ভূমিকম্পের হাতছানি প্রয়োজন ন্যূনতম প্রস্তুতি

বিগত ৫ মে নিত্যদিনের মতো ভোরে উঠে আরাম কুঠরিতে গিয়ে আরামের কাজ শুরু করেছি। এমন সময় কমোড খট করে শব্দ করে বসল; মনুষ্য-চাপে ওপরের পাটাতনে স্থানচ্যুতিতে মাঝে মধ্যে কমোডের এরকম শব্দ শুনতে পাই। কিন্তু ভয় পেয়ে গেলাম হাতে রাখা সেল ফোনে তৎক্ষণাৎ ভেসে ওঠা ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা পাঠ করে। এখন কি তাহলে জনবহুল ঢাকা মহানগরীকে লক্ষ্য নির্ধারণ করে এই দানব পদযাত্রা শুরু করে দিয়েছে?

পরে টিভির পর্দায় চলন্ত বার্তা পাঠ করে বুঝলাম এ দানব তার সর্বশেষ উপস্থিতি ঘোষণা করেছে ঢাকার অদূর দোহারে, যার উপকেন্দ্র ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে। প্রায় ১০ সেকেন্ডের স্থায়িত্বকালে রিখটার স্কেলে ৪.৩ মাত্রার এই অসুর তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে সমর্থ হয়নি। এরপর বিশেষজ্ঞরা একের পর এক টিভির পর্দায় অভিমত ব্যক্ত করা শুরু করলেন। কেউ কেউ বললেন যে, এটা বড় কোনো আলোড়নের পূর্বাভাস, কাজেই আমাদের এখনই সতর্ক হতে হবে। আবার অনেকে আশ্বস্ত করে জানালেন যে, অগভীর উৎস থেকে উৎসারিত এই জাতীয় স্বল্পমাত্রার ভূমিকম্প বরং বড় ধরনের ভূমিকম্প প্রতিরোধে সহায়তা করছে; নানা কারণে ভূ-অভ্যন্তরে তৈরি হওয়া যে পুঞ্জীভূত তেজ ভূমিকম্পের জন্য দায়ী, এই সব ছোটখাটো ভূকম্পনে তার অনেকটাই অবমুক্ত হয়ে যায়। ফলে এগুলোকে কোনো অঞ্চলে ভূ-স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে নির্দোষ টিউমার হিসেবে গণ্য করা যায়।

সে যে যাই বলুন না কেন, ভূমিকম্প বিষয়টা কেন যে এখনো মানুষের জ্ঞানের অগম্য, তা এক বিরাট রহস্য বটে। সভ্যতা এখন এমন এক উচ্চতায় উপনীত হয়েছে যে, বৃহত্তর পরিসরে মানুষ এখন মহাকাশে সাঁতার কাটছে, গ্রহ-উপগ্রহে তার বসতি গড়তে যাচ্ছে; অদূর ভবিষ্যতে সৌর জগতে কী ঘটতে যাচ্ছে, তাও বলে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। আবার, ক্ষুদ্র পরিসরে তারা অনেক প্রাণী ও উদ্ভিদের জীবন রহস্য উন্মোচন করে ফেলছে, অযৌন পদ্ধতিতে ক্লোন তৈরি করছে, কলকব্জার মতো প্রাণীর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন করছে। অথচ, মাত্র ৬,৩৭৮ কিলোমিটার ব্যাসার্ধ বিশিষ্ট মাতৃসম এই ধরিত্রীর গহ্বরে কী ঘটে চলেছে, তা আমরা ঘটনা ঘটার এক মুহূর্ত আগেও ঠাহর করতে পারছি না। বৈশ্বিক পরিসরে আকস্মিকভাবে জানমালের ব্যাপক ও মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির একটা প্রধান কারণ এই ভূমিকম্প। সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির কথা বাদ দিলেও ১৯৯৮ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ভূমিকম্প বিশ্বে প্রায় ৭,৫০,০০০ মানুষের প্রাণ সংহার করে। বিগত ৬ ফেব্রুয়ারি তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তে যে ভূমিকম্প হয়, তাতে ৫৯,২৫৯ জন আদম সন্তান প্রাণ হারান। সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হিসাব করা হয় তুরস্কে ১০৪ বিলিয়ন এবং সিরিয়ায় ১৪.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সেখানে ৩,৪৫,০০০টি ফ্ল্যাট বাড়ি ধ্বংস হয়ে যায় এবং ৪ মিলিয়ন দালানকোঠা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে ভূমিকম্পপ্রবণ ঐ অঞ্চলে বিল্ডিং কোড না মেনে ভবন নির্মাণ করায় এত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি ঘটে। পাঠক, এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থাটা একবার বিবেচনা করুন।

