ষাটের আইকন আজ আশিতে

গত শতকের ষাটের দশকে বাংলাদেশের রাজনীতির আইকনিক দুই চরিত্র মেনন-মতিয়া। সেই রাশেদ খান মেনন আজ ৮০-তে পা দিলেন। অনেকের কাছে তিনি বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির প্রথম আইকন। ষাটের দশকের ছাত্রনেতা ১৯৬৩-৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি ও ’৬৪-৬৭ সালে সাবেক পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের আজ জন্মদিন।

পেছনে ফিরে তাকালে আমরা দেখব একসময়ের এই আইকনিক চরিত্র সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছেন। এই বদলের মধ্যে ত্যাগ আছে, রাজনীতির হিসাব-নিকাশ আছে, আছে স্বার্থ, বিতর্ক, অবস্থানগত সুবিধাসহ সার্ভাইভের মতো নানা কিছু। মানুষ তো বেঁচে থাকলে বদলায়... সময়ে-অসময়ে বদলায়। সমাজতান্ত্রিক আদর্শের রাজনীতির মধ্য দিয়ে মেনন হয়ে উঠেছেন, যা তাকে ছাত্ররাজনীতির শীর্ষে নিয়ে যায়। পরে দেশের বহুধা-বিভক্ত বাম রাজনীতি তো বটেই, মূলধারার রাজনীতিতেও তিনি এক কুশলী চরিত্র হয়ে ওঠেন। তবে প্রশ্ন রয়েছে, তার বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান সমাজতান্ত্রিক আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না। এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বহুবার বলেছেন তা সাংঘর্ষিক নয়। ১৯৪৩ সালের ১৮ মে বাবার কর্মস্থল ফরিদপুরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃক নিবাস বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার বাহেরচর ক্ষুদ্রকাঠি গ্রামে। শৈশব কেটেছে বিভিন্ন জেলা শহরে। ষাটের দশকের শিক্ষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মেনন ছাত্ররাজনীতির সামনের সারিতে চলে আসেন। তিনি ৬২ সালে নিরাপত্তা আইনে প্রথম কারাবন্দি হওয়ার পর ৬৯ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময় ও বিভিন্ন মেয়াদে নিরাপত্তা আইন, দেশরক্ষা আইন ও বিভিন্ন মামলায় কারাবরণ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছে। এমএ পাস করেছেন জেলখানা থেকে পরীক্ষা দিয়ে।

ছাত্রজীবন শেষে কৃষক আন্দোলনের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের প্রাক্কালে গঠন করেন ‘কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি’। ’৬৭-৬৯ সালে জেলে থাকাকালে মেনন বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে আসেন।

১৯৭০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানের জনসভায় ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা’ কায়েমের দাবি করায় ইয়াহিয়ার সামরিক সরকার তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। তার অনুপস্থিতিতে সামরিক আদালতে মেননের সাত বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও সম্পত্তির ৬০ ভাগ বাজেয়াপ্তের দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। তখন তিনি আত্মগোপনে থেকে স্বাধীনতার জন্য কৃষকদের সংগঠিত করেন। বিভক্ত বামপন্থিদের ঐক্যবদ্ধ করে ‘জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম সমন্বয় কমিটি’ গঠন করে মুক্তিযুদ্ধে সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণকে কার্যকর করতে তিনি সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ার কাজ শুরু করেন। ২৫ মার্চ পল্টনের শেষ জনসভায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও পাকিস্তানের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। ২৫ মার্চের কালরাতে গণহত্যার পর তিনি ঢাকার অদূরে নরসিংদীর শিবপুরকে কেন্দ্র করে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের কাজ শুরু করেন।

১৯৮২ সালে জেনারেল এরশাদ সামরিক শাসন জারি করলে রাশেদ খান মেনন সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে অন্যতম ভূমিকা পালন করেন। ১৫ ও ৭ দলের যুগপৎ আন্দোলন পরিচালনায় ভূমিকার জন্য সামরিক শাসনামলে বিভিন্ন সময় তাকে আত্মগোপনে যেতে হয়েছে।

সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে ঐক্য পুনঃস্থাপনে রাশেদ খান মেনন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ৫ দল, ৭ দল ও ৮ দলের ঐতিহাসিক ৩ জোটের ঘোষণার ভিত্তিতে ৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরশাহির পতন হয়। এতেও রাশেদ খান মেনন অন্যতম ভূমিকা রাখেন।

১৯৯২ সালের ১৭ আগস্ট নিজ পার্টি কার্যালয়ের সামনে তাকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা হয়। প্রথমে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল ও পরে লন্ডনে কিংস কলেজে দুবার অস্ত্রোপচার হলে তিনি মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন।

রাশেদ খান মেনন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার জাতীয় সংগ্রামেও বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত ৪-দলীয় জোট সরকার সরকার গঠন করে দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক তাণ্ডব শুরু করলে রাশেদ খান মেনন তার বিরুদ্ধে অন্যদের নিয়ে প্রতিরোধ সংগঠিত করেন।

রাশেদ খান মেনন ৭৯ সালে বরিশালে বাবুগঞ্জ ও গৌরনদী থেকে এবং ১৯৯১ সালে বাবুগঞ্জ উজিরপুর থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

২০০৮ সালে ডিসেম্বরে নির্বাচনে তিনি ১৪ দলের প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-৮ নির্বাচনী এলাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই সময় তিনি সংসদে কার্য উপদেষ্টা কমিটির সদস্য, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। এ ছাড়া সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিরও সদস্য নির্বাচিত হন।

২০১২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর মহাজোট সরকারের পক্ষ থেকে রাশেদ খান মেননকে মন্ত্রিত্বের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি দলীয় সিদ্ধান্তে তা গ্রহণ করেননি। ২০১৩ সালের ১৮ নভেম্বর রাশেদ খান মেনন সর্বদলীয় সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী নিযুক্ত হন।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি পার্লামেন্ট নির্বাচনে তিনি ঢাকা-৮ আসন থেকে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং মহাজোট সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি।

রাশেদ খান মেনন বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। বাবা বিচারপতি আবদুল জব্বার খান ছিলেন জজ। পারিবারিক ঐতিহ্যের অধিকারী রাশেদ খান মেননের ভাই-বোনরা হলেন মরহুম সাদেক খান, কিংবদন্তি কবি মরহুম আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ খান, প্রখ্যাত সাংবাদিক মরহুম এনায়েতুল্লাহ খান, বোন সেলিমা রহমান ও মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক শহিদুল্লাহ খান বাদল।

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ছাড়াও গবেষণা, প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা, বিশেষ করে জাতীয় দৈনিকগুলোতে তার নিয়মিত কলাম লেখেন। তার বইয়ের সংখ্যা ৯।

জটিল-কুটিল রাজনীতির পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্যে সদর্থেই দারুণ অভিযোজন ক্ষমতার অধিকারী জননেতা রাশেদ খান মেনন বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ।  বাংলাদেশের বাম রাজনীতির অন্যতম এই পুরোধা ব্যক্তিত্বকে জন্মদিনে শুভেচ্ছা।