে। সন্ধ্যার মধ্যে এটি মিয়ানমারের সিটওয়ে বন্দর দিয়ে উপকূলে উঠে স্থল নিম্নচাপে পরিণত হয়ে বৃষ্টিপাত ঘটাচ্ছে।’
এ আবহাওয়াবিদ আরও বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়টি সেন্টমার্টিনকে বামে রেখে ডানদিক দিয়ে মিয়ানমারে আঘাত করেছে। বাংলাদেশ উপকূল ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের বাম পাশে ছিল।’
এর আগে গত শনিবার মধ্যরাতের পর ঘূর্ণিঝড় মোখা গতি বাড়িয়ে ২১০ কিলোমিটার পর্যন্ত উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে গতি কমে যাওয়ার পর সকালে আবারও গতি বৃদ্ধি পায়। তবে সকাল ৯টায় উপকূলে আঘাতের আগমুহূর্তে গতি কমে যায়। উপকূলের কাছাকাছি এলে গতি কমে যাবে বলে আবহাওয়াবিদরা পূর্বাভাসে বলেছিলেন। বাস্তবেও তাই ঘটেছে। যদিও মোখার সম্ভাব্য প্রভাবের কথা মাথায় রেখে কক্সবাজার উপকূল ও দ্বীপগুলোকে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত এবং চট্টগ্রাম ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৮ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছিল।
উপকূল অতিক্রম করে স্থল গভীর নিম্নচাপে পরিণত : ঘূর্ণিঝড় মোখা গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় বাংলাদেশ উপকূল অতিক্রম করে মিয়ানমারে প্রবেশ করে। এরই মধ্যে এটি দুর্বল হয়ে স্থল গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে। তাই বন্দরগুলোতে বিপদসংকেতও কমিয়ে আনা হয়েছে। গতকাল রাতে আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ ২২ নম্বর বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মোখা উত্তর-উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে সন্ধ্যা ৬টায় টেকনাফ হয়ে বাংলাদেশ উপকূল পেরিয়ে যায়। এটি দুর্বল হয়ে মিয়ানমারের সিত্তওয়েতে স্থল গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে। এরপর স্থলভাগে আরও উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর ও বৃষ্টি ঝরিয়ে ক্রমান্বয়ে দুর্বল হতে পারে মোখা।
আবহাওয়া দপ্তর জানায়, মোখা বাংলাদেশ উপকূল অতিক্রম করায় কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরের ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত নামিয়ে তার পরিবর্তে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম ও পায়রা সমুদ্রবন্দরের ৮ নম্বর মহাবিপদ সংকেত নামিয়ে তার পরিবর্তে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। মোংলা সমুদ্রবন্দরকে ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত নামিয়ে তার পরিবর্তে ৩ নম্বর স্থানীয় সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় মোখার বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য জানাতে গতকাল রাত ৮টার দিকে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ব্রিফিং করা হয়। সেখানে বলা হয়, ঘূর্ণিঝড় মোখা বাংলাদেশ উপকূল অতিক্রম করায় সতর্ক সংকেত নামানো হয়েছে। সাগর কিছুটা উত্তাল থাকায় ৩ নম্বর সংকেত বহাল রাখা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়টি এখন নিম্নচাপে পরিণত হওয়ার ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট, চট্টগ্রাম ও উপকূলীয় অঞ্চলে বৃষ্টির প্রবণতা থাকতে পারে। এর প্রভাবে বঙ্গোপসাগরের স্বাভাবিক বাতাস থাকবে। এ কারণে স্বাভাবিক জোয়ারের তুলনায় পানি কিছুটা বেশি হতে পারে। তবে জলোচ্ছ্বাসের কোনো আশঙ্কা নেই।
৪ ঘণ্টার তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড সেন্টমার্টিন : গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির সঙ্গে প্রবল বেগের বাতাস নিয়ে প্রায় চার ঘণ্টা ধরে কক্সবাজারে তাণ্ডব চালিয়েছে ঘূর্ণিঝড় মোখা। এতে গতকাল রাত ১০টায় এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির খবর না পাওয়া গেলেও বড়মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন এবং টেকনাফ পৌরসভা, সদর ও সাবরাংয়ের কিছু অংশ। কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৩টি পৌরসভা ও ৫৭টি ইউনিয়ন দুর্যোগকবলিত হয়েছে।
এ বিষয়ে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ও ঘূর্ণিঝড় নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের প্রধান বিভীষণ কান্তি দাশ বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় মোখার আঘাতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেন্টমার্টিন দ্বীপ। জেলার ৫৭টি ইউনয়ন ও ৩টি পৌরসভা দুর্যোগকবলিত হয়েছে। সব মিলিয়ে জেলার দুর্গত মানুষের সংখ্যা ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৬২০ জন। এ ছাড়া আমরা প্রাথমিকভাবে ২ হাজার ২২টি ঘর সম্পূর্ণ বিধস্ত এবং ১০ হাজার ৪৬৯টি ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তথ্য পেয়েছি। এই মুহূর্তে আমাদের তৈরি খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি এবং শাড়ি, লুঙ্গি ও থ্রি-পিস দরকার।’ তিনি আরও বলেন, ‘জেলার ৭৭৫টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২ লাখ ৩৭ হাজার ২৪১ জন আশ্রয় নিয়েছে। সংকেত কমলে তারা নিজ গৃহে ফিরে যাবে।’
কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ও আবহাওয়া অফিস থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড় মোখার তীব্রতায় সেন্টমার্টিন, টেকনাফ ও সাবরাংয়ে উড়ে গেছে ঘরবাড়ির চালা। উপড়ে গেছে গাছগাছালি। গাছ পড়ে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে।
এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কামরুজ্জান বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় মোখা লন্ডভন্ড করে দিয়েছে সেন্টমার্টিনকে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এই জনপদ। মোখার বাতাসের তীব্রতায় গাছ পড়ে এই ইউপির ১১ জন আহত হয়েছে। দ্বীপের অধিকাংশ গাছপালা ভেঙে গেছে। বিধ্বস্ত হয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ ঘরবাড়ি।’
এ বিষয়ে সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূর আহমেদ বলেন, ‘দ্রুত ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন প্রয়োজন। এ ছাড়া দ্বীপে খাবার ও পানির সংকট দেখা দিতে পারে এটিও বিবেচনায় রাখতে হবে প্রশাসনকে।’
সেন্টমার্টিনের মতো লণ্ডভণ্ড না হলেও টেকনাফ সদর, সাবরাং, হ্নীলা, হোয়াইক্যং, শাহপরীর দ্বীপ উপকূল প্লাবিত হয়েছে। ভেঙেছে গাছগাছালি। এতে অনেক সড়ক-উপসড়কে চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
টেকনাফ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল আলম জানিয়েছেন, উপজেলার শাহপরীর দ্বীপ, সাবরাং, টেকনাফ পৌরসভা, সদর ইউনিয়ন ও বাহারছড়া ইউনিয়নের বহু গাছপালা উপড়ে পড়েছে। এসব এলাকার কমপক্ষে ৩০ শতাংশ গাছ ভেঙে গেছে। এ ছাড়া বহু ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে।
মোখার প্রভাবে বাতাসের তীব্রতায় উখিয়া ও টেকনাফে ৩৩টি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের চার শতাধিক বসতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কর্মকর্তা (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। ক্ষতিগ্রস্তদের বিভিন্ন লার্নিং সেন্টার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাখা হয়েছে। নষ্ট হওয়া ঘরগুলো সংস্কারের জন্য জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে।
এদিকে কক্সবাজার সদর, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও অন্যান্য উপকূলে মোখার প্রভাব তেমন পড়েনি। তবে কিছু কিছু এলাকায় বাতাসে গাছের ডালপালা ভেঙে পড়েছে। এতে আহত বেশ কয়েকজন কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আশিকুর রহমান।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী ড. তানজির সাইফ আহমেদ জানিয়েছেন, জেলার ৫৯৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ৩২ কিলোমিটার অরক্ষিত ছিল আগে থেকেই। এই ৩২ কিলোমিটারের বাইরে কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘মোখা যতটুকু আঘাত আনার কথা তা হয়নি। তার কারণ আঘাত আনার সময়টি ভাটা এবং পূর্ণিমা-অমাবস্যার মধ্যে সময়কাল। তার সঙ্গে ঢেউর বিপরীত দিকে বাতাসের দিক হওয়ায় ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা কমেছে।’
কক্সবাজার আঞ্চলিক আবহাওয়া কার্যালয়ের প্রধান (ভারপ্রাপ্ত) আবহাওয়াবিদ আবদুর রহমান জানিয়েছেন, গতকাল বেলা ৩টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ১৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এরপর বৃষ্টির তীব্রতা বেড়েছে। তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের অগ্রভাগ ১৪০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার বেগে সেন্টমার্টিন হয়ে মিয়ানমারের দিকে অগ্রসর হয়েছে।
