রাঙ্গুনিয়ায় আবাসন প্রকল্প পরিবেশ রক্ষা করেই

গত ২৩ মে (মঙ্গলবার) দৈনিক দেশ রূপান্তর পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় রাঙ্গুনিয়ায় সরকারি আবাসন প্রকল্প নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ (জাগৃক)। গতকাল বুধবার পাঠানো প্রতিবাদলিপিতে সরকারি সংস্থাটি বলেছে, “জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বাস্তবায়নাধীন ‘চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় সাইট অ্যান্ড সার্ভিসেস আবাসিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্প’ নিয়ে প্রতিবেদনে যেসব তথ্য দেওয়া হয়েছে তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, বানোয়াট ও কল্পকাহিনী নির্ভর। যা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিপন্থী। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক সরেজমিনে পরিদর্শন না করে এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ডকুমেন্ট (নথি) সঠিকভাবে বিশ্লেষণ না করে কাল্পনিকভাবে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন। মূলত সরকারের ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ পলিসিকে বাধাগ্রস্ত করতেই উদ্দেশ্যমূলক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। প্রকাশিত সংবাদে পাহাড় কেটে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের যে গল্প সাজানো হয়েছে তা সঠিক নয়, অনুমান নির্ভর।”

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা, “প্রকৃত ঘটনা হলো, ‘পাহাড় কেটে নয় বরং পরিবেশ রক্ষা করেই রাঙ্গুনিয়ায় আবাসন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকায় কোনো ধরনের পাহাড় নেই। কিছু জমি ন্যাড়া টিলা শ্রেণির এবং বাকি জমি নিচু ও পতিত। নিচু ও পতিত জমিতে ইতিপূর্বে দুটি ইটের ভাটা ছিল। ইটভাটার মাটি কাটার কারণে সেখানে কিছু নিচু জমির সৃষ্টি হয়। বিগত চল্লিশ বছর ধরে সেখানে কোনো চাষাবাদ ও ক্ষেতখামার হয়নি। বাস্তবে সেখানে কোনো জলাধার নেই এবং কখনো ছিল না।” সংস্থাটি আরও বলেছে, ‘প্রতিবেদনে বিশেষ ইশারা ও প্রভাবশালী ব্যক্তির চাপে প্রকল্পের পরিবেশ ছাড়পত্র আদায় এবং স্থানীয় প্রভাবশালীরা প্লটের ভাগ-বাটোয়ারার যে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে তা ভিত্তিহীন। অথচ এখনো প্রকল্পের জমিই অধিগ্রহণ হয়নি। যেখানে জমি অধিগ্রহণসহ প্রকল্পের মূল কাজই শুরু হয়নি সেখানে প্লটের ভাগ-বাটোয়ারা কল্পনাপ্রসূত। অধিগ্রহণ পরবর্তী সময়ে সাইট ডেভেলপমেন্ট করে প্লট বরাদ্দ লটারির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। আর পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সরকারি কোনো দপ্তর চাপে পড়ে নয়, নিজেরা সরেজমিনে পরিদর্শন করে এবং চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক দেওয়া এনভায়রনমেন্টাল ইম্পেক্ট অ্যাসেসমেন্ট (ইআইএ) প্রতিবেদন এক বছর ধরে পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই করে ছাড়পত্র দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর।’

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, “প্রতিবেদনে প্রকল্প স্থানটিকে পাহাড় ও জলাধার উল্লেখ করা হয়েছে। বাস্তবে সেখানে কোনো পাহাড় ও জলাধার নেই। প্রকল্প এলাকার কিছু অংশ ন্যাড়া টিলা হলেও সেখানে কোনো গাছপালার অস্তিত্ব নেই। পরিত্যক্ত ভূমিতে স্বল্প সংখ্যক মৌসুমি কলাগাছ রোপণ করেছেন স্থানীয়রা। ৪০ বছর ধরে সেখানে কোনো চাষাবাদ ও ক্ষেত খামার হয় না। প্রকল্প এলাকায় নেই কোনো জলাধার। ইতিপূর্বে সেখানে দুটি ইটভাটা ছিল। যা স্থানীয়ভাবে ‘মজুমদার ইটভাটা’ হিসেবে পরিচিত। ইটভাটার মাটি কাটার কারণে সেখানে কিছু নিচু জমির সৃষ্টি হয়। প্রকৃতপক্ষে এসব নিচু জমি, জলাধার নয়।”

সরকারি সংস্থার মতে, ‘প্রতিবেদনে প্রকল্পের সময়বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে করোনাকালীন দুই বছর কাজের ধীরগতি সৃষ্টি ও বিভিন্ন দপ্তর থেকে ছাড়পত্র গ্রহণ এবং যাচাই-বাছাই ও মাঠ পর্যায়ে সার্ভে কাজে নির্ধারিত সময়ে কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। যার কারণে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সময় বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়।’

জাতীয় গৃহায়নের প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়েছে, “প্রকৃত বিষয় হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ঘোষিত ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ পলিসিকে সামনে রেখে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ২০২০ সালে ‘চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় সাইট অ্যান্ড সার্ভিসেস আবাসিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্প’ গ্রহণ করে। প্রকল্পটির প্রস্তাবিত জমির পরিমাণ ছিল ১৬ একরের বেশি। পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট), পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ লি. (পিজিসিবি), আইএমইডি, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সার্ভে ও প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ছাড়পত্র গ্রহণ করে ১৩২ কেভি বৈদ্যুতিক লাইন ও উঁচু টিলার অংশ বাদ দিয়ে প্রকল্প এলাকা নির্ধারণ করা হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে প্রকল্পের জমির পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ১৪ একর। এখানে ১৩২ কেভি বৈদ্যুতিক টাওয়ার থেকে পিজিসিবি কর্তৃক নির্ধারিত দূরত্ব বজায় রেখে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। ফলে স্থাপনা নির্মিত হলে ঝুঁকির কোনো সম্ভাবনা নেই।”

আরও বলা হয়, ‘ভৌগোলিকভাবে রাঙ্গুনিয়া উপজেলাটি পাহাড়-টিলা বেষ্টিত। এই উপজেলার ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ প্রবাসী। আবাসনের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে এই উপজেলায়। পাহাড় ও টিলা রক্ষা করে স্থানীয়দের ব্যাপক চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে পতিত জমিতে আবাসন প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। উপজেলার জঙ্গল ঘাটচেক মৌজার যেই স্থানে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে সেখানে কোনো কৃষিজমি নেই। পতিত জমিতেই মূলত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে। প্রকৃতপক্ষে যেখানে সেখানে পাহাড় কেটে বসতবাড়ি যাতে গড়ে না ওঠে সেই লক্ষ্যে পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তোলার জন্যই প্রকল্পটি উক্ত স্থানে নেওয়া হয়। এখানে ইকোসিস্টেম ধ্বংস হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যা চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) ইআইএ প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়। প্রকৃতপক্ষে টিলা ঠিক রেখে নিচু জমি ভরাট করে লেভেল ড্রেসিংয়ের মাধ্যমে বসবাস উপযোগী আবাসন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। পরিবেশের ক্ষতি করে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ নেই।’