৫০ বছরে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটেছে। কিন্তু বিপুল সংখ্যক মানুষ এর সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছে। উৎপাদনে অন্তর্ভুক্তির অভাব এবং অর্থনীতিতে অনানুষ্ঠানিকতার প্রাধান্যের কারণে উন্নয়নের সাফল্য কিছু লোকের মধ্যে কেন্দ্রীভূত ছিল। বাংলাদেশের এতটা উন্নতির পরও অনানুষ্ঠানিক খাতে রয়ে গেছে ৯৮ শতাংশ ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান। আইনি জটিলতা ও করের ভয়ে তারা ছোটই থাকতে চাচ্ছে। তবে আশার কথা হলো ডিজিটাল প্লাটফর্মের কারণে এসব অনানুষ্ঠানিক খাতের ব্যবসায়ীরা কিছুটা আলো দেখছে।
গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) কনফারেন্স রুমে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট স্টোরি : রোল অব ম্যানুফ্যাকচারিং সার্ভিস অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরস ইন ড্রাইভিং ডাইভারসিফিকেশন অ্যান্ড ইনক্লুসিভ গ্রোথ’ শীর্ষক সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরেন বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান অর্থনীতিবিদ হ্যান্স টিমার।
হ্যান্স টিমার বলেন, উন্নয়নে সুযোগের অসমতার উপস্থিতি ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়। শিক্ষা, চাকরি এবং উৎপাদনের বৈষম্য ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির বৈচিত্র্যকে অনিশ্চিত করে তুলবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মূল সমস্যা হলো অনানুষ্ঠানিক খাত নিয়ে। অনানুষ্ঠানিক খাতে রয়েছে ৯৮ শতাংশ ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ৯৭ শতাংশ কারখানা বহিরাগত হিসেবে রয়ে যায়।
তিনি তার প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, নতুন এ ডিজিটাল সময়ে এসে অনানুষ্ঠানিক খাতের এসব ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ফোকাসে আসছে। বিশেষ করে ই-কমার্সের মাধ্যমে তারা তাদের পণ্য বিক্রির সুযোগ পাচ্ছে। এসব অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান ই-কমার্সে যুক্ত হওয়ার পর থেকে তাদের বিক্রি ও ব্যবসা বেড়েছে।
তার মতে, এসব প্রতিষ্ঠান আইনি জটিলতা ও করের ভয়ে ছোটই থাকতে চাচ্ছে। এটা হয়তো তাদের সীমিত ব্যবসায়িক দক্ষতার কারণে হয়ে থাকে। এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীরা দ্বৈত অর্থনীতির মধ্যে পড়েছে।
তিনি বলেন, উৎপাদনে অন্তর্ভুক্তির অভাব এবং অর্থনীতিতে অনানুষ্ঠানিকতার প্রাধান্যের কারণে উন্নয়নের সাফল্য কিছু লোকের মধ্যে কেন্দ্রীভূত। বাংলাদেশের সুযোগের বৈষম্যের কথা তুলে ধরে হ্যান্স টিমার বলেন, আমরা এখানে অসমতা ও সুযোগের বৈষম্যকে আলোচনায় রাখছি। লিঙ্গ বৈষম্য থেকে শুরু করে ধর্ম ও জন্মস্থানের বৈষম্যও এখানে প্রবল। গত তিন যুগ ধরে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়ছে।
তিনি বলেন, বিশ্বে যে কয়টি জায়গায় সুযোগের বৈষম্য সবচেয়ে বেশি, দক্ষিণ এশিয়া তার মধ্যে অন্যতম। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না থাকায় বাংলাদেশের উৎপাদনশীল অর্থনীতি সামনে এগোচ্ছে না। এটি সামষ্টিক অর্থনীতির একটি বড় সমস্যা। এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে নারীদের জন্মহার কমে গেছে। তাছাড়া শ্রমে নারীদের অংশগ্রহণও অনেক কম। বাংলাদেশে নারীদের অংশগ্রহণ ৩৬ শতাংশ।
তার মতে, বাংলাদেশ শিক্ষায় অনেক এগিয়েছে। এতে তাদের সাফল্যও অনেক। তবে তারা দক্ষতায় পিছিয়ে আছে। তাদের অর্থনৈতিক আকাক্সক্ষা রয়েছে। বাংলাদেশের নারীরা এ মুহূর্তে শ্রমবাজারে আসতে পছন্দ করছেন। এখন বাংলাদেশের উচিত সরাসরি বিদেশি অর্থায়ন আনা। এফডিআই কীভাবে আনবে সেটা নিয়ে কাজ করতে হবে। ভিয়েতনাম কীভাবে এত এফডিআই পায়, বাংলাদেশ কেন পায় না সেটা নিয়ে ভাবার প্রয়োজন আছে। এখানে বড় একটা অভ্যন্তরীণ বাজার আছে। এখানে আমদানি বাড়ালে একইসঙ্গে রপ্তানি বাড়াতেও কাজ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিআইডিএসের গবেষক ড. কাজী ইকবাল বলেন, বাংলাদেশের পোশাক খাতে অনেক বড় পরিবর্তন এসেছে। রপ্তানি বৈচিত্রায়ণ বড় ভূমিকা রাখছে। অনানুষ্ঠানিক খাত নিয়েও কাজ চলছে। তবে সমস্যার জায়গা হলো, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে একটি মেয়ে তার ১২ বছরের পড়াশোনা শেষ করে কোথায় চাকরি নেবে সেটাই বড় চিন্তা থাকে। কারণ তার গ্রামে সে ধরনের কর্মসংস্থান নেই। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে শ্রমিকদের জন্য এমনিতেই সুযোগ অনেক কম।
বিআইডিএসের মহাপরিচালক বিনায়ক সেন বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বর্তমানে ৩৬ থেকে ৪৩ শতাংশ। আমাদের অর্থনীতিতে তারা অনেক অবদান রাখছে। এটা বিস্ময়কর যে, এদেশের উদ্যোক্তারা এত সমস্যা সত্ত্বেও কীভাবে এত উন্নয়ন ঘটিয়েছে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে কিছু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গিয়েছে।
বিনায়ক সেন আরও বলেন, ট্রিমার এখানে একক পণ্য হিসেবে পোশাক খাতের দাপট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু বিশ^বাজারে পোশাক রপ্তানি বাড়িয়েও রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ আছে। বিশ^বাজারে পোশাকের ক্ষেত্রে চীনের অংশগ্রহণ ৩৩ শতাংশ, যেখানে বাংলাদেশের মাত্র ৬ শতাংশ।