ট্যুরিস্ট পুলিশের সেন্টমার্টিন জোনের কর্মকর্তা সহকারী উপপরিদর্শক মাহফুজ বলেন, ‘মোখার প্রভাবে তীব্র দমকা ঝড়ো হাওয়ায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয়রা আগে থেকে আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করায় জানমালের ক্ষতি রোধ করা সম্ভব হয়েছে। তবে অনেক বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে এলাকার লোকজন জানিয়েছে।’
মহেশখালীর ইউএনও মোহাম্মদ ইয়াছিন জানান, উপজেলাটিতে বাতাসের তীব্রতা বেশি হলেও জলোচ্ছ্বাস ছিল না। ফলে বড় ধরনের কোনো ক্ষতি হয়নি। তবে বাতাসে কিছু কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া আগে থেকেই লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরানো হয়েছিল বলে হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি।
কুতুবদিয়ার ইউএনও দীপংকর তঞ্চ্যঙ্গা বলেন, ‘কুতুবদিয়ায় মোখার তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। হালকা বৃষ্টি ও বাতাসে কোথাও কোথাও ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে সঠিক তথ্য জানাতে পারব।’
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মো. আবু সুফিয়ান বলেন, ‘মোখার তীব্রতার মধ্যেও বেশ কিছুসংখ্যক পর্যটক কক্সবাজারে অবস্থান করছিলেন। আমরা তাদের দেখভাল ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্টদের সচেষ্ট রেখেছিলাম। দুর্যোগ এড়াতে পর্যটন এলাকার ৬৮টি হোটেলকে আশ্রয়কেন্দ্র ঘোষণা করে সেখানে দুর্গতদের রাখা হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সেন্টমার্টিন নিয়ে চিন্তায় ছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আমরা আজকে (রবিবার) রাতও অবজারভেশনে থাকব। বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে প্রশাসনের সমন্বয় হয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন।’
কক্সবাজারের বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া তিন লাখ মানুষ গতকাল বিকেল ৫টা থেকে আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে নিজ নিজ ঘরে ফিরে যেতে শুরু করে। যদিও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ও ঘূর্ণিঝড় নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের প্রধান বিভীষণ কান্তি দাশ জানিয়েছেন, এত দ্রুত তাদের আশ্রয়কেন্দ্র না ছাড়ার জন্য বলা হয়েছে। পরিস্থিতির আরও উন্নতি হলে সবাইকে ঘরে পৌঁছে দেওয়া হবে।
সার্বিক বিষয়ে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. শাহী ইমরান বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমরা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা নির্ধারণ করেছি। সেই অনুয়ায়ী ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। পরিপূর্ণ ক্ষতি নিরূপণ করতে কিছুটা সময় লাগবে। তবে আশার কথা হচ্ছে, আগে থেকে পূর্বপ্রস্তুতি থাকায় বড় ধরনের কোনো অঘটন ছাড়াই আমরা এ দুর্যোগ পাড়ি দিতে পেরেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সেন্টমার্টিনে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষকে সেখানেই অবস্থান করতে বলা হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় আশ্রয়কেন্দ্র ত্যাগের অনুমতি দেওয়া হবে। আশ্রয়কেন্দ্রে খাবার ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহে সংশ্লিষ্টরা কাজ করছেন।’
মহেশখালীতে লবণের মাঠে ৩ চাষির মৃত্যু : ঘূর্ণিঝড় মোখা যখন উপকূলীয় অঞ্চলে তাণ্ডব চালাচ্ছিল তখন কক্সবাজারের মহেশখালী দ্বীপের চাষিরা ঝড়ের কবল থেকে লবণ বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন। এ সময় বৃষ্টির মধ্যে কাজ করার সময় ঠাণ্ডাজনিত কারণে বেশ কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়েন। যাদের মধ্যে তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তারা হলেন উপজেলার হোয়ানক ইউনিয়নের কালাগাজীরপাড়া গ্রামের আবুল ফজলের ছেলে রিদুয়ান (৩৫), পানিরছড়া গ্রামের আকতার কবিরের ছেলে মো. নেছার (৩২) ও বারঘরপাড়ার মো. আনছার (৩৬)।
হোয়ানক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মীর কাশেম চৌধুরী এ তিনজনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, ঘূর্ণিঝড় মোখার সময় বারঘরপাড়ার পশ্চিমের লবণ মাঠে কাজ করতে গিয়ে ঠান্ডাজনিত কারণে অসুস্থ হয়ে বিকেলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজন মারা যান। এ ছাড়া রাতে লবণ মাঠের পানিতে ভাসমান অবস্থায় আরও দুজনের মৃতদেহ উদ্ধার করে লোকজন। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছে।
