না-ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা, সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেন পাঠান ফারুক। তার মৃত্যুর খবরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে দেশের সাংস্কৃতিক জগতে। শেষ বিদায়ে তাকে স্মরণ করেছেন কাছের চার সহকর্মী।
ভেবেছিলাম ফারুক ভাই ফিরে আসবেন
ববিতা
সকালে ফারুক ভাইয়ের মৃত্যুর খবরটি জানার পর থেকেই আমি ভীষণ মর্মাহত। পাঁচ-ছয় দিন আগে ফারুক ভাইয়ের স্ত্রীর বোনের সঙ্গে আমার দেখা হয়। তখন তিনি বলেছিলেন, ফারুক ভাইয়ের অবস্থা ভালোর দিকে। উনি দেশে চলে আসবেন। ওনার পায়ে ব্লাড সার্কুলেশনের একটু সমস্যা হচ্ছে। এটা শুনে মনে হয়েছিল, ফারুক ভাই অমাদের মাঝে ফিরে আসবেন। কিন্তু এখন তো সব শেষ হয়ে গেল। ফারুক ভাইয়ের মৃত্যুর খবরটি মেনে নিতে পারছি না। শুধু আল্লাহর কাছে দোয়া করে বলি, আল্লাহ যেন তাকে বেহেশত নসিব করেন। আমরা একসঙ্গে অসংখ্য সুপারহিট সিনেমায় অভিনয় করেছি। তবে ওনার সঙ্গে প্রথম যে সিনেমায় জুটি বেঁধে অভিনয় করি, সেটি হলো ‘আলোর মিছিল’। এটি দেশ স্বাধীনের পর পর করেছিলাম। পরিচালক ছিলেন নারায়ণ ঘোষ মিতা। তারপর ‘লাঠিয়াল’, ‘আবার তোরা মানুষ হ’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘নয়নমণি’, ‘সূর্য সংগ্রাম’, ‘মিয়া ভাই’সহ বহু সিনেমায় আমরা একসঙ্গে অভিনয় করেছি। ফারুক ভাইয়ের সিনেমায় আমাকে নিয়েছেন। আমি আমার সিনেমায় ফারুক ভাইকে নিয়েছি। আমরা যখন কাজ করেছি, তখন আমাদের মাঝে একটা পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। আমরা একে অপরের সুখ-দুঃখের কথা শুনেছি, জেনেছি। ফারুক ভাই আমার বাড়িতে আসতেন ভাবিকে নিয়ে। আসার সময় ভাবি আবার রান্না করে নিয়ে আসতেন। যখন ফারুক ভাইয়ের কিডনির সমস্যা হয়েছিল, আমরা তিন বোন তাকে দেখতে গিয়েছিলাম। পারস্পরিক এই হৃদ্যতা আমাদের মাঝে ছিল। ফারুক ভাইয়ের সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয়েছে ২০১৬ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে। আমাদের যুগ্মভাবে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়। সেদিন অনেক কথা হয়েছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সামনে আমি সেদিন ফারুক ভাইয়ের অনেক প্রশংসা করেছি।
আমি শোকাহত
আলমগীর
আমি শোকাহত। ফারুকের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। আল্লাহর কাছে দোয়া করছি, যেন ফারুকের সব গুনাহ মাফ করে তাকে জান্নাতবাসী করেন এবং সেই সঙ্গে দেশবাসীর কাছে আমি অনুরোধ করব, তার জন্য দোয়া করতে।
বেঁচে থাকবেন অনবদ্য কর্মের মাধ্যমে
অঞ্জনা
কথাটা শোনার পরেই বুকের ভেতর ছ্যাঁত করে উঠল। চলে গেলেন আমাদের বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি চিত্রনায়ক আমার অসংখ্য সুপার বাম্পারহিট চলচ্চিত্রের জননন্দিত মাটি ও মানুষের সফল চিত্রনায়ক ফারুক ভাই। আমার তৃতীয় মাইলস্টোন চলচ্চিত্র ‘মাটির মায়া’য় প্রথম ফারুক ভাইয়ের সঙ্গে অভিনয়। এরপর অসংখ্য চলচ্চিত্রে অভিনয়ের কত মধুময় স্মৃতি, যা ভেবে চোখ বারবার অশ্রুসিক্ত হয়ে যাচ্ছে, বুক ভার হয়ে যাচ্ছে। ফারুক ভাই জীবদ্দশায় সব সময় বলতেন, এত চলচ্চিত্রে জীবনে অভিনয় করেছি, কিন্তু ‘ফুলেশ্বরী’ আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র। যার গান সব সময় আমি গুনগুন করে গাই ‘নদীরে কত রঙ্গ দেখালি আমায়...’। এই কথাগুলো কখনোই ভুলে যাওয়ার নয়। ফারুক ভাই, আপনি বেঁচে থাকবেন আপনার অনবদ্য শ্রেষ্ঠ কর্মের মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রের স্বপ্নিল আকাশে, কোটি দর্শকের হৃদয়ে অনন্তকাল। আমি ও ফারুক ভাই অভিনীত উল্লেখযোগ্য সুপারহিট ছায়াছবিগুলো হলো ‘মাটির মায়া’, ‘প্রিয় বান্ধবী’, ‘ছোট মা’, ‘চোখের মণি’, ‘সখী তুমি কার’, ‘মাসুম’, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘সুখের সংসার’, ‘মেহমান’, ‘ভাগ্যলক্ষ্মী’, ‘রক্তের বাঁধন’, ‘অন্ধ বধূ’, ‘ফুলেশ^রী’ ইত্যাদি।
আমাকে স্নেহে আগলে রেখেছিলেন
শাকিব খান
চলে গেলেন আমাদের প্রিয় ‘মিয়া ভাই’। চলচ্চিত্রের সব জ্যেষ্ঠ গুণিজনরা আমাকে সব সময় স্নেহে আগলে রাখেন। নায়ক ফারুকও ছিলেন তেমন। যত দিন তিনি সুস্থ-সবল ছিলেন, তত দিন আমাকে স্নেহে আগলে রেখেছিলেন। আমার কোনো ভালো কাজ এবং ছবির পোস্টার কিংবা ট্রেলার রিলিজ হলে তিনি নিজে থেকে অ্যাপ্রিশিয়েট করে গর্বিত হতেন। আমার কাছে শ্রদ্ধাভাজন এই মানুষটি ছিলেন চলচ্চিত্র অঙ্গনে প্রাজ্ঞজনদের একজন। কাজে কিংবা কাজের বাইরে এই মহান মানুষটির সঙ্গে আমার অসংখ্য স্মৃতি। তার প্রয়াণে প্রিয় অভিনেতা হারানোর পাশাপাশি একজন অভিভাবক হারানোর শোক অনুভব করছি। ওপারে অনেক শান্তিতে থাকবেন।