বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার পর আশির দশকে বাবার আবাসিক হোটেল পরিচালনার মাধ্যমে ব্যবসায়ী হিসেবে যাত্রা শুরু করেছেন মনোয়ারা হাকিম আলী। একজন নারী হিসেবে তিনিই প্রথম দেশের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। ২০০৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন চিটাগাং উইম্যান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আগামী বাজেটে প্রত্যাশা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সিনিয়র রিপোর্টার শামসুল ইসলামের সঙ্গে শামসুল ইসলাম, চট্টগ্রাম
নারী উদ্যোক্তাদের জন্য রাজস্ব খাতে সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন চিটাগাং উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিডব্লিউসিসিআই) সভাপতি মনোয়ারা হাকিম আলী। তার মতে, উন্নয়ন খাতের বিভিন্ন বরাদ্দ থাকলেও রাজস্ব খাতে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বাজেটে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো বরাদ্দ নেই। বিগত সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ১০০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ দিয়েছিলেন। এই থোক বরাদ্দ বলবৎ রাখার পাশাপাশি রাজস্ব খাতে সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ একান্ত প্রয়োজন।
আগামী বাজেট কেমন চান এমন প্রশ্নের উত্তরে ব্যবসায়ী নেতা মনোয়ারা হাকিম আলী বলেন, বাজেট অবশ্যই জনবান্ধব হওয়া উচিত। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বাংলাদেশেও সার্বিক অর্থনীতিতে মন্দাভাব বিরাজ করছে। আমাদের নানান সীমাবদ্ধতার মাঝেও বাজেটে সাধারণ মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন চাই; বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাবান্ধব বাজেট হবে এটাই আমার প্রত্যাশা।
পর্যটনশিল্পের বিকাশে গৃহীত ২৫ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাজেটে বিশেষ পদক্ষেপ প্রত্যাশা করে মনোয়ারা হাকিম আলী বলেন, পর্যটনশিল্প বাংলাদেশের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি খাত। এ খাতে নারী-পুরুষনির্বিশেষে বিনিয়োগ ও ব্যবসার সুযোগ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত স্মার্ট বাংলাদেশ বাস্তবায়নে এই খাতের উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট বোর্ড, পর্যটন করপোরেশন ও সিভিল এভিয়েশন এই তিন সংস্থা মিলে পর্যটনশিল্পের বিকাশে ২৫ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। বাজেটে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ আশা করছি।
ব্যবসাবান্ধব বিনিয়োগের স্বার্থে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন ঋণের সীমা ৫০ লাখ টাকা করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের ব্যবসায় পুঁজি বিনিয়োগের পরিমাণ অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। এসএমই খাতে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন ঋণের পরিমাণ বর্তমানে সর্Ÿোচ্চ ২৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা আছে। এই ঋণের সীমা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রবর্তিত এসএমই খাতে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ শুধু চলতি মূলধনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এতে বর্তমানে যারা ব্যবসায় নিয়োজিত আছেন শুধু তারাই উপকৃত হচ্ছে। বর্তমানে সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে শুরু করে সব পর্যায়ে নতুন নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টির কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু নতুন নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টির জন্য কোনোরূপ প্রকল্প ঋণ গ্রহণের সুযোগ নেই। তাই নারী উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন প্রকল্প ঋণ প্রবর্তন করা প্রয়োজন।
পাহাড়ি নারী উদ্যোক্তাদের এসএমই ঋণ প্রাপ্তি নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে উইমেন চেম্বার সভাপতি বলেন, পাহাড়ি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর নারীরা আমাদের নারী সমাজের কাছে পরিশ্রমের প্রতীক হিসেবে সমাদৃত। কারণ পাহাড়ি অঞ্চলে পুরুষের চেয়ে নারীরা বেশি পরিশ্রম করেন। কিন্তু পাহাড়ি নারী উদ্যোক্তাদের এসএমই ঋণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এখনো অনিশ্চয়তা কাজ করছে। তাই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নারী উদ্যোক্তাদের ব্যাংকঋণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য প্রবর্তিত জামানতবিহীন ঋণের প্রথা কার্যকর করা প্রয়োজন।
বর্তমানে নারীদের জন্য আয়কর প্রদানের সীমা নির্ধারণ করা আছে সাড়ে তিন লাখ টাকা, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে খুবই কম। উদ্যোক্তা নারীদের ক্ষেত্রে আয়কর প্রদানের সীমা বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ উদ্যোক্তা নারীরা ব্যবসা পরিচালনা করতে গিয়ে নানান ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে থাকেন। এ ক্ষেত্রে তারা কর প্রদানের পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব বিভাগের কর আহরণের মাধ্যম হিসেবেও কাজ করে থাকে।
আগামী বাজেটে অনলাইন ব্যবসায়ীদের ব্যাংকঋণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করার দাবি জানিয়ে ব্যবসায়ী এই নেতা বলেন, বর্তমানে দেশের বিপুল পরিমাণ নারী উদ্যোক্তা অনলাইন ব্যবসায় সম্পৃক্ত হয়েছেন। অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এই খাত নারীদের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কারণ নারীরা ঘরে বসেই এই ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন। কিন্তু অনলাইন ব্যবসায়ীদের ব্যাংকঋণের ক্ষেত্রে এখনো কোনো সঠিক নীতিমালা তৈরি হয়নি। ফলে ব্যাংকঋণসহ সব ধরনের ব্যবসায়িক সুযোগ-সুবিধা ও ব্যবসায়িক লাইসেন্স প্রাপ্তি থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই অনলাইন ব্যবসায়ীদের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নসহ তাদের ব্যবসায়ী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সেবা খাতে বিউটি পারলার সেক্টরে স্বল্প পুঁজি নিয়ে ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তারা ব্যবসা পরিচালনা করে থাকেন। বিউটি পারলার সেক্টরে ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রদান ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের জন্য অনেক বাড়তি চাপ। ফলে বিউটি পারলার সেক্টরের উদ্যোক্তারা ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় অথবা ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে। এই সেক্টরে ভ্যাটের হার ১৫ থেকে ৫ শতাংশ করা হলে ভ্যাটের আওতা বৃদ্ধি পাবে এবং ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তারা ব্যবসা পরিচালনায় সমর্থ হবে।
আগামী বাজেটে স্যানিটারি ন্যাপকিনের কাঁচামালের আমদানি শুল্ক রহিতকরণ ও খুচরা বিক্রির ক্ষেত্রে ভ্যাট-ট্যাক্স হ্রাসের প্রস্তাব দিয়েছেন মনোয়ারা হাকিম আলী। তিনি বলেন, নারীদের স্বাস্থ্য খাতে স্যানিটারি ন্যাপকিন একটি অপরিহার্য অংশ। কিন্তু আমাদের দেশে ৭০ ভাগ নারীই স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করতে পারছেন না। তার মূল কারণ হচ্ছে অসচেতনতা এবং সহজলভ্য না হওয়া।