দেশের অনেক বড় বড় শিল্প কারখানায় অবৈধ গ্যাসসংযোগ নিয়েছেন বলে দাবি করেছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। তিনি বলেন, পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায় তারা একটা গ্যাস লাইনের অনুমোদন নিয়েছে। কিন্তু কারখানায় আরও একটি বা একাধিক অবৈধ বাইপাস লাইন করে গ্যাস নিচ্ছেন।
গতকাল শনিবার ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘জ্বালানি নিরাপত্তা : ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা’ শীর্ষক স্টেকহোল্ডার ডায়ালগে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ সব কথা বলেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমার কাছে তালিকা আছে, তবে এখনই তা প্রকাশ করতে চাই না। এর মধ্যে অনেক বড় ও শীর্ষস্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তারা অনেক বেশি প্রভাবশালী। প্রতিমন্ত্রী অবৈধ গ্যাস সংযোগ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আপনাদের এ অনৈতিক কাজের কারণে অন্যরা গ্যাস পাচ্ছে না। আমরা এই অবৈধ গ্যাস লাইনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা চাই। তবে আমরা চাই কারখানা হোক। শিল্প গড়ে উঠলে অর্থনীতি বড় হবে।
ডায়ালগে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রতিমন্ত্রী। প্রবন্ধে তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে ৩ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের (এমএমসিএফডি) চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ২ হাজার ৯০৭ এমএমসিএফডি উৎপাদন হচ্ছে। আর এলএনজির মাধ্যমে ৭৫১ এমএমসিএফডি গ্যাসের জোগান দেওয়া হচ্ছে। বাকিটা ঘাটতি রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের শিল্পায়ন হয়েছে নিরবচ্ছিন্নভাবে। এখানে আরও ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস পাইপলাইনে দিলেও অনেক শিল্প গ্যাস পাবে না। ৭০০ থেকে ৮০০ ঘনফুট গ্যাস আমদানি করতে ৪ বিলিয়ন ডলার লাগবে।
দেশে প্রাকৃতিক গ্যাস সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার সত্ত্বেও সংকট নিরসনে সরকার গ্যাস আমদানির ওপরই ভরসা বাড়াচ্ছে। ২০২৫ সালে চাহিদার অর্ধেক গ্যাস আমদানি করা এলএনজি দিয়ে পূরণ করতে হবে। নসরুল হামিদ জানান, ২০২৫ সালে দেশে মোট গ্যাসের চাহিদা দাঁড়াবে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট, যার মধ্যে ১৫০০ থেকে ২০০০ এমএমডিএফসি আমদানি করতে হবে।
২০৩০ সাল নাগাদ ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানির ঝুঁকিপূর্ণ পরিকল্পনা সরকার নিয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। ২০৩০ সাল নাগাদ এলএনজি আমদানিতে লাগবে ১২ বিলিয়ন ডলার। বিপুল ভলিউমের এ গ্যাস আমদানির জন্য ল্যান্ডবেজড ও ২টি ফ্লোটিং স্টোরেজ রিগ্যাসিফিক্যাশন ইউনিট (এফএসআরইউ) করার যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে এতেও বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন।
তবে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানের ব্যয় নিয়ে কৃচ্ছ্র দেখিয়েছেন নসরুল হামিদ। তিনি বলেছেন, দেশে গ্যাসের মজুদ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতবিরোধ রয়েছে। গ্যাসকূপ খনন সময় সাপেক্ষ ব্যাপার, প্রতিটি কূপ সার্ভে করতে ৯ থেকে ২১ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত খরচ হয়। এমন ১০টি কূপের মধ্যে তিন থেকে চারটি কূপে গ্যাস পাওয়া যায়। কিন্তু এর মধ্যে অনেক অর্থ চলে যায়। এর পরেও ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করতে হচ্ছে।
২০২৫ সালের মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে মাত্র ৫০০-৬০০ এমএমসিএফডি গ্যাস যোগ হবে বলে আশা করেন তিনি। প্রথমদিকে দেশীয় গ্যাসের কোনো মূল্য দেওয়া হতো না, কিন্তু এখানেও বড় খরচ হয়। আমরা আসার পর একটি সর্বনিম্ন দাম নির্ধারণ করে দেই।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এফবিসিসিআই ও বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আহসান খান চৌধুরী, আনোয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান মানোয়ার হোসেন, এফআইসিসিআই সভাপতি, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের সিইও নাসের এজাজ বিজয় প্রমুখ।
নসরুল হামিদ আরও বলেন, বিদ্যুৎ খাতে সবচেয়ে বেশি গ্যাস খরচ হচ্ছে। মোট গ্যাসের ৪২ শতাংশ ব্যবহার করা হয় বিদ্যুৎ খাতে। এছাড়া শিল্প খাতে ব্যবহার হচ্ছে ১৮ শতাংশ, ক্যাপটিভে ১৭ শতাংশ, সার উৎপাদনে ৬ শতাংশ, সিএনজিতে ৩ শতাংশ এবং কমার্শিয়াল অ্যান্ড চা খাতে এক শতাংশ গ্যাসের ব্যবহার হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, অবৈধ সংযোগ, মিটার রিডিং চুরি বন্ধ করা উচিত। আমরা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সংযোগ পাচ্ছি না। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য আমাদের নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সংযোগ প্রয়োজন।
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি শফিউল আলম মহিউদ্দিন বলেন, সরকার ইকোনমিক জোনে যাওয়ার কথা বলছে। বাস্তবতা হলো ইকোনমিক জোনগুলো এখনো রেডি না। অন্যদিকে রাজস্ব ব্যবস্থাপনাও দুর্বল। রাজস্ব বোর্ডকে বসে বসে ট্যাক্স আদায়ের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদের শিল্পের জন্য গ্যাস বিদ্যুতের দাম বাড়বে আপনারা বসে বসে কর আদায় করবেন তা হবে না।