কালো টাকা বিনিয়োগ ও নিবন্ধন ব্যয় কমাতে হবে

প্রতি বছর দেশ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ পাচার হচ্ছে। পাচার করা অর্থের বেশিরভাগ দিয়ে বিদেশে জমি, বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনা হয়। দেশের অর্থ দেশে রাখতে অর্থাৎ পাচার কমাতে আগামী অর্থবছরে বিনা প্রশ্নে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুবিধা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন আবাসন খাতের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি শামসুল আলামিন।

দেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে আগামী অর্থবছরে কেমন বাজেট প্রয়োজন এমন প্রশ্নের উত্তরে দেশ রূপান্তরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শামসুল আলামিন এসব কথা বলেন। ব্যবসায়ী এ নেতা বলেন, রাজস্ব আইনে স্থায়ীধারা যুক্ত করে নিয়মিত রাজস্বের বাইরে অতিরিক্ত কর দিয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া আছে। ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে এ সুযোগের বাইরে অপ্রদর্শিত অর্থ মূলধারার অর্থনীতিতে আনতে বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ এ সুযোগ নিয়ে ১০ শতাংশ কর দিয়ে পুঁজিবাজার বা আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করলেও সরকারের কোনো সংস্থাই প্রশ্ন তুলতে পারবে না বলে ওই সময় জানানো হয়। পরের বছর এ সুযোগ আর বাড়ানো হয়নি। আগামী অর্থবছরে এ জাতীয় সুযোগ রাখা প্রয়োজন। বিশেষভাবে আবাসন খাতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৫ থেকে ১০ বছরের জন্য অপ্রদর্শিত অর্থ বিনা প্রশ্নে ফ্ল্যাট, প্লট, বাণিজ্যিক ভবন ও বিপণিবিতানে বিনিয়োগের সুবিধা বহাল রাখা প্রয়োজন।

রিহ্যাব সভাপতি বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন দেশে ‘সেকেন্ড হোম’ গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। অনেকে এ খাতে বিনিয়োগ করতে বিদেশে অর্থ পাচার করে দিচ্ছে। অনেক দেশেই ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট কেনার অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন করা হয় না। অপ্রদর্শিত অর্থ দেশে বিনিয়োগের সহজ সুযোগ করে দেওয়া হলে ভবিষ্যতে ওইসব বিনিয়োগকারী রাজস্ব জালের আওতায় আসবে। সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে। অর্থ পাচারে উৎসাহ কমবে।

সভাপতি বলেন, অন্যান্য সার্কভুক্ত দেশের তুলনায় বাংলাদেশের নিবন্ধন ব্যয় তুলনামূলক বেশি এবং সার্কভুক্ত অন্যান্য দেশের নিবন্ধন ব্যয় গড়ে ৪ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে। বর্তমানে ব্যয় বেশি হওয়ায় ফ্ল্যাট বা প্লটের ক্রেতারা নিবন্ধনে উৎসাহিত হচ্ছেন না। নিবন্ধন ব্যয় ৭ শতাংশ নির্ধারণ এখন সময়ের দাবি।

ব্যবসায়ী এ নেতা বলেন, করোনার সময় আবাসন খাতে ধস নামে। করোনা শেষ না হতে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ডলার সংকট চলছে। আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনমতো এলসি খুলতে পারছে না। এতে আবাসন খাতের অনেক কাঁচামালের সংকট দেখা দিয়েছে, যা জোগাড় করা হচ্ছে তার অধিকাংশ বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এতে আবাসন খাতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। আবাসন খাতের অনেক ব্যবসায়ী এরই মধ্যে বাধ্য হয়েই ব্যাংকঋণ নিয়েছে। বর্তমানে তাদের পক্ষে ব্যাংকঋণ ও সুদ পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ বিষয়ে সরকারকে বাজেটে নজর দিতে হবে।

নির্মাণ ও অন্যান্য ব্যয় কমাতে বিদ্যমান মূসক হারে ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব জানিয়ে রিহ্যাব সভাপতি বলেন, এ জাতীয় ব্যয় কমানো হলে স্বল্পমূল্যে ক্রেতাকে তাদের সামর্থ্যরে মধ্যে আবাসন সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এতে এই শিল্পে স্থবিরতা থেকে মুক্তি পাবে।

গৃহায়নশিল্পের উদ্যোক্তাদের আয়কর হ্রাস করার দাবি জানিয়ে ব্যবসা খাতের এ নেতা বলেন, গৃহায়নশিল্পের বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা এই খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আয়করের উচ্চহারের কারণে ক্রেতারা আগ্রহ হারাচ্ছেন। এ বিষয়গুলোও আগামী বাজেটে সরকারের বিবেচনা করা প্রয়োজন।

শামসুল আলামিন বলেন, বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনকে তহবিল প্রদানের মাধ্যমে স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সরবরাহ করা হলে আবাসন খাতের ঋণপ্রবাহ বাড়বে। আবাসন খাতকে আরও গতিশীল এবং সত্যিকার অর্থে স্বল্প আয়ের মানুষের মাথা গোঁজার স্বপ্নকে সার্থক করতে ক্রেতাদের জন্য অন্তত একটি ফ্ল্যাট কিনতে সহজ শর্তে দীর্ঘ মেয়াদে ঋণের টাকা কিস্তির মাধ্যমে পরিশোধের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। রাজউক ও সিডিএর আওতাভুক্ত ও বহির্ভূত এলাকায় সব জমির ক্ষেত্রে আরোপিত কর প্রত্যাহার করা এবং সরবরাহ পর্যায়ে মূসক ও উৎস কর সংগ্রহের দায়িত্ব থেকে পাঁচ বছরের জন্য আবাসন ব্যবসায়ীদের অব্যাহতি দেওয়া প্রয়োজন।

ঢাকা জেলাসহ বিভিন্ন মেট্রোপলিটন এলাকা, ক্যান্টনমেন্ট এলাকার মধ্যে পাঁচ বছরের জন্য এবং পৌরসভার বাইরের এলাকায় নগরায়ণকে উৎসাহিত করতে ১০ বছরের জন্য ‘ট্যাক্স হলিডে’ ব্যবস্থা প্রবর্তন করার প্রস্তাব করে ব্যবসায়ী এ নেতা নামমাত্র নিবন্ধনব্যয় নির্ধারণ করে আবাসন খাতে ‘সেকেন্ডারি বাজার’ ব্যবস্থার প্রচলন করাসহ উন্নত দেশের মতো ‘রিয়েল এস্টেট মার্কেট’ ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি করেন।