এলাকাবাসী জানায়, গতকাল সকালে মাঠের পলিথিন ও লবণ ওঠানোর জন্য ৪০-৫০ জন শ্রমিক মাঠে যান। বৃষ্টির মধ্যে কাজ করার কারণে ঠাণ্ডায় ছয়-সাতজন অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে বিকেল সাড়ে ৪টায় রিদুয়ানকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। বাকিদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এদিকে অনেক শ্রমিক রাত হলেও বাড়ি না ফেরায় তাদের খুঁজতে স্বজনরা লবণ মাঠে যান। সেখানে রাত সাড়ে ১০টার দিকে ভাসমান অবস্থায় নেছার ও লবণ মাঠের আরেকপ্রান্ত থেকে রাত ১২টার দিকে আনছার নামে আরেক শ্রমিকের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এ সময় সোনা মিয়া নামে আরেক চাষিকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তিনি মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন।
এলাকাবাসী জানায়, হোয়ানকের বিভিন্ন গ্রামের আরও ১০-১৫ জন লবণচাষি গতকাল রাত ১২টায় এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত ঘরে ফেরেননি।
মহেশখালী থানার ওসি প্রণব চাকমা বলেন, ‘লোকমুখে তিনজনের মৃত্যুর খবর শুনেছি। তবে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে আমরা কোনো তথ্য পাইনি। তারপরও আমি হাসপাতালে পুলিশ পাঠিয়েছি। এ ছাড়া নিখোঁজের ব্যাপারে আমাকে কেউ কিছু এখনো জানায়নি।’
মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ ইয়াসিন বলেন, ‘লবণ মাঠে তিনজনের মৃত্যু ও কয়েকজন অসুস্থ হওয়ার কথা শুনেছি।’
হাতিয়ায় চরাঞ্চলবাসীর আতঙ্কিত দিন পার : ঘূর্ণিঝড় মোখার প্রভাবে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় গতকাল দিনভর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হয়। পাশাপাশি মাঝেমধ্যে দক্ষিণ দিক থেকে হালকা বাতাস বয়েছে। সকালে জোয়ারের পানির উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩-৪ ফুট বেশি ছিল, তবে দুপুরে ভাটার সময় তা কমে যায়। বেড়িবাঁধ না থাকায় বঙ্গোপসাগরঘেঁষা নিঝুমদ্বীপ, হরণি ও চানন্দি এবং নড়বড়ে ভাঙা বেড়িবাঁধের কারণে তমরদ্দি, চরকিং, চরঈশ্বর, নলচিরা ও সোনাদিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দারা আতঙ্কে দিন কাটিয়েছেন। তবে শেষমেশ তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি।
পায়রা বন্দরে পণ্য খালাস বন্ধ : ঘূর্ণিঝড় মোখার কারণে পটুয়াখালীর পায়রা বন্দরে সব ধরনের পণ্য খালাস কার্যক্রম গতকাল বন্ধ ছিল। বন্দরের চ্যানেল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় তিন বিদেশি জাহাজ এমভি আর্ক রাফায়েল, এমভি ওয়াইএম অ্যাডভান্স ও এমভি প্লাজিকা। পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য কয়লা নিয়ে ইন্দোনেশিয়া থেকে এসেছিল এসব জাহাজ। এমভি আর্ক রাফায়েল কয়লা খালাস শেষে গত শনিবার বিকেলেই পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জেটি ছেড়ে ভারতের উদ্দেশে রওনা হয়। এ ছাড়া বাকি দুটি জাহাজ ইনার অ্যানক্রোজ থেকে সরিয়ে নিরাপদ স্থানে রাখা হয়েছে। বন্দরে থাকা লাইটার জাহাজগুলোও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নোঙর করা হয়েছে।
শেষ সময়ে বেড়িবাঁধ রক্ষায় তোড়জোড় : গত বছর ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ ভেঙে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সিত্রাংয়ের পর এক বছর পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ মেরামতে উদ্যোগ নেয়নি পানি উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় মোখার আতঙ্কে শেষ সময়ে বেড়িবাঁধ রক্ষায় উঠেপড়ে লেগেছে স্থানীয় প্রশাসন। গতকাল মাইটভাঙ্গা ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে ১৫০ মিটার বেড়িবাঁধ সংস্কারের কাজ চলতে দেখা যায়। একই চিত্র দেখা গেছে উপজেলার সারিকাইত, মগধরা, পৌরসভা ও বিভিন্ন ইউনিয়নে। বেড়িবাঁধে বসবাসকারীরা অভিযোগ করে বলেন, বেড়িবাঁধ নতুন যে মাটি দিয়ে সংস্কার করা হয়েছে, ঘূর্ণিঝড় তো দূরের কথা, তীব্র বৃষ্টি হলেই এসব মাটি সরে যাবে। আরও আগে এ সংস্কার করা উচিত ছিল।
নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম এবং সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলার প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে প্রতিবেদনটি তৈরি