আলোর অভিযাত্রায় শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

কবি আসাদ মান্নান ‘চাই তাঁর দীর্ঘ আয়ু’ কবিতায় শেখ হাসিনা প্রসঙ্গে লিখেছেন-‘মৃত্যুকে উপেক্ষা করে মহান পিতার স্বপ্নবুকে/নিরন্তর যিনি আজ এ জাতির মুক্তির দিশারী/ঘূর্ণিঝড়ে হালভাঙা নৌকাখানি শক্ত হাতে বৈঠা ধরে টেনে/অসীম মমতা দিয়ে পৌঁছুচ্ছেন আমাদের স্বপ্নের মঞ্জিলে, …’

কবির মতে, শেখ হাসিনা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী, তিনি মুক্তির দিশারি, মৃত্যুকে উপেক্ষা করে এগিয়ে চলেছেন নির্ভীকভাবে, আর গভীর মমতা দিয়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সচেষ্ট। কবির এই কথাগুলো সত্য হতো না, যদি না ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা নিজ দেশে ফিরে আসতেন। আসলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের ইতিহাস, তেমনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এদেশের শাসনকার্যে দীর্ঘকাল ক্ষমতায় আসীন থেকে মহিমান্বিত রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে মহাকালকে স্পর্শ করতে সক্ষম। এর কারণ আমরা ব্যাখ্যা করতে পারি রবীন্দ্রনাথের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে। তিনি লিখেছেন ‘আমাদের অধিকাংশেরই সুখদুঃখের পরিধি সীমাবদ্ধ; আমাদের জীবনের তরঙ্গক্ষোভ কয়েকজন আত্মীয় বন্ধুবান্ধবের মধ্যেই অবসান হয়।...কিন্তু পৃথিবীতে অল্পসংখ্যক লোকের অভ্যুদয় হয় যাঁহাদের সুখদুঃখ জগতের বৃহৎব্যাপারের সহিত বদ্ধ। রাজ্যের উত্থানপতন, মহাকালের সুদূর কার্যপরম্পরা যে সমুদ্রগর্জনের সহিত উঠিতেছে পড়িতেছে, সেই মহান কলসংগীতের সুরে তাঁহাদের ব্যক্তিগত বিরাগ-অনুরাগ বাজিয়া উঠিতে থাকে। তাঁহাদের কাহিনী যখন গীত হইতে থাকে তখন রুদ্রবীণার একটা তারে মূলরাগিণী বাজে এবং বাদকের অবশিষ্ট চার আঙুল পশ্চাতের সরু মোটা সমস্ত তারগুলিতে অবিশ্রাম একটা বিচিত্র গম্ভীর, একটা সুদূরবিস্তৃত ঝংকার জাগ্রত করিয়া রাখে।’

দেশরত্ন শেখ হাসিনার অবিচল নেতৃত্ব আর মেধার আলোয় বিশ্ব দরবারে আজ অন্য এক আলোকিত বাংলাদেশ। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি ইতিহাসের মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত একটি উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই পথে জননেত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে অনেক দূর এগিয়েছে বাংলাদেশ। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর গত প্রায় ১৪ বছরের বেশি সময়ে তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, কৃষিখাত, শিক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, অর্থনীতি, নারীর ক্ষমতায়ন ও প্রযুক্তি খাতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে এবং দ্রব্যমূল্য মানুষের ক্রয় সীমার মধ্যে থেকেছে। এ জন্য সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনে মর্যাদাকর জাতিসংঘ পুরস্কার পেয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার প্রক্রিয়া শেষ করে বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বেশ কয়েকজনের ফাঁসির রায় এবং ৭১ ’র যুদ্ধাপরাধীদের বেশ কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির রায় কার্যকর করে শেখ হাসিনার সরকার বাঙালি জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করেছে; এ সরকারের আমলে জেলহত্যা মামলার বিচারও সমাপ্ত হয়েছে। ২০১৫ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। ২০১৮ সালের ১৬ মার্চ জাতিসংঘ বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের মর্যাদা দিয়েছে। নারী-পুরুষের সমতা (জেন্ডার ইক্যুইটি) প্রতিষ্ঠায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবার ওপরে আছে বাংলাদেশ। কোন কোন ক্ষেত্রে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও অনেক সাফল্য অর্জিত হয়েছে। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) দেশে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিবেশ এবং টেকসই উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার জন্য লিডারশিপ ক্যাটাগরিতে শেখ হাসিনাকে তাদের সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্যা আর্থ-২০১৫’ পুরস্কারে ভূষিত করেছে। করোনাকালীন বৈশ্বিক মহামারীতেও বাংলাদেশের অর্থনীতি সব প্রতিকূলতাকে মোকাবিলা করে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তা বিশ্ববাসীকে অবাক করেছে।

