টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশকে কোনো দেশের ক্রিকেটাররা খুব কটাক্ষ করেছেন, এখনো করতে ছাড়েন না সুযোগ পেলে। কিন্তু সম্প্রতি ডারউইনে বাংলাদেশ এর যথার্থ জবাব দিয়েছে অস্ট্রেলিয়াকে বিধ্বস্ত করে ঐতিহাসিক জয় ছিনিয়ে এনে। ‘সময় কথা বলে’ এ কথাটি আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত। ডারউইনে সময় বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলল। ২০০০ সালের ৩০ জুন বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়েছে। অর্থাৎ টেস্ট ক্রিকেট পরিবারের গর্বিত সদস্য পদ লাভ করেছে। এরপর ২০৩০ সালের ১০ নভেম্বর ভারতের বিপক্ষে ঢাকা স্টেডিয়ামে অভিষেক টেস্ট ম্যাচ খেলেছে। মনে রাখার মতো একটি বিষয়ের সাক্ষী হয়েছেন হাজার হাজার ক্রিকেটপ্রেমিক, সেটি হলো স্ব স্ব দেশের অধিনায়ক হিসেবে যে দুজন মুদ্রা নিক্ষেপে অংশ নিয়েছিলেন তারা দুজনই ছিলেন বাঙালি। টেস্ট ক্রিকেটে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর কখনো হবে না। টেস্ট ক্রিকেট মানেই আসল ক্রিকেট। এই সংস্করণের গভীরতা দর্শন আর বৈশিষ্ট্য একদম আলাদা। টেস্ট ক্রিকেট মানেই ভিন্ন স্বাদ আর আলাদা মাধুর্যে ভরপুর ক্রিকেট।
বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে বিগত ২৬ বছরের ইতিহাসে দেশের বাইরে যে জয় সবচেয়ে আলোচিত ও স্মরণীয় সেটি হলো ডারউইনে মারারা স্টেডিয়ামে বিশ^ টেস্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে শক্তিধর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। ২০২৬-এর ১৬ আগস্ট তারিখটি আমাদের ক্রীড়া ইতিহাসে লাল হরফে লেখা হয়ে গেছে। দিনটি অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটকে তোলপাড় করে দিয়েছে। বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট শক্তিকে যারা ছোট করে দেখে তাদের ভুল ক্রমেই ভাঙছে। আর ভালো খেলে বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেটে আরেকবার উত্তাপ ছড়ানোর পাশাপাশি নতুন করে আরেক ধাপ ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। পাঁচদিনের টেস্ট ক্রিকেটে চারদিনের মধ্যে ১১ সেশনে যেভাবে প্রত্যেকটিতে দাপটের সঙ্গে প্রাধান্য বিস্তার করে টিম বাংলাদেশ সম্মিলিত দলীয় প্রয়াসের মাধ্যমে ৯ উইকেটে জয় ছিনিয়ে এনেছে এটি অসাধারণ
কৃতিত্ব। বিষয়টি ঘটেনি, ঘটানো হয়েছে। এটি সম্ভব হয়েছে খেলোয়াড় আত্মবিশ্বাস, সাহস এবং খেলার মঞ্চে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য। দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার জন্য। ভাগ্য সাহায্য করায় অস্ট্রেলিয়া রক্ষা পেয়েছে ইনিংস পরাজয় থেকে। নিজস্ব কন্ডিশনে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়া দলকে পুরোপুরি ধরাশায়ী করা চাট্টিখানি বিষয় নয়। অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ তৃতীয় টেস্ট খেলতে খেলতে নেমে জয়ের স্বাদ পেয়েছে। শ্রীলঙ্কা তো এখন পর্যন্ত টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয়ের স্বাদই পায়নি। জয় পুরো টিমের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস ও সামর্থ্যরে জয়। ২০০৩ সালে বাংলাদেশ যখন প্রথম অস্ট্রেলিয়া সফরে দুটি টেস্ট ম্যাচ খেলে তখন দুটিতেই ইনিংস পরাজয়ের মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ তো তখন ছিল টেস্ট ক্রিকেটে নবাগত। টেস্ট ক্রিকেট রপ্ত করতে পারেনি। এবারের জয়ের পর দুনিয়াজুড়ে সচেতন ‘ক্রিকেট প-িত’ কিংবা বিজ্ঞরা বুঝতে পেরেছেন টেস্ট ক্রিকেটে শক্ত অবস্থান তৈরি করে বাংলাদেশ এগিয়ে আসছে। তারা শুধু দেশে নয়, দেশের বাইরে ভিন্ন কন্ডিশনে নিয়মিতভাবে টেস্ট ম্যাচে জয়ের মুখ দেখছে। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে নিউজিল্যান্ডের মাউন্ট মঙ্গানু টেস্টে, এরপর পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে দুই টেস্টের সিরিজে হোয়াইটওয়াশ তো এমনিতে ঘটেনি, ঘটাতে হয়েছে। এখানেই খেলোয়াড়দের কৃতিত্ব। তাদের আত্মনিবেদনের পুরস্কার।
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া সবসময় বিশেষ করে নিজ কন্ডিশনে নিজকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে। এর পেছনে যুক্তিসংগত কারণও আছে। ক্রিকেট মাঠে ‘ফাইটার’ হিসেবে তাদের সুখ্যাতি আছে। যতক্ষণ খেলা কখনো হাল ছেড়ে দেয় না। বাংলাদেশ দলকে প্রথম থেকেই ‘রেসপেক্ট’ করছে অস্ট্রেলিয়া, এটি তাদের স্কোয়ার্ড গঠনে লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে। দেশের মাটিতে সবচেয়ে শক্তিশালী দল নামিয়েছিল। তারপরও রক্ষা হয়নি বাংলাদেশ বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। অস্ট্রেলিয়া দারুণ ধাক্কা খেয়েছে। তাদের একটাই কথা, বাংলাদেশ যে উইকেটে খাপ খাইয়ে নিয়ে ভালো ক্রিকেট খেলতে পারল, সেখানে অস্ট্রেলিয়ানরা পারল না কেন? তা ছাড়া এটি তো কোনো অঘটন নয়, বাংলাদেশ স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার তুলনায় মাঠে অনেক শ্রেয় ক্রিকেট খেলেই জয়ের মালা ঝুলিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন গ্রেটরা অনেকে অনেক ধরনের কথা বললেও তারা ঠিকই দলের দুর্বল ভিশনগুলো নির্ণয় করতে সক্ষম হয়েছে। নাক উঁচু অস্ট্রেলিয়ানরা বাংলাদেশকে হেয় করার সুযোগ পাননি। প্র্যাকটিস ম্যাচে বাংলাদেশ ভীষণ বাজেভাবে হেরেছে। ক্রিকেটে এটি কখনো কখনো ঘটে। তাই বলে দলটি মূল খেলায় প্রতিরোধ সৃষ্টি করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে না, এটি তো কোনো কথা নয়। দ্বিপক্ষীয় সিরিজে জিম্বাবুয়ে বাংলাদেশ একমাত্র টেস্টে পরাজিত হয়েছে, এটি তো চিন্তার বাইরে ছিল। বাস্তবতায় তো বাংলাদেশ দল হেরেছে। এটি মেনে নিয়েই তো খেলতে গিয়েছে বাংলাদেশ দল। খেলোয়াড়রা জানতেন ২৩ বছর পর তারা অস্ট্রেলিয়াতে খেলতে যাচ্ছেন। সেই ২০০৩ সালের কেউ আর নেই দলে। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে তাদের উইকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা তো সবসময় চ্যালেঞ্জ শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, সব দেশের জন্য। বাংলাদেশ দলের সবাই মিলে ভেবেছেন যদি তারা সম্মিলিতভাবে সর্বক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ক্রিকেট খেলতে পারেন তাহলে ভালো খেলা সম্ভব। আর প্রথম টেস্টে তাই হয়েছে।
ডারউইনে প্রথম সেশন থেকেই ক্রিকেটের মধ্যে ডুবে থেকে ক্রিকেটাররা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন সবাই মিলে খেলে বড় কিছু ঘটাতে হবে। খেলোয়াড় আত্মবিশ^াস, সাহস, সামর্থ্য এবং খেলার প্রতি শতভাগ নিবেদন প্রথম টেস্টে ফল পেয়েছে বাংলাদেশ দল। পূর্ণশক্তির অধিকারী অস্ট্রেলিয়াকে বিধ্বস্ত করে সিরিজে ১-০ এগিয়ে যাওয়া দুর্দান্ত বিষয়। এর আগে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ নিজ মাটিতে মিরপুর স্টেডিয়ামে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়াকে পরাজিত করেছে ২০ রানে। এই পর্যন্ত এই দুটি দেশের মধ্যে ৭টি টেস্ট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে, এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া জিতেছে ৫টি আর বাংলাদেশ ২টি টেস্টে। ডারউইনে বাংলাদেশ জিতেছে ৯ উইকেটে। এটি নতুন করে