বর্তমানে বাংলাদেশ যে অঞ্চল নিয়ে গঠিত তা যে অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা, তা বোধকরি কাউকে বেশি বুঝিয়ে বলার দরকার পড়ে না। জেমস রেনেল ১৭৮০ সালে অখণ্ড বাংলার যে মানচিত্র প্রকাশ করেন, তাতে যমুনার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। ধারণা করা হয় যে, ১৭৬২ সালে এবং তৎপরবর্তী সময়ে উচ্চমাত্রার ভূমিকম্পে মধুপুর অঞ্চলের ভূভাগ উঁচু হয়ে যাওয়ায় ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ বাহাদুরাবাদ পয়েন্ট থেকে দক্ষিণমুখী হয়ে যমুনা নাম ধারণ করে বঙ্গোপসাগরের দিকে ধাবমান হয়। আমার নিজের জেলা সিরাজগঞ্জ তখন ময়মনসিংহ জেলার জামালপুর মহুকুমার অংশ ছিল। প্রমত্ত যমুনা পার হয়ে মহুকুমা শহর জামালপুরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা কষ্টসাধ্য হওয়ায় ১৮৫৫ সালে সিরাজগঞ্জকে পাবনা জেলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বর্তমানে ভূতত্ত্ববিদদের মতে বাংলাদেশের ডাউকি ফল্টে যে কোনো সময় ৮.২ মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে। তাছাড়া, সিলেট থেকে কক্সবাজারের পাহাড়ি অঞ্চলের নিচে যে তেজ সঞ্চিত হয়ে আছে, তা থেকেও ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

২০০৯ সালে সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি (সিডিএমপি) ও জাইকার এক যৌথ জরিপে বলা হয় যে, ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকার কমপক্ষে ৭২,০০০ ভবন ভেঙে পড়বে এবং ১,৩৫,০০০ বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ঢাকার নির্মাণকাজের অন্যতম প্রধান দুর্বলতা হলো খাল-বিল, পুকুর-ডোবা, নালা-নর্দমা প্রভৃতি ভরাট করে সেখানে বিল্ডিং কোড অনুসরণ না করে ভবন নির্মাণ এবং সেখানে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের শিথিল তত্ত্বাবধান। ফলে দেখা যায় যে, ভূমিকম্প ছাড়াই এসব জায়গায় অনেক ভবনের পতন ঘটে। ২০০৫ সালে স্পেকট্রামস সোয়েটার ফ্যাক্টরি ভবন এবং ২০১৩ সালে রানা প্লাজার ধসে পড়া এই জাতীয় দুর্ঘটনার বড় দুটি দৃষ্টান্ত। প্রথমোক্ত ঘটনায় ৭৩ জন এবং শেষোক্ত ঘটনায় ১১৩৪ জন মানুষের মৃত্যু ঘটে। উভয় ক্ষেত্রেই ভবনের উচ্চতা অননুমোদিতভাবে ৪ থেকে ৫ তোলা পর্যন্ত বাড়ানোর অভিযোগ ছিল। আরও অভিযোগ ছিল ভরাট করা নরম মাটিতে ভবন নির্মাণ, নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার ও বাণিজ্যিক কাজের উপযোগী ভবনকে উৎপাদনশিল্প সংক্রান্ত কাজে ব্যবহার। জরিপ করলে দেখা যাবে যে, এসব অনিয়ম অধিকাংশ ভবনের বেলায় প্রযোজ্য; আর ভবন নির্মাতা ও তত্ত্বাবধানকারী উভয় শ্রেণিই এইসব অনিয়মের প্রশ্রয়দাতা ও সুবিধাভোগী।

ভূমিকম্প প্রতিরোধ করার কোনো উপায় এখনো বের হয়নি; হয়নি এর পূর্বাভাস দেওয়ার কোনো কৌশলও। কিন্তু নানা প্ররোচক পদক্ষেপ গ্রহণ করে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি যতটা সম্ভব নিম্ন পর্যায়ে রাখা যায়। ভবন নির্মাণের জন্য বিল্ডিং কোড যথাযথভাবে অনুসরণ, মাটির ধারণ ক্ষমতা নিশ্চিতকরণ, নির্মাণ সামগ্রীর মান নিশ্চিতকরণ, তত্ত্বাবধানকারী কর্র্তৃপক্ষের গাইড লাইন অনুসরণ ও দৃষ্টান্তমূলক তত্ত্বাবধান কার্যক্রম পরিচালন প্রভৃতি সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমাতে সাহায্য করতে পারে, তবে এগুলো কখনই ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাকে নির্মূল করতে পারে না। এজন্য দুর্ঘটনা-উত্তর উদ্ধার কার্যক্রমের গুরুত্ব এখানে অপরিসীম।