প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর দূরদর্শী অসাধারণ নেতৃত্ব ও মানবদরদী হৃদয় নিয়ে করোনা সঙ্কটে যেভাবে দেশের নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন, তা দেশে ও বিদেশে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। বিশ্বের জনপ্রিয় ফোর্বস ম্যাগাজিনে করোনা মোকাবেলায় সফল নারী নেতৃত্বের তালিকায় (৮ জনের) স্থান করে নিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। করোনাকালীন দুর্যোগেও অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে আমাদের দেশে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৫ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক ছাড়িয়েছে, এটা বিশ্বাস করা যায়?

কিন্তু আজকের এই বাংলদেশকে আলোকিত অভিযাত্রায় আনতে অনেক লড়াই-সংগ্রাম, চড়াই-উৎরাই, হত্যা, ক্যু ও ষড়যন্ত্রকে মোকাবিলা করতে হয়েছে শেখ হাসিনাকে। ১৯৮১ সালের ১৭ এপ্রিল সামরিক জান্তার রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ও জীবনের মায়া ত্যাগ করে তিনি যদি বাংলাদেশে না ফিরতেন তাহলে মহান মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত আর দু লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিয়ে অর্জিত ধর্মনিরপেক্ষ স্বাধীন বাংলাদেশ আজ পাকিস্তানের আদলে দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম একটি মৌলবাদী, জঙ্গী ও সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত হতো। তাই শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ৭৫ ’র ১৫ই আগস্ট কালরাতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংশভাবে হত্যা করার পর বিপর্যস্ত বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর এক অনন্য অনুপ্রেরণা, তিনিই দেশে ফিরে বিভক্ত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করে সামরিক জান্তাকে উৎখাতে আন্দোলনের ডাক দেন। তাঁর ত্য্যাগ, তিতিক্ষা ও সাহসী নেতৃত্বের কারণে দেশে গণতন্ত্র ফিরে আসে, তাঁকে বার বার হত্যা চেষ্টা করা হলেও তিনি গণতন্ত্রের পথ থেকে সরে দাঁড়াননি। শেখ হাসিনার অকুতোভয় সাহসী নেতৃত্ব, সততা, মেধা ও প্রজ্ঞার কারণে বাংলাদেশ আজ আলোকিত অভিযাত্রায় শামিল হয়েছে, এগিয়ে যাচ্ছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে।

শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালের ১৭ই মে ফিরে এসেছিলেন বলেই বারবার অন্ধকারে ডুবে যাওয়া বাংলাদেশ আজ আলোর মিছিলে, কল্যাণের পথে, উন্নয়নের জোয়ারে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে জাতির পিতা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। মীরজাফর খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে আমাদের সেনাবাহিনীর কতিপয় স্বাধীনতা বিরোধী, পাকিস্তানপন্থি ক্ষমতালোভী অফিসার সেদিন যে নজীরবিহীন বর্বরোচিত নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছিল তা বাঙালির গৌরবকে ম্লান করেছে এবং বাঙালিকে চিরদিনের জন্য ভাসিয়েছে অশ্রু সাগরে। ঘাতকরা এতটাই পাষাণ ছিল যে, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশু কেউ রক্ষা পায়নি ঘাতকদের হাত থেকে। খুনী চক্র চেয়েছিল বঙ্গবন্ধুর বংশের নাম-নিশানা চিরদিনের জন্য মুছে ফেলতে। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সেদিন দেশের বাইরে অবস্থান না করলে তাদের জীবনেও নেমে আসতো একই নির্মম পরিণতি। কিন্তু ১৯৮১ সালের ১৭ই মে জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরার আগের ছয়টা বছর কি ভয়ংকর দুঃসহ যন্ত্রনায় কেটেছে শেখ হাসিনা আর তার ছোট বোন শেখ রেহানার, কল্পনা করতেও ভয় লাগবে আজ আমাদের।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বেলজিয়ামের ব্রাসেলস থেকে শেখ হাসিনা ও ওয়াজেদ পরিবারের প্যারিসে যাওয়ার কথা ছিল। সে সময় ওয়াজেদ পরিবার ও শেখ রেহানা আমন্ত্রিত হয়ে বেলজিয়ামে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের বাসভবনে অবস্থান করছিলেন। ভোর ৬টার দিকে হঠাৎ জার্মানির বনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী ফোন করে জানালেন, বাংলাদেশে একটি মিলিটারি ক্যু হয়েছে, কোনভাবেই প্যারিসের দিকে না গিয়ে তাঁরা যেন তখনি জার্মানী চলে আসেন। এই খবরটা পাওয়া মাত্র বেলজিয়ামে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সানাউল হক ওয়াজেদ পরিবার ও শেখ রেহানাকে যত তাড়াতাড়ি তার বাড়ি থেকে বিদায় দিতে পারেন সেই ব্যবস্থায় করলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা Hasina: A Daughter’s Tale’ চলচ্চিত্রে এক সাক্ষাতকারে বলেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যার খবর শুনে সানাউল হক হুমায়ুন রশীদ সাহেবকে বললেন, আপনি যে বিপদটা আমার ঘাড়ে দিয়েছেন ওটা আপনি এখন নিয়ে যান। তিনি সাক্ষাৎকারে আরো বলেন, আমাদের ওনার বর্ডার পর্যন্ত পোঁছে দেওয়ার কথা, পৌঁছে দিলেন না, সোজা বলে দিলেন গাড়ি নষ্ট। অথচ ১৪ই আগস্ট রাতে এই রাষ্ট্রদূতই অতিথিদের সম্মানে ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের আয়োজন করেছিল। উক্ত চলচ্চিত্রে সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ রেহানা বলেছেন, কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে মানুষের কী পরিবর্তন, ক্যান্ডেল লাইট ডিনার থেকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া-এই অবস্থা। জননেত্রী শেখ হাসিনার এক বান্ধবীর স্বামী তিনি ব্রাসেলসে বাংলদেশস্থ দূতাবাসে কর্মরত ছিলেন। পরে তাঁর গাড়িতে শেষ পর্যন্ত তাঁরা বর্ডার পৌঁছাতে পারেন। বর্ডারের ওপাশে জার্মানীর রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী তাঁর সেক্রেটারিকে গাড়িসহ পাঠিয়েছিলেন তাঁদেরকে নেওয়ার জন্য। ফলে শেষ পর্যন্ত বহু কষ্টে তারা জার্মানীতে হুমায়ূন রশীদ সাহেবের কাছে পৌঁছলেন।

প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা 'Hasina: A Daughter’s Tale’ চলচ্চিত্রে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আমাকে রাত্রে হুমায়ুন সাহেব আলাদা করে ডেকে নিলেন, তুমি একটু আসো, উনার ড্রয়িং রুমে উনি এবং উনার স্ত্রী বসা। তখন উনি বললেন, দেখ অনেক চেষ্টা করছি খোঁজ করতে, যতদূর খবর পাচ্ছি, কেউ বেঁচে নাই। শেখ হাসিনা সাক্ষাৎকারে আরো বলেন, যখন শুনলাম, সত্যি কথা কি, এ কথা শোনার পর বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমার শরীরের সমস্ত রক্ত হিমশীতল হয়ে গেছিল, মনে হচ্ছে পড়ে যাব। হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী শেখ হাসিনাকে অনেক সান্ত্বনা দিলেন। হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর স্ত্রীও তখন তাঁদের জন্য অনেক করেছিলেন, তিনি তাঁদেরকে জার্মানির Karlsruhe শহরে গাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা করে দেন। যাওয়ার সময় ১০০০ জার্মান মুদ্রা তাঁদের হাতে তুলে দিলেন যাতে হাতে কিছু টাকা-পয়সা থাকে। শুধু তাই নয় গরম কাপড় ভরে একটা স্যুটকেসও দিলেন যেন ঠান্ডায় কাজে লাগে।

