মার্কিন ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠান মডার্না তিনটি রোগের টিকা আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছে। রোগ তিনটি হলো ক্যানসার, হৃদরোগ ও অটোইমিউন। মডার্নার এমন ঘোষণায় বাংলাদেশে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছে। পাশাপাশি রোগভেদে এই টিকা আবিষ্কার নিয়ে কিছু নিরাশাও দেখা দিয়েছে।
দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ক্যানসারের দুটি টিকা ইতিমধ্যেই আবিষ্কার হয়েছে এবং বাংলাদেশে রোগীদের দেওয়া হচ্ছে। আরও কয়েক ধরনের ক্যানসারের টিকা হতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত হৃদরোগ ও অটোইমিউন রোগের কোনো টিকা বিশ্বে আবিষ্কার হয়নি। এর মধ্যে শুধু কার্ডিওমায়োপ্যাথি নামে এক ধরনের হৃদরোগের টিকা হতে পারে। তবে হার্টের ব্লকের বিরুদ্ধে কোনো টিকা আবিষ্কার সম্ভব নয়। একইভাবে অসম্ভব শতাধিক অটোইমিউন রোগের একই টিকা আবিষ্কার। এমনকি পৃথক অটোইমিউন রোগের পৃথক টিকা আবিষ্কারের ক্ষেত্রেও ভীষণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
বাংলাদেশের চিকিৎসকরা এসব রোগের চিকিৎসায় বরং টিকার চেয়ে এগিয়ে থাকা স্টেম সেল ও জিন সেল থেরাপি চিকিৎসার ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন। তারা বলেছেন, টিকা আবিষ্কার হলে ভালো। তবে বিভিন্ন ধরনের থেরাপি নিয়ে গবেষণা অনেক বেশি এগিয়েছে। এখন সেদিকেই বেশি মনোযোগ দেওয়া দরকার।
দেশের জাতীয় ক্যানসার হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট, জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও গবেষকরা এই অভিমত জানিয়েছেন।
গত ৮ এপ্রিল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম মডার্নার এই টিকার তথ্য প্রকাশ করে। সেখানে মডার্নার প্রধান মেডিকেল কর্মকর্তা ড. পল বার্টন জানান, ২০৩০ সাল নাগাদ ক্যানসার, কার্ডিওভাসকুলার, অটোইমিউন রোগ ও অন্যান্য জটিল রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে টিকা প্রস্তুত হতে পারে। আগামী ৫ বছরের মধ্যে তার প্রতিষ্ঠানটি ‘সব ধরনের রোগের’ চিকিৎসার জন্য এ ধরনের সমাধান দিতে পারবে।
সব অটোইমিউনের এক টিকা কঠিন : সব অটোইমিউন রোগের এক টিকা আবিষ্কার কখনোই সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রিউমাটোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শামীম আহমেদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আজ পর্যন্ত বিশ্বে কোনো অটোইমিউন রোগের টিকা আবিষ্কার হয়নি। শতাধিক অটোইমিউন রোগ রয়েছে। পৃথকভাবে কোনো একটি রোগের টিকা আবিষ্কার হতে পারে। কিন্তু সব অটোইমিউন রোগের জন্য সাধারণ একটা টিকা আবিষ্কার সম্ভব না। কারণ অটোইমিউন রোগের জন্য একটা সাধারণ জিন দায়ী নয়। লাখ লাখ কোটি কোটি জিন আছে। কয়টা জিনের বিরুদ্ধে টিকা আবিষ্কার করবে?
বরং চিকিৎসকরা এই রোগের চিকিৎসায় এগিয়ে থাকা জিন থেরাপি গবেষণায় বেশি আশাবাদী। এ ব্যাপারে ডা. শামীম আহমেদ বলেন, অটোইমিউন রোগ জেনেটিক ব্যাপার। এই রোগের থেরাপি চিকিৎসা তৈরির চেষ্টা চলছে। কোনো পরিবারে যদি কোনো রোগী থাকে, তার মাধ্যমে সেটি পরিবারের অন্য সদস্যরা আক্রান্ত হলো কি না তা জিন থেরাপির মাধ্যমে জেনেটিক অ্যানালাইসিস করে আমরা বের করতে পারব।
অটোইমিউনের চিকিৎসা ব্যয়বহুল : ডা. শামীম আহমেদ বলেন, শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করার জন্য এক ধরনের ইমিউনো সেল আছে। এই সেল যখন আর অপ্রয়োজনীয় সেল ধ্বংস করতে পারে না, তখন নানা ধরনের অটোইমিউন রোগ দেখা দেয়। একশর বেশি অটোইমিউন রোগ আছে। এর মধ্যে কিছু রোগ বাংলাদেশে বেশি দেখা যায়। যেমন গিঁটে বাত, থাইরয়েড, টাইপ-১ ডায়াবেটিস, সোরিয়াসিস (চুলকানি-জাতীয় রোগ), অসারতা, দুর্বলতা, হাঁটতে না পারা ইত্যাদি।
এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক জানান, এসব রোগ সম্পূর্ণ সারে না, নিয়ন্ত্রণ করা যায়। একজন রোগীকে দীর্ঘদিন ওষুধ খেতে হয়। বিশেষ করে বায়োলজিক্যাল থেরাপির প্রতি মাসে ব্যয় হয় এক লাখ টাকা। আর একই ধরনের বায়ো সিমিলার থেরাপি বের হয়েছে। এটার দাম ২০-৩০ হাজার টাকা।
