কত পরিচয় তার। পিতাহারা এতিম বালক, রুটির দোকানের মজদুর, দারোগার বাড়ির ফরমাশ-খাটা চাকর, লেটো গানের দলের সাঙাত, সেনাবাহিনীর হাবিলদার, বিদেশি যুদ্ধফ্রন্টের সৈনিক, সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনীতিবিদ, কারাভোগী বিপ্লবী। আবার সেই তিনি কবি, গীতিকার, গায়ক, সংগীত শিক্ষক, রাগ-রাগিনীর জনক, অভিনেতা, উপন্যাসিক, গল্পকার, প্রবন্ধকার, নন্দনতাত্ত্বিক ইত্যাদি। তার বিচরণ পুরুলিয়া থেকে করাচি অবধি। এক জীবনে যে বহুজীবনের স্বাদ তিনি পেয়েছেন, বহু ধারায় নিজের জীবনীশক্তি ও প্রতিভাকে বইয়ে দিয়েছেন; তার কি কোনো তুলনা আছে? সম্ভবত নেই।
নামও কি কম তার! দুখু মিয়া, নজর আলি, নাজির আলি। নামগুলো আসলে নামহীন-গোত্রহীন এক যুবকের নিজেকে লাগাতারভাবে ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা বলে। শেষে স্থির হন, ‘নাজিরুল ইসলাম’ ও ‘কাজী নজরুল ইসলাম’ নামে। টিকে যায় কাজী নজরুল ইসলাম নামটিই। তার মানে তার প্রতিষ্ঠার ভিত তখন পোক্ত ও বিস্তারিত। সহজে উপড়ানো যাবে না। কী মুসলমান কী হিন্দু, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মহল এমন কেতাবি নাম ছাড়া কাউকে সম্মান করত না। নামের বিবর্তন থেকে বোঝা যায়, দিনে দিনে তিনি অনামা থেকে ‘নাম-করা’ সারিতে উঠে আসছেন। কিন্তু দুঃখের দহনে পোড়া ‘দুখু মিয়া’র জীবন আগের মতোই দুঃখের দরিয়াই থেকে গেছে।
অনেক সামাজিক শ্রেণিতে থাকার অভিজ্ঞতা তার হয়েছে। বহু ভাষায় তিনি সাহিত্যের স্বাদ নিয়েছেন। বেশ বড় ভূগোলে তিনি বিচরণ করেছেন। হিন্দু ও মুসলিম তো তার পরিবারেই জড়ানো। সাহিত্যেও তিনি হিন্দু ও মুসলিম দুই তরফেরই। সত্যিকার বাঙালি সংস্কৃতি যদি কারও জীবনে ফলে গিয়ে থাকে, সেটাও নজরুল। তার আগের যুগের ফকির লালন শাহকে বাদ দিলে এ ব্যাপারে সম্ভবত তিনিই একমাত্র। নজরুল অসাম্প্রদায়িক নন, তিনি সর্ব সম্প্রদায়ের। নজরুলের জীবন তার সাহিত্যের মতোই চমক লাগানো। বাঙালি সংস্কৃতির দুই ধারা কোথাও যদি মেলে, সেটা নজরুলের জীবন, সংস্কৃতি এবং সৃষ্টির মধ্যেই। ধর্মান্তর না করেই দোলন ওরফে প্রমীলা দেবীর সঙ্গে তার বিবাহ, চেতনার মধ্যে হিন্দু-মুসলিমের যুগল ভাব এবং অপরকে আপন করার লালনীয় উদারতা এবং ভারত ও পারস্য দুনিয়ার ভাবকে এক জায়গায় মেলানোর বিশ্বজনীনতা সত্যিই বিরল। তিনি চিন্তাকে আবেগায়িত করেছেন, আবেগকে করেছেন চিন্তাধর। একই কথা খাটে তার রাজনীতির বেলায়ও। রাজনীতিকে আবেগায়িত আর আবেগকে রাজনীতি-জারিত করায় তিনি বেজোড়ই বটে।
এত পরিচয় সত্ত্বেও বাঙালির মনে দুখু মিয়া অতি চেনা কবিয়ালের রূপে স্থায়ী হয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ যখন নিচ্ছেন সুফি দরবেশের বেশ। নজরুলকে তখন দেখা যায় বুকের একপাশে চাদর জড়ানো, সুদর্শন গোঁফ ও বাবরি চুলের চেহারায়। বেশভূষার এই যে বাহার, তা বাংলাদেশের কবিয়ালের চিরায়ত ছবিকেই মনে জাগিয়ে তোলে। তার স্বভাবের গীতল উচ্ছ্বাস কবিয়াল ছাড়া আর কার? নিম্নবর্গের ইতিহাস ধারার গুরু রণজিৎ গুহ গান্ধীর পোশাকের মধ্যে গুজরাতি কৃষকের আদল দেখতে পেয়েছিলেন। নজরুলের মধ্যে আমরা দেখি বাংলার লোককবিদের মর্মজ্বালা। একেবারে কৃষক আবহ থেকে উঠে এসে তিনি উচ্চবর্গের মহলে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। বাংলা ভাষার ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ও জনপ্রিয় কবিয়াল নজরুল। সর্বজনের সারি থেকে উঠে আসা নজরুলের মনে এক চির দুখু মিয়ার বসবাস।
গরিব চালচুলার ঘর থেকে বেরিয়ে এমন অসাধারণ আলোর ঝলকানির জন্য যে তীব্র আত্মশক্তির প্রয়োজন, তার সময়ে বা পরে আর কারও মধ্যে দেখা যায় কি? এক প্রতিভাধর দুখী কবিয়ালের এ রকম গরীয়ান উত্থান বিশ্বসাহিত্যেই বিরল ঘটনা।
এবং ঘটনা কিছুটা আশ্চর্যেরও। সতেরো শতকের আরেক দুর্দান্ত কবি মহাকবি আলাওল। নজরুলের মধ্যে যেন তারই আধুনিক পুনর্জন্ম। আলাওলের জন্ম ফরিদপুর এলাকায়, আনুমানিক ১৬০৭ সালে। পর্তুগিজ জলদস্যুরা তাকে অপহরণ করে আরাকানে নিয়ে বিক্রি করে দেয়। তিনিও সাধারণ সৈনিক পদ থেকে আরাকান রাজসভার প্রধান কবিতে পরিণত হন। খেয়াল করার বিষয়, মধ্যযুগের সুলতানি আমলের বাংলা আর আরাকানেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্য ফুলে-ফলে ভরে ওঠে। দুই বেলাতেই মুসলমান কবিরা ধর্মীয় বিষয়ের সঙ্গে রোমান্টিক প্রেম মিশিয়ে মানবীয় প্রেমের জাগরণের পথ খুলে দেন। নজরুলও আলাওলের মতোই প্রজ্ঞাবান। দুজনের সাহিত্যেই বুদ্ধি ও আবেগের নিপুণ লীলার স্বাদ পাওয়া যায়। আলাওল মধ্যযুগের বাংলা কবিতা শুধু নয়, ভারতীয় ভাষাগুলোর কবিদের মধ্যে একজন শিরোমণি ছিলেন, নজরুলও গত শতাব্দীর বিরাট কীর্তিমান কবি। আলাওল আরবি, ফারসি, হিন্দি ও সংস্কৃত ভাষার সুপণ্ডিত ছিলেন। ব্রজবুলি ও মঘী ভাষাও তার আয়ত্তে ছিল। তারপরও তিনি বাংলাকেই বেছে নিয়েছিলেন। নজরুলও আরবি, ফারসি, সংস্কৃত ভাষা ও ছন্দের রসে বাংলা ভাবজগৎকে আরও সুফলা করেছেন। তারপরও মধ্যযুগের পর বাংলা কবিতায় বিবাগী প্রেমভাবকে আবার জাগানোর অবদানের কথা কি আমরা খুব একটা বলি?
বৈষ্ণব গীতিকবিতার প্রেম কখনো অতিকামজ আবার কখনো তা ঈশ্বরপ্রেমেরই ছায়া। রবীন্দ্রনাথের প্রেম অনেক বিমূর্ত এবং সেই প্রেমও ঈশ্বরপ্রেমে উত্তরিত হতে চায়। রূপের তৃষ্ণা আকারের আকাক্সক্ষা সেখানে যেন নিস্তেজিত। মধ্যযুগের পর নজরুলের মানসে আবার জাগল দিওয়ানা হওয়ার জোশ। এই প্রেম কাম ও মিলনের উচ্ছ্বাসে ভরপুর, আবার গজল ও রুবাইয়ের ত্যাগী ভাবরসে টলমল। নীরদ সি চৌধুরী বাঙালি জীবন ও কাব্যে রোমান্টিক প্রণয় ছিল না বলে দাবি করেছেন। নজরুলের জীবন ও সাহিত্যকে আমলে নিলে হয়তো তিনি তার মত শোধরাতে চাইতেন।
কাজী নজরুল বাংলা ভাষার রাজ্যে যা করেছেন, তা করেছেন। কিন্তু তার আবির্ভাব ছাড়া বিশ শতকের গোড়ার মুসলমান বাঙালির সাহিত্যসাধনার আত্মবিশ্বাস অর্জন এবং ভেতর-বাহিরের বাধা দূর করা অনেক পিছিয়ে যেত। কারণ, পলাশীর পরাজয়ের পর ইংরেজরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চলন-বলনটাই শুধু বদলে দেয়নি, তারা সর্বতোভাবে বাংলার মুসলিম বিদ্বজ্জনের জীবন ও সাহিত্যচর্চা কঠিন করে তুলেছিল। পলাশী যুদ্ধের পরের দেড়শ বছর বাঙালি মুসলমানদের দিশাহারা দশার পর নজরুলের উদয় তাই যুগান্তকারী ঘটনা।