আমাদের সংস্কৃতি হলো ‘গাইতে গাইতে গায়েন, আর বাজাতে বাজাতে বায়েন’; চাপে না পড়লে বা বাধ্য না হলে আমরা কোনো কাজ করতে চাই না। তবে একই কাজ বারবার করতে গিয়ে যেসব ভুলত্রুটি দেখা দেয়, সেগুলো ক্রমে সংশোধিত হয়ে কিছুটা হলেও পরিপূর্ণতা আসে। যেমন বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় এখন আমাদের দক্ষতা বেশ প্রশংসিত। কিন্তু আগুন নিয়ন্ত্রণে সেই পারঙ্গমতা এখনো আসেনি। তাইতো কিছুদিন আগে মহানগরীর পুরনো একটি জনবহুল এলাকায় অতিশয় দাহ্য পদার্থ বোঝাই গুদামে একাধিকবার আগুনের সূত্রপাত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পূর্বসূরি ও উত্তরসূরি মন্ত্রী বাহাদুর দ্বয়কে নিজের দায় অপরের ঘাড়ে চাপাতে সংবাদ সম্মেলন করতে দেখতে পাই। এই জাতীয় কৌতুককর সংবাদ সম্মেলনের অন্তত দুটি উপকার রয়েছে; প্রথমত, জনমানুষের নির্মল আনন্দ লাভ, দ্বিতীয়ত, কর্তাদের দায়িত্ব পালনের চাপ। উপর্যুপরি আগুন নেভানোর কাজ করতে করতে হয়তো অল্প দিনের মধ্যে যথেষ্ট দক্ষতা অর্জিত হবে। কিন্তু ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ সফলভাবে মোকাবিলা করতে ‘গাইতে গাইতে গায়েন’ মডেল আদৌ ফলপ্রসূ হবে না।

কোনো অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকম্প আসে দুই তিন শতাব্দী অন্তর একবার দুইবার। এই অঞ্চলে সর্বশেষ বড় মাত্রার (৮.২) ভূমিকম্প হয় আসামে ১৮৯৭ সালে। কাজেই এর উদ্ধার কাজে কোনো প্রজন্মেরই প্রত্যক্ষভাবে হাত পাকানোর সুযোগ নেই; তাত্ত্বিক জ্ঞান ও অন্যদের বাস্তব অভিজ্ঞতাই এখানে প্রধান পাথেয়। এটা ঘন ঘন আবর্তন না করায় জনসাধারণ, নীতিনির্ধারক ও মাঠকর্মীদের মধ্যে এর ভয়াবহতা এবং ব্যাপকতা সম্পর্কে সম্যক সচেতনতা অনুপস্থিত। আরেকটা বিষয় হলো সম্ভাব্য উদ্ধার কাজের ব্যাপকতা এবং লজিস্টিকসের লভ্যতা। স্পেকট্রামস সোয়েটার ফ্যাক্টরি ভবন ও রানা প্লাজার উদ্ধার কার্যক্রমে যথাক্রমে ১০ দিন ও ১৭ দিন সময় লাগে। এখানে সেনাবাহিনীর চৌকস কর্মীরাও কাজ করেন। তারপরও যদি একটা ভবনের উদ্ধার কার্যক্রমে এত সময় লাগে, তবে বড় কোনো ভূমিকম্পে হাজার হাজার ভবন ধসে পড়লে, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে, গ্যাসের লাইনে আগুন লেগে গেলে, ধ্বংসস্তূপে রাস্তাঘাট অগম্য হয়ে পড়লে পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, তা এক মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন।এই প্রেক্ষাপটে মহানগরীতে প্রশিক্ষণ দেওয়া কয়েক হাজার স্বেচ্ছাসেবক কি আদৌ কোনো কাজে আসবে?  

কালের আবর্তন ও আশপাশে এ দানবের অল্পবিস্তর উদ্ভাস দেখে মনে হচ্ছে যে, এটা মোকাবিলা করতে প্রস্তুতি গ্রহণ করার সময় এসে গেছে। মানুষ সচেতন না হওয়ায় এবং ক্ষুদ্র ব্যক্তি ও ব্যবসায়িক স্বার্থে অপরিকল্পিতভাবে অনেক ভরাট ও নির্মাণকাজ সম্পন্ন করায় ইতিমধ্যে সমস্যা চরম আকার ধারণ করে ফেলেছে। এর প্রতিকার ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে সম্ভাব্য পর্বতসম উদ্ধার কাজ কীভাবে দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করা যাবে, তার আধুনিক ও গতিশীল ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন করতে। এর জন্য বিশেষজ্ঞ ও স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে মতবিনিময় ও সভা-সমাবেশ করতে হবে; শুরু করতে হবে নিয়মিত মহড়া। বর্তমানে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকার যাই থাকুক না কেন, জান বাঁচানোর চেয়ে বড় কোনো অগ্রাধিকার থাকতে পারে না। বাজেটেও এর প্রতিফলন থাকতে হবে। তা না হলে সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড় হয়ে দেখা দিতে পারে। কাজেই Caveat Emptor।

লেখক: খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক

rulhanpasha@gmail.com