বিএনপির সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ভাঙচুর আগুন

রাজধানী ঢাকার সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে বিএনপির পদযাত্রা কর্মসূচি চলাকালে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। অন্যদিকে পুলিশ বিএনপির নেতাকর্মীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার শেল নিক্ষেপ করেছে। এ সময় ওই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-১০ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী রবিউল ইসলাম রবিসহ কয়েকজনকে আটক করেছে।

সংঘর্ষের ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘বিনা উসকানিতে বিএনপির পদযাত্রায় পুলিশের হামলা প্রমাণ করে আওয়ামী সরকার নিজেদের পতন আঁচ করতে পেরেই এখন আরও তীব্র মাত্রায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তবে অবৈধ সরকার এসব কর্মকানে্ডর মাধ্যমে আর রাষ্ট্রক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হবে না। কারণ জনগণ এখন ভয়াবহ দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠে রাস্তায় নেমে এসেছে।’ 

এদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় অভিযোগ করে বলেছেন, ‘পদযাত্রা নিয়ে তারা সিটি কলেজ এলাকায় যেতেই পুলিশ আটকে দেয়। একপর্যায়ে পুলিশ নেতাকর্মীদের ওপর টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে ও লাঠিপেটা করে।’

এ বিষয়ে পুলিশের নিউ মার্কেট অঞ্চলের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ ফারুকুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, ‘শান্তিপূর্ণভাবেই পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করছিল বিএনপির নেতাকর্মীরা। হঠাৎ করেই মিছিল থেকে পুলিশের ওপর হামলা হয়। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য টিয়ারশেল নিক্ষেপসহ যা যা করার আমরা সেটা করেছি। এ সময় নেতাকর্মীরা দুটি বিআরটিসি বাসসহ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করে। বাসে আগুন লাগিয়ে দেয়। আমরা জনগণের সহযোগিতায় আগুন নিয়ন্ত্রণ করি। পরে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসে।’

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুস সালাম অভিযোগ করে বলেন, ‘পুলিশ স্বীকার করেছে আমরা শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করেছি। আমাদের নেতাকর্মীরা কোনো ঝামেলা করেনি। পুলিশ ইচ্ছাকৃতভাবে নেতাকর্মীদের ওপর লাঠিচার্জ করেছে এবং টিয়ারশেল নিক্ষেপ করেছে। শুধু তাই নয়, পুলিশ পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটাবে বলে আগেভাগেই ফায়ার সার্ভিসকে প্রস্তুত থাকতে বলেছে।’

যুবদলের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে ৩০-৩৫ জনের একটি মিছিল ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিয়ে সিটি কলেজের সামনে থেকে সায়েন্স ল্যাব হয়ে নিউ মার্কেটের দিকে যাচ্ছে। মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের কারও কারও হাতে লাঠিসোঁটা দেখা যায়। কয়েকজনের মাথায় হেলমেটও দেখা যায়।’

উচ্চ আদালতের নির্দেশনাকে নিম্ন আদালত ও সরকারের অবজ্ঞা, ‘গায়েবি মামলা’য় নির্বিচারে গ্রেপ্তারসহ ১০ দফা দাবিতে গতকাল ঢাকাসহ সারা দেশের সব মহানগরে পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করেছে বিএনপি। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির উদ্যোগে দুটি পদযাত্রার কর্মসূচি ছিল। একটি ছিল ধানমন্ডিতে, অন্যটি গাবতলী এলাকায়। বিকেল সাড়ে ৩টায় পদযাত্রা শুরুর কথা থাকলেও দুপুর ১টার পর থেকেই খন্ড খন্ড মিছিল নিয়ে বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ডের নেতাকর্মী ধানমন্ডিতে জড়ো হতে থাকেন। পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে ধানমন্ডি ও এর আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।

সরকার দাবি মানলে আন্দোলন করবে না বিএনপি- সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে গয়েশ্বর : ধানম-িতে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে তৈরি অস্থায়ী মঞ্চে পদযাত্রাপূর্ব সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘আমরা এখনো সরকার পতনের আন্দোলন শুরু করিনি। শেখ হাসিনা যদি দাবি মেনে পদত্যাগ করেন তাহলে সরকার পতনের আন্দোলন করব না। আমরা জানি তিনি তা করবেন না। তাই আমরা শিগগিরই সরকার পতনের আন্দোলন ঘোষণা করব।’

গয়েশ্বর বলেন, ‘আমাদের দাবি একটাই, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। ‘যার ভোট সে দেবে, যাকে খুশি তাকে দেবে’ এই লক্ষ্যে আমাদের ১০ দফা দাবি। ১০ দফার মূল কথা হচ্ছে- একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে হবে। আর বাকিগুলো হলো প্রাসঙ্গিক। আমরা এই অবৈধ সরকারের পদত্যাগ চাই। সংসদ বাতিল চাই। সরকারকে বলব নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি মেনে নিন। নিরপেক্ষ সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করবে। তাদের অধীনে আমরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব। আশা করব আওয়ামী লীগও অংশ নেবে। জনগণ যাকে ভোট  দেবে, তারাই সরকার গঠন করবে, আর তাতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।’

পদযাত্রা কর্মসূচিতে অংশ নেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুস সালাম, বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী ও নির্বাহী কমিটির সদস্য শেখ রবিউল রবিসহ বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

আইনগত ব্যবস্থা নেবে বিআরটিসি : বিআরটিসির সচিব মোহাম্মদ সাইদুর রহমান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ‘বিএনপির নেতাকর্মীদের ছোড়া ইটপাটকেলে বাসের চালক আহত হয়েছেন। বাস দুটির উইন্ডশিল্ড গ্লাসসহ ১৫টি গ্লাস ভেঙে গেছে। তাছাড়া যাত্রীরা বাস থেকে নেমে যাওয়ার পর গাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ডিপো ম্যানেজারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

মির্জা ফখরুলের নিন্দা : সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় পুলিশের হামলার ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘বিএনপির পদযাত্রা চলাকালে পুলিশ অতর্কিত হামলা চালিয়ে ঘটনাস্থল থেকে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-১০ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী শেখ রবিউল আলম রবি, ধানমন্ডি থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহাদাৎ হোসেন সৈকতসহ ২৫ জনের অধিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে। এছাড়া পুলিশের টিয়ারশেল ও রাবার বুলেটে আহত হয়েছেন ধানমন্ডি থানা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম টিটু, ধানমন্ডি থানাধীন ১৫ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিকদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনির সিকদারসহ আরও অনেকে।’

রাজশাহীতে পদযাত্রা করতে পারেনি : পুলিশের অনুমতি না মেলায় রাজশাহীতে পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করতে পারেনি বিএনপি। বিএনপির পক্ষ থেকে পদযাত্রা কর্মসূচির অনুমতি চেয়ে আবেদন করা হয় পুলিশের কাছে। তবে মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে এই কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া হয়নি। এদিকে, গতকাল সকাল থেকে রাজশাহী নগরীর মালোপাড়ার বিএনপি কার্যালয়, সাহেববাজার ও আশপাশের এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। দলীয় কার্যালয় ও আশপাশের কয়েকটি রাস্তায় অবস্থান নেয় পুলিশ সদস্যরা। সাহেববাজার এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়।  কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে মঙ্গলবার সকাল ১১টায় নগরীর মালোপাড়া থেকে রেলগেট পর্যন্ত পদযাত্রা কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছিল স্থানীয় বিএনপি।