এসময় জার্মান সরকার তাঁদেরকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিতে চেয়েছিল, ভারতের প্রধানমন্ত্রী তাঁর রাষ্ট্রদূতকে আমাদের রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করতে বললেন। রাজনৈতিক আশ্রয় দিতে চেয়ে যুগোশ্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো তাঁর রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে যোগাযোগ করলেন। কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যখন ম্যাসেজ পাঠালেন যে ভারতে যাওয়ার তাঁদের সব ব্যবস্থা করা হয়েছে, তাঁরা ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ২৪ আগস্ট সকাল ৯টায় পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ভারতীয় দূতাবাসের এক কর্মকর্তা অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে তাঁদেরকে ফ্রাংকফুর্ট বিমানবন্দর নিয়ে যান। এরপর, একটি এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানে করে তাঁরা ২৫ আগস্ট সকাল সাড়ে ৮টায় দিল্লীর পালাম বিমানবন্দর পৌঁছান। শুরু হয় শেখ হাসিনার নির্বাসিত জীবন। ভারতে আসার পরে বোন আর স্বামী-সন্তানসহ শেখ হাসিনাকে দিল্লীর লাজপাত নগরের ৫৬ রিং রোডে একটি ছোট বাসায় থাকতে দেয়া হয়েছিলো সেফ হোম হিসেবে। ১০ দিন পর্যন্ত শেখ হাসিনার মনে ক্ষীণ আশা ছিলো, হয়তো মা আর রাসেলকে ওরা মারেনি। কিন্তু ৪ঠা সেপ্টেম্বর দিল্লীর সফদরজং রোডে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বাসবভনে রাত ৮টার দিকে পৌঁছানোর পর সব হিসেব এলোমেলো হয়ে যায়। সেখানে পৌঁছানোর মিনিট দশেক পরে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এসে হাসিনার পাশে বসেন। তাঁর এক কর্মকর্তাকে জানান, উপস্থিত সকলকে ১৫ই আগস্টের সম্পূর্ণ ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করতে। কর্মকর্তাটি পুরো ঘটনা বলবার মধ্যে বলে উঠলেন যে বেগম ফজিলাতুন্নেসা ও রাসেলও জীবিত নেই। হাসিনা আর সহ্য করতে পারেননি, কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি, শেষ আশাটুকুও নিভে যায় তাঁর। ভগ্ন হৃদয়ে ইন্দিরা গান্ধী তাকে জড়িয়ে ধরেন। এসময় ইন্দিরা গান্ধী ও ভালবাসা সম্পর্কে বলতে গিয়ে Hasina: A Daughter’s Tale চলচ্চিত্রে এক সাক্ষাৎকারে জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা যখন কথা বলছিলাম, আমার দিকে তাকিয়ে বললো, তুমি কিছু খেয়েছো? তুমি কি ওমলেট খাবে? টোস্ট খাবে? চা খাবে? তিনি উঠে গিয়ে কাউকে বললেন, সেই ওমলেট, সেই টোস্ট আর নিজে কাপে চা ঢেলে উনি দিলেন। তুমি কিছু খাও, তোমার মুখটা খুব শুকনা, তুমি কিছু খাওনি। শেখ হাসিনা আরো বলেন, আসলে এই স্নেহ ও ভালোবাসাটা এতো খোলাভাবে তিনি ব্যবহার করলেন, এটা ভোলা যায় না, এটা মনে লাগে। তিনি আরো বলেন, সত্যি কথা কি ঐ সময় সব হারাবার পর ওনার সামনে যেয়ে ঐটুকু অনুভূতি মনে হচ্ছিলো যে, না আমাদের জন্য কেউ আছে। শোকে মুহ্যমান দুই বোনের দিনগুলো দিল্লিতে ছোট একটা বাসার দুই রুমের মধ্যে কেটেছে অনেক কষ্ট আর যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে।

এ প্রসঙ্গে Hasina: A Daughter’s Tale’ চলচ্চিত্রে এক সাক্ষাৎকারে শেখ রেহানা বলেন, আল্লাহর এটা রহমত দুই বোনেকে পাগল বানিয়ে রাস্তায় ফেলেনি। আপা কান্না করে এক পাশে, আমি কান্না করি অন্য পাশের্। তিনি আরো বলেন, আর একটা কখনও বলিনি, এখন ৪০ বছর হয়ে গেছে এখন বলা যায়, আমাদের দিল্লি থাকাকালীন সময় আমাদের নামও পরিবর্তন করতে হয়েছিল, মি. তালুকদার, মিসেস তালুকদার, মিস তালুকদার, আশপাশে যেন কেউ না জানে। এটা কি ব্যাপার, দেশ ছাড়া, ঘর ছাড়া, মা-বাপ ছাড়া, নামও বদলাব, থাকব না এখানে, দরকার নেই। তখন উপায়ও তো নাই। দিল্লিতে জননেত্রী শেখ হাসিনা সারাক্ষণ এক উদ্বেগের মধ্যে থাকতেন, দেশে কি হচ্ছে, কি হবে।

এ প্রসঙ্গে Hasina: A Daughter’s Tale চলচ্চিত্রে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এই দেশটাকে স্বাধীন করেছিলেন আমার বাবা, দেশে গণতন্ত্র থাকবে, মানুষের কল্যাণ হবে, কিন্তু সেটা তো হলো না, উল্টো দেশে একটা খুনিদের রাজত্ব কায়েম হয়ে গেল। বিদেশের মাটিতে দুই বোন ক্ষণিকের জন্য ভুলেননি ১৫ই আগস্টের নির্মম ও নৃশংস হত্যার কথা।

এ প্রসঙ্গে Hasina: A Daughter’s Tale চলচ্চিত্রে এক সাক্ষাৎকারে শেখ রেহানা বলেন, আপা লেখতেন বসে বসে আজকে চিনি কতটুকু, বিস্কুট কতটুকু, সুজি কতটুকু, ওর পার্শ্বে আমার লেখা যে-আল্লাহ তুমি আমাদের কেন বাঁচিয়ে রেখেছ জানি না, কিন্তু ঐ খুনিদের ধরব, বিচার করব ইনশা আল্লাহ, তারিখ দিয়ে লেখা। ১৯৭৬ সালের ডিসেম্বর শেখ রেহানা দিল্লি থেকে লন্ডনে পাড়ি জমান।

'৭৭ এর জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে লন্ডনের কিলবার্নে শেখ রেহানার বিয়ে হয়, পাত্র লন্ডনপ্রবাসী শফিক সিদ্দিকের সঙ্গে। কিন্তু সে বিয়েতে শেখ হাসিনা তাঁর পরিবার নিয়ে অংশ নিতে পারেননি কেবল টিকেটের টাকার অভাবে। ২টি সন্তান নিয়ে টিকেট কেটে লন্ডনে যাওয়ার মতো টাকা তাঁর ছিল না।

এদিকে ১৯৮০ সালে, ভারতে শেখ হাসিনার বাড়িতে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা আসতে লাগলেন। আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক কাবুল যাওয়ার সময় এবং সেখান থেকে ফেরার সময় তাঁদের সঙ্গে দেখা করেন। আওয়ামী লীগ নেতা জিল্লুর রহমান, আব্দুস সামাদ আজাদ, তৎকালীন যুবলীগ নেতা আমির হোসেন আমু, আওয়ামী লীগের তৎকালীন যুগ্ম সম্পাদক সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী দিল্লিতে যান। তাদের সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নিতে রাজি করানো। তাঁরা তাঁকে ক্রমাগত বোঝাতে লাগলেন, তাঁর কেন দেশে ফেরা উচিৎ, এ মুহূর্তে এবং দলের ঐক্য বজায় রাখতে শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতির পদ গ্রহণের অনুরোধ জানান। শেখ হাসিনা বলতেন, আমি বঙ্গবন্ধুর মেয়ে, এটাই আমার জন্য সবচেয়ে বড় গৌরব। আমার আর কিছু চাওয়ার নেই। ১৯৮১ সালের ১৪-১৬ ফেব্রুয়ারি, ঢাকার ঐতিহাসিক ইডেন হোটেলে আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সে সম্মেলনে আওয়ামী লীগ তার রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্তটি নেয় যার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। দিল্লিতে থাকা অবস্থায় তিনি খবর পান, আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে তাঁকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়েছে। এর এক সপ্তাহ পরে আওয়ামী লীগের সেই সময়ের শীর্ষ নেতারা দিল্লি যান। আব্দুল মালেক উকিল, ড. কামাল হোসেন, জিল্লুর রহমান, আব্দুল মান্নান, আব্দুস সামাদ আজাদ, এম কোরবান আলী, বেগম জোহরা তাজউদ্দীন, স্বামী গোলাম আকবার চৌধুরীসহ বেগম সাজেদা চৌধুরী, আমির হোসেন আমু, বেগম আইভি রহমান, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ ১৯৮১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে দিল্লি পৌঁছান। শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কয়েকটি বৈঠকও করেন তাঁরা। এরপর ড. কামাল হোসেন ও সাজেদা চৌধুরী ছাড়া সবাই ঢাকায় ফিরে যান। কামাল হেসেন ও সাজেদা চৌধুরীর ওপর দায়িত্ব ছিল তাঁরা শেখ হাসিনার ঢাকা ফেরার তারিখ চূড়ান্ত করবেন।

