সঞ্চালন লাইনের চুক্তির বিষয়ে অগ্রাধিকার

বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে বিদ্যুৎ বাণিজ্যের লক্ষ্যে পটুয়াখালীর পায়রায় দুদেশের যৌথ কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে আজ সোমবার থেকে। দুদিনব্যাপী এ আয়োজনে প্রথম দিন যুগ্ম সচিব পর্যায়ের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ এবং দ্বিতীয় দিন সচিব পর্যায়ের জয়েন্ট স্টিয়ারিং কমিটির পঞ্চম বৈঠক হবে।

নেপালের সঙ্গে সরাসরি সীমান্ত না থাকায় দেশটি থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে ভারতীয় সঞ্চালন লাইন ব্যবহারের জন্য কীভাবে দেশের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি করা যায় সে বিষয়ে নেপাল ও বাংলাদেশ আলোচনা করবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ এবং নেপালের যৌথ উদ্যোগে নেপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিষয়টি এবারের যৌথসভায় গুরুত্ব পাবে। বৈঠকে যোগ দিতে নেপাল থেকে গত দুদিনে ১৪ জন প্রতিনিধি বাংলাদেশে এসেছেন। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

ভারতের পাশাপাশি নেপাল থেকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ আমদানির পরিকল্পনা দীর্ঘদিনের। কিন্তু ভারতের ওপর দিয়ে বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হওয়ায় এটি বাস্তবায়নে দেরি হচ্ছে। তবে এই জটিলতা দূর করতে তিন দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। ভারতও এ ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেছে।

এর আগে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে খুলনায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ভারত যৌথ স্টিয়ারিং কমিটির ২১তম সভায় নেপাল থেকে ভারতের ওপর দিয়ে বাংলাদেশে জলবিদ্যুৎ আমদানির বিষয়ে ভারত সম্মতি দেয়। এ ব্যাপারে তিন দেশীয় একটি চুক্তির বিষয়েও দুই দেশ একমত পোষণ করে। তবে এজন্য ভারতের এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে বিদ্যুৎ সঞ্চালনে বাংলাদেশের করিডর ব্যবহারের সুবিধা দিতে হবে।

পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, নেপালের সঙ্গে এবারের বৈঠকে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে দুদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে আলোচনা হবে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ও নেপালের যৌথ বিনিয়োগে নেপালে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ, ভারতের ওপর দিয়ে বর্তমান গ্রিডলাইন ব্যবহার করে নেপাল থেকে ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়টি প্রাধান্য পাবে। এ ছাড়া নতুন সঞ্চালন লাইন নির্মাণ ও জিএমআরের বিদ্যুৎ আমদানি এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনার পর দুদেশের সম্মতিতে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

ভারত-বাংলাদেশ যৌথসভায় জিএমআর কর্র্তৃক নেপালে উৎপাদিত জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ভারতের মাধ্যমে বাংলাদেশে ৫০০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি স্বাক্ষর, ভুটানে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বাংলাদেশ, ভারত ও ভুটানের ত্রিপক্ষীয় বিনিয়োগ এবং বাংলাদেশে সেই বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

নেপালে আপার কার্নালি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কিনতে ২০১৯ সালে ভারতীয় কোম্পানি জিএমআরের সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) সই করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। তবে প্রাথমিকভাবে ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়ে দুদেশ ঐকমত্যে পৌঁছায়। এই বিদ্যুৎ ভারত হয়ে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা দিয়ে দেশে আসবে। এজন্য দিল্লির সঙ্গে ঢাকা ও কাঠমান্ডুর ত্রিপক্ষীয় চুক্তি সই করতে হবে।

গত বছরের ২৫ অক্টোবর নেপালের রাষ্ট্রদূত ঘনশ্যাম ভান্ডারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎকালে বলেছেন, নেপাল এ মুহূর্তে বাংলাদেশকে ৪০-৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে, তবে তাদের বিদ্যুৎ খাতে একটি মেগা প্রকল্প শেষ হওয়ার পর এর পরিমাণ আরও বাড়বে।

গত বছরের সমঝোতা অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং নেপালের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি (এনইএ) ভারতের এনটিপিসিকে সে দেশের লাইন ব্যবহার করে একটি ত্রিপক্ষীয় বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির জন্য অনুরোধ জানানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর এনইএ দ্বিপক্ষীয় বিদ্যুৎ বাণিজ্যের জন্য এনটিপিসির মাধ্যমে ভারতীয় কর্র্তৃপক্ষের কাছে একটি চিঠিও পাঠিয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নেপাল ও ভারতের মধ্যে ১০তম জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ এবং সচিব পর্যায়ের যৌথসভায় নেপালের ওই প্রস্তাবে ভারত নীতিগত সম্মতি দিয়েছে। নেপালে গত বছর চালু হওয়া ৫২ দশমিক ৪ মেগাওয়াট লিখু-৪ বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ভারতের বিদ্যমান সঞ্চালন লাইন ব্যবহার করে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার পরিকল্পনা নিয়েছে।

ভারতের বিদ্যমান বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ব্যবহারের পাশাপাশি পরে নেপাল থেকে আরও বিদ্যুৎ আনার ক্ষেত্রে ভারতীয় ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে একটি আলাদা বা নির্দিষ্ট সঞ্চালন লাইন নির্মাণের বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে বৈঠকে।

নেপাল এবং বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে নেপালে ৬৮৩ মেগাওয়াট সানকোশি-৩ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়েও আলোচনা হবে। কেন্দ্রটি তৈরিতে দুই দেশ বিনিয়োগ করবে বলে গত বছরের আগস্টের শেষ দিকে যৌথসভায় বাংলাদেশ ও নেপাল সম্মত হয়েছিল। প্রকল্পটির সমীক্ষা ও পরিবেশের প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনটি ইতিমধ্যে বাংলাদেশে পাঠিয়েছে নেপাল। বিষয়টি নিয়ে দুদেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি নেপাল ও বাংলাদেশের জল ও সৌরবিদ্যুৎ উন্নয়নে তাদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করবে।