১৮ জুন থেকে আইএমএফের হিসাবে রিজার্ভ গণনা

আন্তর্জাতিক পদ্ধতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গণনার দিন চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ১৮ জুন আগামী অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতি প্রকাশ করা হবে এবং সেদিন থেকে আইএমএফের হিসাবে রিজার্ভ গণনা করে তা প্রকাশ করবে। তবে বর্তমান গণনা পদ্ধতিও বলবৎ থাকবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।

আসন্ন মুদ্রানীতিতে ডলারের একক রেট নির্ধারণে নীতিগতভাবে সমর্থন মিলেছে। পাশাপাশি সুদের হার নির্ধারণে বেঞ্চমার্ক পদ্ধতি ও ইন্টারেস্ট করিডর পদ্ধতি মানা হবে। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতির হার ৬ শতাংশ এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার সাড়ে ৭ শতাংশে নির্ধারণে মতামত উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত হিসাবে জুড়ে দেওয়া ব্যালেন্স অব পেমেন্ট অ্যান্ড ম্যানুয়াল (বিপিএম ৬) অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে বাংলাদশ ব্যাংক। বিপিএম ৬-এর আওতায় দেশের রিজার্ভ নেট ইন্টারন্যাশনাল রিজার্ভ (এনআইআর) পদ্ধতিতে প্রকাশ করা হবে।

গতকাল রবিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সভাপতিত্বে নির্বাহী পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত হয় বলে জানিয়েছেন সভায় অংশগ্রহণকারী একাধিক কর্মকর্তা। তবে বৈঠকে আর বৈঠকের মুদ্রানীতি বিষয়ে আলোচনার কথা নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. মেজবাউল হক।

সূত্র জানায়, আসন্ন মুদ্রানীতিতে আইএমএফের সংস্কার প্রস্তাব অনুযায়ী রিজার্ভ গণনায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন পদ্ধতিতে ব্যয়যোগ্য রিজার্ভের হিসাব দেখানো হবে। নতুন পদ্ধতিতে গণনার সময় রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল, পায়রাবন্দরে বিনিয়োগ, সোনালী ব্যাংকের ধার এবং শ্রীলঙ্কার ঋণসহ প্রায় সাড়ে ৫ বিলিয়ন বাদ দিতে হবে। বর্তমানে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ রয়েছে। সেখান থেকে সাড়ে ৫ বিলিয়ন ডলার বাদ দিলে রিজার্ভ ২৪ বিলিয়নের ঘরে আসবে। আর এই সংখ্যা আইএমএফের সর্বনিম্ন সীমার (২২ দশমিক ৭৫ ডলার) ওপরে থাকবে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য বাড়তি দুশ্চিন্তার সৃষ্টি করবে না।

তারা জানায়, নতুন মুদ্রানীতিতে ডলারের একক রেট নির্ধারণ করা হবে। ইচ্ছা করলে কোনো অনুমোদিত ডিলার ব্যাংক ভিন্ন ভিন্ন রেটে ডলার ক্রয়-বিক্রয় করতে পারবে না। তবে ডলার ক্রয়-বিক্রয়ে ভিন্ন হার থাকবে। তবে কোনো অবস্থাতেই ডলারের দামের ব্যবধান ২ টাকার বেশি হবে না। একইভাবে মানি চেঞ্জারও নির্দিষ্ট দরে ডলারর লেনদেন করবে।

এদিকে নতুন মুদ্রানীতিতে ৯ শতাংশ সুদের হারের সীমা তুলে দিয়ে সুদহারে করিডর পলিসি ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বেঞ্চমার্ক পদ্ধতি মেনে চলা হবে। সেই রেট মেনে ব্যাংকগুলো লেনদেন করবে। এ ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির চেয়ে সুদের হার কম হবে না। আর সুদের হার নির্ধারণে কলমানি, ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদের হার গড় করে একটি রেট নির্ধারণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মেজবাউল হক বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব প্রয়োজনে কিছু রিফর্ম (সংস্কার) নিয়ে কাজ করছি। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার একাধিক রেট একটিতে নিয়ে আসা, সুদহার বাজারমুখী করা ও রিজার্ভ হিসাব আইএমএফের বিপিএম ৬ পদ্ধতিতে করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে রিজার্ভ হিসাবে আমাদের প্রচলিত গ্রস হিসাবটিও থাকবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘গভর্নরের নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী ১৮ জুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে। পেছানোর আশঙ্কা নেই। তবে যদি বিলম্ব করা হয়ও তা কোনোভাবেই ২২ জুনের পর হবে না। কেননা, চলতি বছরের মুদ্রানীতি ঘোষণা করে ওই দিনই গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের হজ পালনের জন্য সৌদি আরবের উদ্দেশে যাত্রা করার সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে।’

এদিকে গত বৃহস্পতিবার বিআইডিএসের বার্ষিক গবেষণা সম্মেলনে গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার বলেন, এককভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের এখন যে সহযোগিতা তার ৯৫ শতাংশই ঋণ এবং ৫ শতাংশ অনুদান। এ ৫ শতাংশ অনুদানও আমরা চাই না। তারা জোর করে আমাদের দিতে চায়। আমরাও না বলি না। আমরা ঋণ নিই এবং সুদসহ তাদের পরিশোধ করি।’

তিনি বলেন, ‘ম্যাক্রো ইকোনমিকসের অনেক ইনডিকেটর নিয়ে কথা আসছে। এর মধ্যে রয়েছে ইনফ্লেশন, এক্সচেঞ্জ রেট এবং ইন্টারেস্ট রেট। এখানে বাংলাদেশের ব্যাংকের অবস্থান আমি উল্লেখ করতে চাই। অনেকের কথার সঙ্গে বাস্তবতার পার্থক্য রয়েছে।’

গত বছর অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্যে স্পষ্ট মূল্যস্ফীতির বিষয়ে বলা হয়েছে উল্লেখ করে গভর্নর বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী বলেছেন যে এ মূল্যস্ফীতি মানি সাপ্লাই থেকে আসে না। এটা লোকালি ইনডিউসড ইনফ্লেশন না। এখানে যে কৌশল নেওয়া হয়েছিল তা হলো ডিমান্ড কনটেইন করা ও সাপ্লাই সাইডে ইন্টারভেনশন বাড়ানো। ইন্টারভেনশন করতে অনেক বেল্ট টাইটেনিং পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে ফিসক্যাল ও মনিটরি সেক্টরে। আমরা অপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের আমদানি ও বিলাসবহুল আমদানিকে নিরুৎসাহিত করেছি। যার মাধ্যমে ডিমান্ডকে আগের লেভেলে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া সাপ্লাই সাইডে এ সময় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত করা হয়েছে।’