গুণের বিচারে নজরুল কেবল বাঙালি মুসলমান বা বাঙালি জাতির জন্যই নয়, ভারতীয় মাপেই মুক্তিকামী চিত্তজাগরণের পথিকৃৎ। আরেকটি দিক থেকেও নজরুল মুক্ত মানবের প্রতিনিধি। আর সব বিদগ্ধ ও কর্মীপুরুষ যেখানে কোনো না কোনোভাবে উপনিবেশবাদী পশ্চিমের বশ্যতা বা মুগ্ধতা লালন করেছেন, জীবনের কোনো পর্যায়েই নজরুল তা মানেননি। মনকে তিনি মুক্ত রাখতে পেরেছিলেন। তিনি ইংরেজের নির্যাতন বরণ করেছেন, স্বধর্মীয়দের গালমন্দ শুনেছেন, পরধর্মী স্বজাতির উপেক্ষা সয়েছেন। কোনোভাবেই তিনি কায়েমি রাজনৈতিক ও সম্পত্তি ব্যবস্থার অংশ ছিলেন না। তার ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় যে তেজস্ক্রিয় মুক্ত ‘আমি’র জয় দেখি, তার কাছাকাছি অচলায়তনভাঙা অষ্মিতা ভারতবর্ষে কেন, বিশ্বসাহিত্যেই বিরল।
নজরুলের জীবন ও সাহিত্যে যে বাঁধনছেঁড়া পুরুষকার দেখি, তা আত্মশক্তিতে বিশ্বাসী। যার মনে এত তীব্র ভালোবাসা, বিদ্রোহ আর ট্র্যাজিক আত্মচেতনা দপদপ করে, তাকে ধারণ করার সমাজ কই? তাকে তো স্বাভাবিকতার বাইরে বোবা ও অপ্রকৃতিস্থই হতে হবে। বাঙালি ভাবুক ও ভাবালু। নজরুল এ দুটির কোনোটিই নন; কিন্তু সংবেদন আর উচ্ছ্বাস দিয়ে তিনি চিন্তাকে ছাপিয়ে এমন এক সত্যে পৌঁছান; চিন্তায় যা তখনো ধরা যায়নি। নিম্নবর্গের নজরুল, বোহেমিয়ান নজরুল, বিপ্লবী নজরুল, যাত্রার নায়ক নজরুল, গায়ক-অভিনেতা নজরুল, পল্টনের নজরুল, প্রেমিক নজরুল, বৈষ্ণব ও সুফি নজরুল জীবনের যত পথে নিজেকে আবিষ্কার ও নিঃশেষ করেছেন, কোনো সনাতন ব্যক্তিপুরুষের পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। রবীন্দ্রনাথ যদি দেখতে পেতেন, তাহলে গোরার মতো কাল্পনিক আদর্শবাদী ইউটোপিয়া তৈরি না করে নজরুলকেই তার উপন্যাসের নায়ক করতেন।
প্রথম কবিতা প্রকাশের পর শতবর্ষ হতে চলল। তবু ফেরারি আজও; ঘরে ফেরা হয়নি দুখু মিয়ার। তাহলে ফেরারি কবিকে কীভাবে ‘জাতীয় কবি’ করা হয়? জবাব হলো, বোবা করে দিয়ে। নজরুল শেষ বয়সে বোবা হয়ে গিয়েছিলেন নিয়তির পরিহাসে, মস্তিষ্ক শুকিয়ে আসার রোগে। কিন্তু নজরুল প্রতিভাকে ফুলমালায় ঢেকে তার বিপ্লবী বাঁধনছেঁড়া চরিত্রকে গোপন করে ফেলা হচ্ছে। শোকের চল্লিশ দিন পর যেমন কথা বলে ওঠে শোকতপ্ত মানুষ; শতবর্ষের নীরবতার পর নজরুলও ঠিক রব করে উঠবেন তার ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রবল অহমিকা নিয়েই।
একের ভেতরে বহু হয়ে থাকা নজরুলের সেই মুখের সাথে আমাদের পরিচয় হতে এখনো অনেক বাকি। ভালোবাসা বা ভক্তির ঝালর দিয়ে তাকে ঢেকে রেখে আমরা বলতে পারি না কাজী নজরুল আমাদের একজনই জাতীয় কবি। জীবনানন্দ ও বিনয় মজুমদারের সেই সারসের মতো কিংবা রবীন্দ্রনাথের উড্ডীন বলাকার মতো নজরুলের নীড়-হারা পাখিটাও অচিন পাখি হয়েই রয়ে গেলো।
কবি ও লেখক। সমকাল পত্রিকার পরিকল্পনা সম্পাদক।