নতুন পণ্যোৎপাদনে বিনিয়োগ হওয়া চাই করমুক্ত

আগামী বাজেটে নতুন পণ্য উৎপাদন গবেষণায় বিনিয়োগকে করমুক্ত রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। এ কথা বলেছেন চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাহবুবুল আলম। তার মতে, রপ্তানি বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রথমেই দরকার রপ্তানি খাতকে আরও সম্প্রসারিত করা ও রপ্তানি বহুমুখীকরণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া। তিনি বলেন, ‘রপ্তানি বহুমুখী করতে হলে আমাদের নিত্যনতুন পণ্য উৎপাদন করতে হবে। এর জন্য গবেষণা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আগামী অর্থবছরের বাজেট-প্রত্যাশা বিষয়ে দেশ রূপান্তরকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এ মত ব্যক্ত করেন সিসিসিআই সভাপতি। আগামী বাজেট কেমন চান এ প্রশ্নের উত্তরে ব্যবসায়ী নেতা মাহবুবুল আলম বলেন, ‘স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যে আমাদের জাতীয় বাজেট সাজানো প্রয়োজন। বিশেষ করে আমরা বর্তমানে যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছি সেসব নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই প্রতিরোধী ব্যবস্থা গ্রহণে গুরুত্ব দেওয়া।’

তিনি বলেন, ‘স্বল্পমেয়াদি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রাজস্ব-আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে আয়করদাতার সংখ্যা বাড়াতে হবে। বর্তমানে দেশে যেসব টিআইএনধারী রয়েছে, তার অর্ধেকের বেশি রিটার্ন দাখিল করে না। রিটার্ন দাখিলের সংখ্যা বাড়াতে আগামী অর্থবছরে স্বল্প জরিমানায় রিটার্ন দাখিলের একটা সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। ব্যক্তিগত করের ক্ষেত্রে যারা আগে রিটার্ন দাখিল করেনি তাদের টিআইএন রেজিস্ট্রেশনের পর থেকে প্রতি বছর ৫ হাজার টাকা হারে জরিমানা ধরে আয়কর ফাইল নিয়মিত করার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এতে করদাতার রাজস্বের পরিমাণ ও সংখ্যা অনেকাংশে বাড়বে। এ ছাড়া ব্যক্তি-করদাতাদের কর দিতে উৎসাহিত করতে বার্ষিক কর রিটার্নের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বাস্থ্যবীমা কার্ড চালু করা যায়।’

বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনায় ব্যক্তি-করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো দরকার উল্লেখ করে চিটাগাং চেম্বার সভাপতি বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে দ্রব্যমূল্য এবং মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে। তাই ব্যক্তিপর্যায়ে করসীমা ৩ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করা যেতে পারে।’

শিল্পায়নে প্রতিবন্ধকতা দূর করতে আগামী বাজেটে পণ্য সরবরাহ ও বিক্রয়ের ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তনের ধাপ (স্ল্যাব) বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘২০২১-২২ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪-এর ৫২ ধারার বিপরীতে পণ্য সরবরাহ ও বিক্রয়ে উৎসে কর কর্তনের সর্বোচ্চ হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭ শতাংশ করা হয়েছে, যা কোনোভাবেই শিল্পবান্ধব হয়নি এবং গৃহীত ব্যবস্থা শিল্পায়নে আরও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে। তাই শিল্পায়নের অগ্রযাত্রাকে বেগবান করতে আমাদের প্রস্তাব অনুযায়ী ধারা ৫২-এর সংশ্লিষ্ট বিধি-১৬-এর বিপরীতে উৎসে কর কর্তন তিন ধাপের বদলে পাঁচ ধাপের করা দরকার।’

বিরাজমান ডলার সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান প্রয়োজন বলে মন্তব্য করে মাহবুবুল আলম বলেন, ‘এ সংকট নিরসনে সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমদানি নিয়ন্ত্রণসহ স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু শুধু আমদানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে ডলার সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।’ তিনি বলেন, ‘আমরা প্রধানত আমদানি করি জ্বালানি, নিত্যপণ্য ও ভোগ্যপণ্য এবং রপ্তানি করি উপভোগ্য পণ্য। আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে রপ্তানি আয়ের ভারসাম্য রাখতে আমাদের রপ্তানি বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। গুটিকয়েক আইটেমের রপ্তানি বাড়ানোর ওপর নির্ভরশীলতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।’

চট্টগ্রাম বন্দর সম্প্রসারণ ও এ লক্ষ্যে গৃহীত প্রকল্পসমূহ দ্রুত বাস্তবায়নে আগামী বাজেটে বিশেষ দিকনির্দেশনা থাকা প্রয়োজন উল্লেখ করে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের এ শীর্ষ নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, বে টার্মিনাল, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালসহ বেশ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। এটি চালু হওয়ার অপেক্ষায় আছে। ক্রমবর্ধমান আমদানি-রপ্তানির চাপ সামলাতে বে টার্মিনাল প্রকল্প বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। আগামী বাজেটে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের স্বার্থে বে টার্মিনাল প্রকল্প দ্রুত চালু করতে বিশেষ পদক্ষেপ থাকা দরকার।’

প্রাকৃতিক গ্যাসের বিকল্প-জ্বালানি হিসেবে বেসরকারিভাবে গড়ে ওঠা এলপি গ্যাস শিল্পের জন্য বাজেটে সুযোগ-সুবিধা দেওয়া এবং এ খাতকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন উল্লেখ করে চিটাগাং চেম্বার সভাপতি বলেন, ‘প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ ক্রমে কমছে। সরকার প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে এলএনজি আমদানি করছে। এতে প্রচুর পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড়ের সময় এলএনজি সরবরাহ সাময়িক বন্ধ থাকায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে মারাত্মক গ্যাস সংকট হয়েছে। বাসাবাড়িতে রান্নাবান্না বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় সিএনজিচালিত যানবাহন। ফলে চরম দুর্ভোগের শিকার হয় এখানকার মানুষ। প্রাকৃতিক গ্যাসের বিকল্প-জ্বালানি হিসেবে গড়ে ওঠা এলপি গ্যাসশিল্প খাতকে সুযোগ-সুবিধা দিয়ে শক্তিশালী করা হলে সরকারের প্রচুর ভর্তুকি বেঁচে যাবে এবং এ ভর্তুকির অর্থ সরকার বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে পারবে।’