নকশা পাল্টে দিলেন প্রকল্প পরিচালক

সাধারণত কোনো প্রকল্পের নকশা পরিবর্তন করতে হলে সেটি জানাতে হয় পরিকল্পনা কমিশনকে। কিন্তু বিতর্কিত সিরাজগঞ্জের ‘শহীদ এম. মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ এবং ৫০০ শয্যার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল’ শীর্ষক প্রকল্পটিতে কাউকে না জানিয়েই নকশা পরিবর্তন করে দিলেন প্রকল্প পরিচালক (পিডি)।

সম্প্রতি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, হাসপাতাল ও মেডিকলে কলেজ ভবনের মধ্যে নকশা অনুযায়ী একটি লিংক করিডর স্থাপনের সংস্থান ছিল। কিন্তু প্রকল্পটির প্রকল্প পরিচালক তার দপ্তর থেকে চিঠি দিয়ে গণপূর্ত বিভাগকে লিংক করিডর না করার নির্দেশনা দেন। তবে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) এবং নকশায় উল্লিখিত স্থাপনার একটি অংশ নির্মাণ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ও গণপূর্তের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে আইএমইডি।

নকশা পরিবর্তনের ব্যাখ্যায় প্রকল্প পরিচালক ডা. কৃষ্ণ কুমার পাল বলেন, অ্যাকাডেমিক ভবন ও হাসপাতাল ভবনের দূরত্ব কম হওয়ায় এবং প্রকল্পের অন্য ভবনগুলো ও প্রকল্প এলাকার সৌন্দর্য মøান হওয়ার আশঙ্কায় নির্বাহী প্রকৌশলী, সিরাজগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগ, হাসপাতালের পরিচালক এবং অধ্যক্ষের সঙ্গে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে সাময়িকভাবে লিংক করিডর স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।

গত ৯ এপ্রিল প্রকল্পটির প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভা (পিআইসি) হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। এতে প্রকল্পটির নানা অসংগতির বিষয়ে আলোচনা হয়। হাসপাতালটি নির্মাণে অনুমোদিত ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৬৩৬ কোটি টাকার বেশি। ২০১৫ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৯ সালে। ধাপে ধাপে মেয়াদ বাড়ানো হলেও প্রকল্পটির কাজ যেন শেষই হতে চাইছিল না। সর্বশেষ ২০২২ সালের জুনে প্রকল্পটি সমাপ্তযোগ্য তালিকায় রাখা হয়েছিল। কিন্তু এরপরও শেষ হয়নি। এরপর গত ফেব্রুয়ারি মাসে পরিকল্পনা কমিশন বাধ্য হয়ে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়িয়েছে।

প্রকল্পটির আলোচনায় প্রকল্প পরিচালক সভাকে জানান, প্রকল্পটি ২০২২ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। প্রকল্পের বিল পরিশোধ নিয়ে অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ায় প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে শেষ করা যায়নি।

উদ্ধার হয়নি ভুয়া বিলে লুট হওয়া ২৫ কোটি টাকা : সভায় প্রকল্প পরিচালক জানান, প্রকল্পটির কাজ ২০২২ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও একজন ঠিকাদারের ৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। অপ্রত্যাশিত সমস্যা দেখা দেওয়ায় ২০২১-২২ অর্থবছরের আরএডিপি থেকে অর্থ পরিশোধ করা যায়নি। কারণ হিসেবে দেখা যায়, মূল কোড- ৪১১১২০১ (অনাবাসিক ভবন) কোডের টাকা ভুয়া কোড-৪১১১১০১-৩৯৯ (বিল্ডিং অ্যান্ড স্টাকচারস) নামের কোডে স্থানান্তর করা হয়। পরপর চারটি বিলের মাধ্যমে ২৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকা এ কোডে পাঠানো হয়। ভুয়া ওই প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, এম জাহান ট্রেডার্স, ৩৫৪ বড় মগবাজার, দিলু রোড, রমনা, ঢাকা। চারটি ভুয়া ও জাল কার্যাদেশ, জাল স্বাক্ষরসহ ভুয়া সার্ভে রিপোর্ট ব্যবহার করে এ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

সভায় এ প্রসঙ্গটি আসার পর প্রকল্প পরিচালক জানান, এ বিষয়ে একটি জিডি করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনকেও জানানো হয়েছে।

সভার সভাপতি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব জাহাঙ্গীর হোসেন আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধারে উদ্যোগ গ্রহণের জন্য প্রকল্প পরিচালক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে অনুরোধ জানান।

কেনা হয়নি হাসপাতালের আসবাবপত্র : সভায় প্রকল্প পরিচালক জানান, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কার্যক্রম চালু করার জন্য আসবাবপত্র ও যন্ত্রপাতি কেনা প্রয়োজন। সভায় সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়, নির্ধারিত সময়ে কেনা সম্ভব না হলে রাজস্ব খাত থেকে অর্থ নিয়ে আসবাবপত্র কিনতে হবে।

এ প্রতিষ্ঠানের মেডিকেল সামগ্রী কোনাকাটায় দুর্নীতির অভিযোগে হাসপাতালটির প্রকল্প পরিচালক ডা. কৃষ্ণ কুমার পালসহ দুজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। ৩০ কোটি ৩ লাখ টাকার আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে মামলায়।

দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মাদ শাহজাহান সিরাজ কমিশনের পাবনা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে মামলাটি করেন। প্রকল্প পরিচালক ছাড়া অন্য আসামি হলেন- ঢাকার তোপখানা রোডের মেসার্স বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিকেলের মালিক জাহের উদ্দিন সরকার।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রকল্প পরিচালক ও ভেন্ডার উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতির পরিবর্তে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কোনো মেডিকেল যন্ত্রপাতি বুঝিয়ে না দিয়ে ও না পাওয়ার পরও কেবল জাহাজীকরণ দলিলে এক্সেপটেন্স দিয়ে ৩০ কোটি তিন লাখ ৫৪ হাজার ৯০০ টাকা ডলার এবং ইউরো আকারে হংকংয়ের একটি ব্যাংকের অনুকূলে পরিশোধ করেছেন।