আত্মবিশ^াসকে আরও বলীয়ান করেছে। আত্মবিশ্বাস ভালো তবে আত্মতুষ্টিতে ভোগা উচিত নয়। ঐতিহাসিক টেস্ট জয় এখন অতীত হয়ে গেছে। দ্বিতীয় টেস্ট ২২ আগস্ট থেকে ম্যাকাইয়ে। অভিঘাতগ্রস্ত অস্ট্রেলিয়া কিন্তু ঘুরে দাঁড়াতে চাইবে। অস্ট্রেলিয়া টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে র্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বর দল। বাংলাদেশ আছে চার নম্বরে। আর ইংল্যান্ড আছে সাত নম্বরে। এই বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়াকে তাদের মাটিতে পুরোপুরি বিধ্বস্ত করে পরাজিত করল। অস্ট্রেলিয়া তো দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলতে চায়নি। তাদের ধারণা বাংলাদেশ টেস্ট খেললে তো তিন দিনের বেশি খেলা হবে না। এবার তারা বুঝেছে বাংলাদেশ কোথায় এখন অবস্থান করছে।
বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা তাদের মানসিকতায় বড় ধরনের পরিবর্তন সাধিত করতে সক্ষম হয়েছেন। তারা এখন চ্যালেঞ্জ নিয়ে সবসময় প্রস্তুত। শুধু দেশে নয়, বিদেশে জিততে চান। পেস বোলিংয়ে ক্রিকেট বোর্ডের কয়েক বছর ধরে বড় বিনিয়োগের ফল এখন দেশ নিয়মিতভাবে পাচ্ছে। ব্যাটিং নিয়ে কাজ চলছে। এই সাইডটি শক্তিশালী এবং নির্ভরযোগ্য হয়ে গেলে বাংলাদেশ অবশ্যই আগামীতে একটি শক্তিশালী টেস্ট দল হিসেবে চিহ্নিত হবে। এই যে পেসাররা নিয়মিতভাবে দেশের বাইরের উইকেটে দলকে জেতাচ্ছেন এটি তো এক সময় ভাবা যায়নি। এটি তো বাংলাদেশের ক্রিকেটে উত্থান। প্রথম ইনিংসে তো বাংলাদেশের পেসাররা অস্ট্রেলিয়ার ১০টি উইকেট নিয়েছেন। ডারউইনে যে বিষয়টি প্রথম দিন থেকে লক্ষণীয় হয়েছে, সেটি হলো খেলোয়াড়দের শারীরিক ভাষা। চারদিন খেলা হয়েছে কখনো মনে হয়নি এই টেস্টে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত খারাপ করতে পারে। বাংলাদেশ লিখেছে সুখময় একটি গল্প। যে গল্প অনেক অনেক বছর ধরে অনুপ্রেরণা জোগাবে। প্রথম টেস্টে জয়ের পর বাংলাদেশ দল অস্ট্রেলিয়ার মাটি থেকে সিরিজ জয়ের কথা উচ্চারিত করেছে প্রকাশ্যে।
চূড়ান্ত স্কোরটা অস্ট্রেলিয়া ১৯৮ ও ২৮৪; বাংলাদেশ ৪২৬ ও ৫৭/১, ফল বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জয়ী। ম্যান অব দ্য ম্যাচ হাসান মাহমুদ। টেস্ট ম্যাচ দুই ইনিংস মিলিয়ে ৯টি উইকেট নিয়েছেন ১১১ রানে। এদিকে ব্যাটিংয়ে প্রথম ইনিংসে তানজিদ করেছেন সেঞ্চুরি-১০১ রান, মমিনুল ৪৯, নাজমুল হোসেন শান্ত ৮৪, মিরাজ ৬৫, মুশফিকুর রহিম ৩৬, প্রত্যেকে পারফর্ম করেছেন বলেই ১৩৮ ওভারে ৪২৬ সংগ্রহ সম্ভব হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া প্রথম ব্যাট করতে নেমে ৫৩ ওভারে রান করেছে ১৯৮। ব্যাটিংয়ে ধস নামিয়ে দিয়েছেন হাসান মাহমুদ ৫৫ রানে ৬ উইকেট। ইবাদত ৩৯ রানে ২ উইকেট এবং তাসকিন ৫৫ রানে ২ উইকেট নিয়েছেন। পেসারদের খেলতে পারেননি অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানরা।
এদিকে দ্বিতীয় ইনিংসে ২২৮ রানে পিছিয়ে থেকে খেলা শুরু করে শেষ পর্যন্ত ২৮৪ রানে (৯৫.১ ওভাবে) যখন সবাই আউট হয়ে যান তখন বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল মাত্র ৫৭ রান। অস্ট্রেলিয়ার গ্রিন ১০৪ রানের একটি ধৈর্যশীল ইনিংস উপহার দিয়েছেন। স্পিনার মিরাজ ৬৬ রানে ৫ উইকেট। আরেক স্পিনার তাইজুল ৫১ রানে ১ উইকেট। পেসার হাসান মাহমুদ ৫৬ রানে ৩ উইকেট এবং তাসকিন ৬৬ রানে ১ উইকেট নিয়ে চারদিনের মধ্যেই দেশ ও দলকে বিজয়ের আনন্দে আনন্দিত করেছেন।
লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া। আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন। প্যানেল রাইটার, ফুটবল এশিয়া।