দিল্লিতে থাকাকালীন নাজিমউদ্দিন আউলিয়ার দরবারে যাওয়ার একটি ঘটনাও শেখ হাসিনার মনে দাগ কাটে যা তাঁকে দেশে ফিরতে সাহস যোগায়। এ প্রসঙ্গে Hasina: A Daughter’s Tale চলচ্চিত্রে তথ্য পাওয়া যায়। শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দুই বোন নাজিমউদ্দিন আউলিয়ার দরগায় যান, তাঁরা তাঁদের নামসহ কোন পরিচয়ও দেননি, একসময় খাদেম এসে একটা খাতা তাঁদের সামনে ধরলেন সেখানে দুই বোন দেখলেন তাঁদের পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৬ সালের ৯ই এপ্রিল এই দরগায় এসছিলেন, তাঁরা যেদিন গেলেন সেই তারিখটাও ছিল ১৯৮১ সালের ৯ই এপ্রিল। এ পসঙ্গে উক্ত চলচিত্রে এক সাক্ষাৎকারে জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সত্যি কথা বলতে কি একটা সাহস আমার মনে আসলো, আমাকে যেতে হবে, বাংলাদেশের জন্য কিছু করতে হবে। এই বার্তাটাই মনে হয় পাচ্ছি।

অবশেষে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, ১৭ই মে, ১৯৮১। দিনটি ছিলো রবিবার, ঝড়-বৃষ্টির এক দিন। আওয়ামী লীগের দুই নেতা আব্দুস সামাদ আজাদ আর কোরবান আলীকে সঙ্গে নিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনা রওনা দেন ঢাকায়। সেদিন বিকেল সাড়ে ৪টায় ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের বোয়িং বিমানে তিনি ভারতের রাজধানী দিল্লি থেকে কলকাতা হয়ে তৎকালীন ঢাকার তেজগাঁওস্থ কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে এসে পৌঁছেন। সেদিন সকল বাধা ও প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে লাখ লাখ জনতা ঢাকা বিমানবন্দরে তাঁকে অভিনন্দন জানাতে ছুটে আসে। সেদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কন্যা শেখ হাসিনাকে একনজর দেখার জন্য ঢাকায় মানুষের ঢল নেমেছিলো। কুর্মিটোলা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও শেরেবাংলা নগর পরিণত হয়েছিলো জনসমুদ্রে। ফার্মগেট থেকে কুর্মিটোলা বিমানবন্দর পর্যন্ত ট্রাফিক বন্ধ ছিল প্রায় ছ’ঘণ্টা। ঢাকা বিমানবন্দরে তিনি বিমান থেকে নামার পর আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা শ্লোগান দেয় ‘হাসিনা তোমার ভয় নাই, আমরা আছি লাখো ভাই’। দেশের মাটিতে নেমে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন শেখ হাসিনা। দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে তিনি বলেন, ‘যেদিন আমি বাংলাদেশ ছেড়ে যাচ্ছিলাম, সেদিন আমার সবাই ছিলো। আমার মা-বাবা, আমার ভাইয়েরা, ছোট্ট রাসেল সবাই বিদায় জানাতে এয়ারপোর্টে এসেছিলো। আজকে আমি যখন ফিরে এসেছি, হাজার হাজার মানুষ আমাকে দেখতে এসেছেন, স্বাগত জানাতে এসেছেন, কিন্তু আমার সেই মানুষগুলো আর নেই। তারা চিরতরে চলে গেছেন।’

তিনি আবেগরুদ্ধ হয়ে বলেন, ‘বাংলার মানুষের পাশে থেকে মুক্তি সংগ্রামে অংশ নেওয়ার জন্য আমি দেশে এসেছি। আওয়ামী লীগের নেত্রী হওয়ার জন্য আসিনি। আপনাদের বোন হিসেবে, মেয়ে হিসেবে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে আমি আপনাদের পাশে থাকতে চাই।’ বিমানবন্দর থেকে শেখ হাসিনাকে নিয়ে যাওয়া হয় মানিক মিয়া এভিনিউয়ে, সেখানে লাখো জনতার উপস্থিতিতে এক সমাবেশে শেখ হাসিনা বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘সব হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে এসেছি। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জাতির জনকের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে আমি জীবন উৎসর্গ করতে চাই।’

এভাবেই ১৯৮১ সালের ১৭ই মে ছয় বছর নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে স্বদেশে ফিরে আসেন বাংলাদেশের প্রাণপ্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনা।

নেতাজী সুভাষ বসু বলেছিলেন, ‘বিপ্লবের পথ একেবারে ঋজুপথ নয়। এ পথে নিরবচ্ছিন্ন সাফল্য আসে না, এ পথ বহু বিঘ্নসংকুল, সুদীর্ঘ এবং সর্পিল’।

