বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সাম্প্রতিক শীতলতা কাটিয়ে নতুন করে আস্থা ও সহযোগিতার পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ এখন দৃশ্যমান। সেই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর নিছক রাষ্ট্রীয় সফর বললে হবে না; বরং দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতায় পুনর্বিন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ এক রাজনৈতিক পদক্ষেপ। দুই দেশের কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, চলতি আগস্টেই দ্বিপক্ষীয় সফরে দিল্লি যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে তারিখ উল্লেখ করেও সংবাদ প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, সফর হতে ২১ বা ২২ আগস্ট। আবার দু-একদিন পেছাতেও পারে। একই সময়ে ভারত সফর ও ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণের বিষয়টি আলোচনায় থাকলেও সরকারের পক্ষ থেকে এখনো চূড়ান্ত কিছু জানানো হয়নি। তবে সফরটি হলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপড়েন কমার সুযোগ আছে কিনা এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, ‘আমি বলি, যেকোনো সময় যখন দুই দেশের প্রধান কথা বলেন, দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হয়, তখন অনেক সমস্যা সমাধানেরই সুযোগ থাকে। সেই সুযোগ তো আছেই, রয়ে গেছে। ভারতের দিক থেকেও উচিত হবে সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করা।’
সফরের গুরুত্ব বুঝতে হলে গত দুই বছরের সম্পর্কের দিকে ফিরে তাকাতে হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে দৃশ্যত দূরত্ব তৈরি হয়। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, প্রত্যর্পণ নিয়ে বাংলাদেশের দাবি, সীমান্ত ও নিরাপত্তা ইস্যু, ভিসা জটিলতা এবং বাণিজ্যিক নানা বাধা; সব মিলিয়ে সম্পর্কের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়। দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক
থাকলেও রাজনৈতিক আস্থার সংকট সেই সম্পর্ককে অনেকটাই ছায়াচ্ছন্ন করে রাখে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বলছে, দুপক্ষই এখন দূরত্ব কমাতে সংলাপের পথকে বেশি গুরুত্ব দিতে চাইছে। এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যায় বাংলাদেশের ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর ধারাবাহিক তৎপরতায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর তিনি দিল্লি গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। কূটনৈতিক সূত্রগুলো দাবি করছে, ঢাকায় উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলোয় যে বার্তা দেওয়া হয়েছিল, দিল্লিতে মোদির কাছে তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পৌঁছে দেওয়া হয়। বিশেষ করে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে একটি ‘সহায়ক পরিবেশ’ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বাংলাদেশ গুরুত্ব দিয়ে জানিয়েছে। এখানেই আসন্ন তারেক রহমানের দিল্লি সফরের রাজনৈতিক তাৎপর্য।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও নরেন্দ্র মোদি যদি মুখোমুখি বসেন, তাহলে সম্পর্কের অস্বস্তিকর বিষয়গুলো নিয়েও খোলামেলা আলোচনা সম্ভব হবে। দীনেশ ত্রিবেদীও প্রকাশ্যে বলেছেন, দুই দেশের শীর্ষ নেতার বৈঠক হলে অনেক সমস্যার সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে। তবে এই সফরকে শুধু সৌজন্য সফর হিসেবে দেখলে ভুল হবে। আলোচনার টেবিলে থাকবে একাধিক কঠিন ও দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যু। এর মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, তিস্তা, বাণিজ্য, ভিসা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সহযোগিতা ও যোগাযোগের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্যিক সম্পর্কও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের অর্থনীতি একে অপরের সঙ্গে নানা মাত্রায় যুক্ত। বাংলাদেশের জন্য ভারত বড় প্রতিবেশী বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ; ভারতের জন্যও বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ফলে রাজনৈতিক টানাপড়েনের কারণে বাণিজ্য ও যোগাযোগে অতিরিক্ত বাধা তৈরি হলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত দুই দেশের সাধারণ মানুষের ওপরই পড়ে। তাই নতুন সম্পর্কের ভিত্তি যদি সত্যিই জনকেন্দ্রিক করতে হয়, তাহলে বাণিজ্য, যাতায়াত, ভিসা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে দ্রুত স্বাভাবিক করা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে থাকবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ। বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক নয়, আইনি ও কূটনৈতিক তিনটি মাত্রাতেই জটিল।
এখানে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হবে নিজের জাতীয় স্বার্থ স্পষ্টভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি সম্পর্ককে সংঘাতমুখী না করা। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক মানে কোনো বিষয়ে আপস করে ফেলা নয়; বরং মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও আলোচনার মাধ্যমে স্বার্থের জায়গাগুলো খুঁজে বের করা। একইভাবে ভারতের জন্যও বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে স্বীকার করে সম্পর্ককে অতীতের রাজনৈতিক সমীকরণের বাইরে নিয়ে আসা জরুরি। এই জায়গায় ‘সহায়ক পরিবেশ’ কথাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিকস একটি বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্ম। সেখানে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতায় শুধু একটি বহুপক্ষীয় সম্মেলনে অংশ নেওয়া দিয়ে দ্বিপক্ষীয় সমস্যার সমাধান হবে না। সে কারণেই সরাসরি দ্বিপক্ষীয় সফর বেশি কার্যকর হতে পারে। তবে ব্রিকসের আমন্ত্রণ নিয়ে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি এ বিষয়টিও মনে রাখা জরুরি। তারেক রহমানের দিল্লি সফর তাই একদিকে যেমন সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ, অন্যদিকে তেমনি এটি একটি কূটনৈতিক পরীক্ষাও।
বাংলাদেশকে দেখাতে হবে, তারা বন্ধুত্ব চায়, কিন্তু সেই বন্ধুত্ব হবে মর্যাদা ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে। ভারতকেও দেখাতে হবে, প্রতিবেশীর রাজনৈতিক পরিবর্তনকে সম্মান করে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্ককে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা তাদের আছে। কূটনৈতিক সৌজন্য বা রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি অনেক বেশি কার্যকর বার্তা দেবে। সুতরাং দিল্লি সফরে সফলতার অর্থ শুধু একটি বৈঠক বা যৌথ বিবৃতি নয়। সফলতা হবে তখনই, যখন দুই দেশের মধ্যে জমে থাকা অবিশ্বাস কিছুটা হলেও কমবে এবং বাস্তব সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য একটি কার্যকর রোডম্যাপ তৈরি হবে।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী