আগামী অর্থবছরের বাজেটে সহজ ও ব্যবসাবান্ধব পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি মো. সামীর সাত্তার। একই সঙ্গে আয়কর ও মূল্য সংযোজন করের (মূসক) আওতা বৃদ্ধিতে, স্বচ্ছভাবে রাজস্ব আদায় করতে সম্পূর্ণ অটোমেশনের ব্যবহার নিশ্চিত করতে এবং স্থানীয় শিল্প উৎসাহিত করতে পদক্ষেপ নিতে বলেছেন। তিনি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতেও আগামী বাজেটে উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করেছেন।
আগামী অর্থবছরে কেমন বাজেট প্রয়োজন এমন প্রশ্নের উত্তরে ব্যবসা খাতের এ শীর্ষ নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনার মতো বড় ধরনের মহামারী শেষ না হতেই শুরু হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এরই মধ্যে ডলার সংকট দেখা দিয়েছে। এলসি খোলায় কড়াকড়ি করা হয়েছে। এসব কারণে ব্যবসার স্বাভাবিক ধারা ব্যাহত হচ্ছে। তাই আগামী অর্থবছরের বাজেটে কোনোভাবেই রাজস্বের ভার বাড়ানো যাবে না। ক্ষেত্রবিশেষে কমাতে হবে। ব্যবসা করতে পারলেই ব্যবসায়ীরা রাজস্ব পরিশোধে সক্ষম হবে। রাজস্বের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে ব্যবসায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা ঠিক হবে না।
সামীর সাত্তার বলেন, কর আদায়ে বা কর পরিশোধ সংক্রান্ত তদন্তে অসহযোগিতা করলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীর কাছ থেকে জরিমানা আদায় করে থাকেন। চলমান অর্থনৈতিক সংকটে ছোট-বড় প্রায় সব ধরনের ব্যবসায়ীর পক্ষে টিকে থাকাই কঠিন। সেখানে বড় অঙ্কের জরিমানা পরিশোধ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পুঁজি ভেঙে বা ধার করে বেশিরভাগ সময় জরিমানা পরিশোধ করতে হয়। আগামী বাজেটে কর সংগ্রহে বাধাপ্রাপ্ত হলে জরিমানার সর্বোচ্চ সীমা ব্যবসার ধরন এবং ব্যবসায়ীর সামর্থ্য অনুযায়ী নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন ডিসিসিআই সভাপতি। কোম্পানির ক্ষেত্রে অর্জিত ব্যাংক সুদ আয়ের ওপর উৎসে কর কমানোর পরামর্শ দিয়ে সামীর সাত্তার বলেছেন, এ হার ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ ধার্য করা এখন সময়ের দাবি। না হলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ব্যাংকে সঞ্চয় করতে নিরুৎসাহিত হবে। বিদ্যমান ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট দূর করতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সঞ্চয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রতিবেশী অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে করপোরেট কর হার বেশি এমন মত জানিয়ে সভাপতি বলেন, এতে ব্যবসার খরচ বাড়ছে। বৈশি^ক মন্দার মধ্যে চাপে থাকা ব্যবসায়ীদের এ খরচ কমানো হলে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। আগামী অর্থবছরে তালিকা বহির্ভূত কোম্পানির করপোরেট কর হার গড়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমানো প্রয়োজন।
মানুষের ভোগান্তি কমাতে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আগামী বাজেটে পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ জানিয়ে সামীর সাত্তার বলেন, গত এক বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েকগুণ বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি গড়ে ৮ থেকে ৯ শতাংশের ঘরে। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সংগতি রেখে করমুক্ত আয়ের সীমা তিন লাখ টাকা থেকে আরও দুই লাখ টাকা বাড়িয়ে পাঁচ লাখ টাকা করা উচিত।
আগামী ১০ বছরে করদাতার সংখ্যা ২ কোটিতে উন্নীত করতে কৌশল গ্রহণের সুপারিশ জানিয়ে ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, বর্তমানে ৩০ লাখ টিআইএনধারী আয়কর রিটার্ন দেন। দেশে কর জিডিপির হার কম। করদাতার সংখ্যা বাড়ানো গেলে রাজস্ব আদায়ও বাড়বে। রাজস্ব বোর্ডকে ১০ বছরের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে প্রতি বছর গড়ে সাত থেকে আট লাখ নতুন করদাতা সংগ্রহ করতে হবে। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ৪৮ শতাংশ ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। এতে ৯০ শতাংশ রাজস্ব এ দুই অঞ্চল থেকে আদায়ে চাপ থাকে। এ চাপ কমাতে দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকেও করদাতার সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন। সারা দেশে সুষমভাবে কর অঞ্চল স্থাপন করতে হবে। নজরদারির বাইরে থাকা উপজেলা পর্যায়ের সম্পদশালীদের সহজে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
আমদানি-রপ্তানিতে প্রযুক্তির ব্যবহারে জোর দেওয়ার সুপারিশ করে ব্যবসায়ী এ নেতা বলেন, অর্থপাচার হওয়ায় দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সরকার অর্থ সংকটে পড়ছে। সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই আগামী বাজেটে অর্থপাচাররোধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
আগামী বাজেটে আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর প্রদান-সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় সহজে সমাধানের লক্ষ্যে ‘ইন্টিগ্রেটেড ট্যাক্স অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সিস্টেম (আইটিএএস)’ এবং ‘ইন্টিগ্রেটেড ভ্যাট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সিস্টেম (আইভিএএস)’ প্রবর্তনের প্রস্তাব করেন সামীর সাত্তার। এ ছাড়া ভ্যাটের আওতাবহির্ভূত ব্যবসায়ের বার্ষিক টার্নওভারে ঊর্ধ্বসীমা ৩ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ কোটি টাকা নির্ধারণেরও প্রস্তাব করেন তিনি।
সামীর সাত্তার আগামী বাজেটে কাস্টমস-সংক্রান্ত সব কাজ সহজ করতে ‘বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো’ দ্রুত বাস্তবায়নে জোর দেন।