শেখ হাসিনা নিজেও এ কথা জানতেন। যে কারণে ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের জন্য নয়াদিল্লি থেকে ঢাকা রওনা হওয়ার কয়েকদিন আগে মার্কিন সাপ্তাহিক নিউজউইক পত্রিকার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তাঁর স্বদেশে প্রত্যাবর্তন সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা এক হৃদয়গ্রাহী ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। ১১ মে নিউজউইক-এ বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বক্স-আইটেম হিসেবে প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়, ১৯৭৫ সালে সামরিক চক্র কর্তৃক ক্ষমতা দখলকালে নিহত পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য শেখ হাসিনা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি নিহত হওয়ার আশঙ্কায় শঙ্কিত নন; এমন কী যে সরকারের মোকাবিলা করবেন তার শক্তিকে তিনি বাধা বলে গণ্য করবেন না।

তিনি বলেন, ‘জীবনে ঝুঁকি নিতেই হয়। মৃত্যুকে ভয় করলে জীবন মহত্ব থেকে বঞ্চিত হয়।’

দেশে ফেরার দিন থেকেই শেখ হাসিনা উপলব্ধি করেন কত বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিতে হবে, সামরিক জান্তাদের কত নির্মম নির্যাতনের শিকার হতে হবে। ঢাকা বিমানবন্দর থেকে শেখ হাসিনা সরাসরি গিয়েছিলেন তাঁদের বাড়ি ৩২ নম্বর ধানমন্ডি যেখানে ১৫ই আগস্ট ঘাতকের নির্মম বুলেটে ৬ বছর আগে বাবা-মাসহ পরিবারের সবগুলো আপনজনকে হারিয়েছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কুশীলব ও এই বাংলার মাটিতে রাজাকার-যুদ্ধাপরাধীদের পূনর্বাসনকারী প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান তাঁকে সে বাড়িতে ঢুকতে বাধা দেয়। আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয় যাতে শেখ হাসিনা সেই বাড়িতে ঢুকতে না পারেন। স্বজনহারা আমাদের এই প্রিয় নেত্রী সেদিন ৩২ নম্বরের সামনের রাস্তাতে বসেই বুকফাটা আর্তনাদে সবার জন্য দোয়া করেছিলেন, আত্মার মাগফেরাত কামনা করেছিলেন। দেশে ফেরার পর তাঁকে কঠিন এক সংগ্রামে লিপ্ত হতে হয়, পদে পদে হত্যার আশংকা। সামরিক জান্তা এরশাদ বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে ৮০ ’র দশকে তাঁকে বিভিন্ন সময় গ্রেফতার এমনকি গৃহবন্দী হতে হয়, বারবার তাঁর ওপর হামলা চালানো হয়, হামলা চালানো হয় জনসমাবেশে। এরশাদ বিরোধী আন্দোলন চলাকালীন সামরিক জান্তা এরশাদের রোষানলে ১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারি ও নভেম্বর মাসে তাঁকে গৃহবন্দী হতে হয়। ১৯৮৫ সালের মার্চ মাসে তিনি আবারও তিন মাসের মতো গৃহবন্দী ছিলেন। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি, চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে মিছিল করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বধীন আটদলীয় জোটের জনসভাস্থল লালদিঘির ময়দানে যাওয়ার পথে শেখ হাসিনার ট্রাক মিছিলে নির্বিচার গুলি ছুড়েছিলো এরশাদ সরকারের পুলিশ ও সাদা পোষাকধারীরা। তখন পুলিশের নির্বিচারে গুলিতে ২৪ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে ৯ জন শেখ হাসিনাকে মানববর্ম তৈরি করে রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হন। ৯০ ’র গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতনের পরও পরবর্তীতে শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য বারবার তাঁর উপর হামলা চালানো হয়, এমন কি নারকীয় গ্রেনেড হামলা চালানো হয় জনসমাবেশে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বাংলার কোটি কোটি মানুষের নয়নের মণি আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের হত্যার জন্য বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ-এ আওয়ামী লীগের জনসভায় চালানো হয় স্মরণাতীত কালের ভয়াবহ নারকীয় গ্রেনেড হামলা। সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গেলেও আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা আইভি রহমান ও শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষী মাহবুবসহ আওয়ামী লীগের ২৪ নেতাকর্মী বোমার আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে নিহত হয়েছেন। সেদিনও আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মী শরীরে আজও স্প্রিন্টার আর বুলেটের গর্ত নিয়েও তৈরি করেছিল মানব দেয়াল, মৃত্যু দিয়ে প্রিয় নেত্রীর নিশ্চিত মৃত্যুকে ফিরিয়েছেন তাঁরা। ১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পর ক্ষমতা নয়, দেশের মানুষের অধিকার আদায়, বঙ্গবন্ধু হত্যা ও জেল হত্যার বিচার এবং যুদ্ধাপরাধীদেরবিচার নিয়ে সোচ্চার ছিলেন শেখ হাসিনা। এসব কঠিন কাজ সম্পন্ন করতে এ পর্যন্ত তিনি শত্রুপক্ষের কমপক্ষে ২০ বার হত্যা চেষ্টার সম্মুখীন হন।