কার্ডিওমায়োপ্যাথির টিকা হতে পারে : হৃদরোগের ক্ষেত্রে শুধু কার্ডিওমায়োপ্যাথি রোগের টিকা হতে পারে বলে জানান জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ও আইপিডিআই ফাউন্ডেশনের সেক্রেটারি জেনারেল ডা. মহসীন আহমেদ। তিনি বলেন, হার্ট কোনো কারণে বড় হয়ে যায়। এটাকে কার্ডিওমায়োপ্যাথি বলে। এটার জন্য কিছু ভাইরাস ও অটোইমিউন ডিজিজ দায়ী। বাংলাদেশে ভাইরাস সিকোয়েন্সব্যবস্থা খুব কম থাকায় আমরা বলতেও পারছি না কোন ধরনের ভাইরাস দ্বারা সে আক্রান্ত হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে যদি এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে টিকা আবিষ্কার করা যায় তাহলে প্রচুর রোগী বাঁচানো সম্ভব।
জেনেটিক হৃদরোগে এগিয়ে থেরাপি : হৃদরোগে টিকার চেয়ে বরং স্টেম সেল থেরাপি চিকিৎসা অনেক বেশি আশাবাদী হয়ে উঠছে বলে জানান ডা. মহসীন আহমেদ। তিনি বলেন, কিছু জেনেটিক বা পারিবারিক রোগ আছে। যেমন অনেক পরিবারে সব ভাই-বোনের হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে। অল্পবয়সী লোকজন মারা যাচ্ছে। তাদের জেনেটিক সিকোয়েন্স করে জিন থেরাপি ও স্টেম সেল থেরাপি চিকিৎসা সম্ভব। এই রোগীদের হার্ট অ্যাটাকের জন্য কিছু কিছু জিন দায়ী। সেই জিনগুলো চিহ্নিত হয়েছে। এসব জিনের বিরুদ্ধে জিন থেরাপির চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। সেটা খুব তাড়াতাড়ি বাজারে এলে জেনেটিক হৃদরোগ বন্ধ করা যাবে। কিন্তু ভ্যাকসিন থেরাপির খুব বেশি আপডেট পাইনি।
ক্যানসারের টিকায় আশা, আছে চ্যালেঞ্জও : এখন পর্যন্ত বিশ্বে দুই ধরনের ক্যানসারের টিকা আছে বলে জানান জাতীয় ক্যানসার হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. এ টি এম কামরুল হাসান। তিনি বলেন, লিভার ক্যানসারের জন্য হেপাটাইসিস-বি ও জরায়ু মুখের ক্যানসারের জন্য এইচপিভি (হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস) টিকা আছে। এ ছাড়া ক্যানসারের আর কোনো টিকা নেই। পরোক্ষভাবে কিছু টিকা ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সেগুলোর কার্যকারিতার সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ নেই।
একসময় অন্যান্য ক্যানসারের টিকাও আবিষ্কার হতে পারে বলেও জানান এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। তিনি বলেন, যেমন পাকস্থলীর ক্যানসার হয় এইচ পাইলোরি (হেলিওব্যাক্টার পাইলোরি) নামের এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার জন্য। ৪০-৫০ শতাংশ ক্যানসার রোগীর এই ব্যাকটেরিয়ার কারণে ক্যানসার হয়। এটার জন্য আমরা কিছু ওষুধ দিই। এটার টিকা হলে তা কার্যকর হতে পারে। ক্যানসারের মূল উৎস যদি উদঘাটন করতে পারি, তাহলে সেটার প্রতিরোধে আমরা টিকাও আবিষ্কার করতে পারি। তবে ক্যানসারের টিকা আবিষ্কারে চ্যালেঞ্জ আছে। কারণ একেক ক্যানসারের জীবাণু একেক রকম এবং তাদের সংক্রমণের ধরনও আলাদা। ফলে সব ক্যানসারের জন্য এক টিকা সম্ভব নয়। একেক ক্যানসারের জন্য পৃথক পৃথক টিকা দরকার।
ধীর গতিতে এগোচ্ছে ক্যানসারের চিকিৎসা : বাংলাদেশে ক্যানসার চিকিৎসা এগোচ্ছে, কিন্তু কিছুটা ধীর গতির বলে জানান ডা. এ টি এম কামরুল হাসান। তিনি বলেন, দেশে ক্যানসারের চিকিৎসা বাড়ছে, ওষুধে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু রেডিওথেরাপি মেশিন কম। আরও কিছু সরকারি হাসপাতাল দরকার, যেগুলো থেকে স্বল্পমূল্যে মানুষ চিকিৎসা পেতে পারে। চিকিৎসাব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ দরকার। আট বিভাগের আটটি ক্যানসার হাসপাতাল হচ্ছে। যকৃৎ বা লিভার ও জরায়ু মুখে ক্যানসারের টিকার সাফল্য ৯০-৯৫ শতাংশ। এই দুই টিকা সরকার বিনামূল্যে দিচ্ছে। এই দুই টিকা বাংলাদেশেই তৈরি হচ্ছে। ক্যানসার নিরাময়ে আগে একসময় কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি নিয়ে কথা বলতাম। এখন ইমিনোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি, হরমোন থেরাপি এসেছে। এসব চিকিৎসার সফলতাও অনেক ভালো।