শেখ হাসিনাও তাঁর বাবার মতো দেশের মানুষের প্রতি টান, তাদের প্রতি একপ্রকার দায়বদ্ধতার টান থেকে কখনোই বের হতে পারেননি। আর তাই সেই রক্তের ডাকে সাড়া দিয়ে মত্যুভয় উপেক্ষা করে তিনি ফিরেছিলেন ১৯৮১ সালের ১৭ই মে স্বদেশের মাটিতে।

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিনটি আমাদের জাতীয় জীবনের জন্যে বিশাল গুরুত্ব বহন করে। কারণ শেখ হাসিনা ফিরে এসেছেন বলেই এদেশে সামরিক জান্তার পতন হয়েছে, গণতন্ত্র ফিরে এসেছে। শেখ হাসিনা দেশে ফিরে শক্ত হাতে দলের হাল ও গণতন্ত্রের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরে সহস্র বাধা অতিক্রম করে জনগণের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে দেশে ফেরার ১৫ বছরের মাথায় ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রক্ষমতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হন। এর ফলে অন্ধকার থেকে বাংলাদেশ আবার ফিরে আসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকিত ধারায়। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে তিনি সুশাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতের পাশাপাশি কুখ্যাত ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) আইন বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার বিচার শুরু করেন এবং তাঁর শাসনামলেই ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর ঢাকা জেলা ও দায়রা জজের আদালত কর্তৃক ঘোষিত বিচারের রায়ে প্রকাশ্য ফায়ারিং স্কোয়াডে ১৫ জন ঘাতকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার বিপুলভোটে জয় লাভ করে ক্ষমতায় আসলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা ৭১ ’র যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নেন। শুধু তাই নয়, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয় বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার দীর্ঘ ৩৪ বছরের পথপরিক্রমা এবং ২০১০ সালের ২৮ শে জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলায় মৃত্যুদ-প্রাপ্ত পাঁচ আটককৃত খুনির ফাঁসির রায় কার্যকর করার মধ্য দিয়ে কিছুটা হলেও জাতি কলঙ্কমুক্ত হয়।

পলাতক ৭ দণ্ড প্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে অন্যতম ক্যাপ্টেন (বরখাস্তকৃত) আব্দুল মাজেদকে গত ১২ এপ্রিল ২০২০ দিবাগত রাতে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যদ-কার্যকর করা হয়। জননেত্রী শেখহাসিনার শাসনামলেই ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ঐতিহাসিক জেলহত্যা মামলায় রায় প্রদান করেন, এরই মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৩৮ বছর পর জাতি পায় জেলহত্যার বিচার। ২০০৯ সাল থেকে একটানা জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন, তাঁর শাসনামলেই ৭১-এ সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপাধে অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীর বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলছে এবং ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে ঘোষিত ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে।

দেশে প্রত্যাবর্তনের পর থেকে এই ৪৩ বছরে প্রতিনিয়ত মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে শেখ হাসিনা আজ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ঐক্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। তাঁর আলোকিত নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ বিশ্ব দরবারে এক আলোকিত অভিযাত্রায় শামিল হয়েছেন, বিশ্ব নেতৃত্বে আজ তিনি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে নিয়েছেন। ১৯৮১ সালের ১৭ মে রাজনীতিবিদ হিসাবে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন আবারো দেশে স্বাধীনতার মূল্যবোধ ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে, তাঁর সাহসী নেতৃত্বে যথার্থই জেগে উঠে বাংলাদেশ। শুধু তাই নয় শেখ হাসিনার সৃজনশীল ও দৃঢ় নেতৃত্বের কারণে বাংলাদেশ আজ বিশ্ব দরবারে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে, তিনি আজ দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে আপন আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছেন। ১৭ই মে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন যেন এক আলোর অভিযাত্রার আখ্যান। জননেত্রী শেখ হাসিনার ৪৩ তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে তাঁকে জানাই বাঙালির হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে সশ্রদ্ধ অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক ভোরের পাতা, দ্য পিপলস টাইম

সহ-সভাপতি, সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগ

সদস্য, কেন্দ্রীয় শিল্প-বাণিজ্য উপকমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

পরিচালক, এফবিসিসিআই

চেয়ারপারসন, ভোরের পাতা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ।