বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, যে দেশের আয় যত বেশি বাড়ে, সে দেশের সম্পদ কর আহরণ তত বেশি বাড়ে। বাংলাদেশের সম্পদ কর আহরণ জিডিপির শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ ১ শতাংশ জিডিপি বাড়লে সম্পদ কর শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ বাড়ার কথা। সেই আয় ও মূল্যস্ফীতি মিলিয়ে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় বছরে ৬ হাজার কোটি টাকা বাড়তি সম্পদ কর আসার কথা ছিল। কিন্তু তা আসছে না।
গতকাল বুধবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে ‘রাষ্ট্র ও বাংলাদেশে সম্পদ কর আহরণের সুযোগ’ শীর্ষক সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ড. দেবপ্রিয় বলেন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে সম্পদ কর প্রায় ১০ শতাংশের মতো। অথচ বাংলাদেশে তা শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ। আফ্রিকাতে তা শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। বাংলাদেশ এখন আফ্রিকার সঙ্গে তুলনীয় হয়ে গেছে। অথচ আফ্রিকার চেয়ে আমাদের আয়ের মাত্রা বেশি। তার মানে কোথাও একটা ফাঁক রয়েছে।
দেবপ্রিয় বলেন, বাংলাদেশে আয় বেড়েছে দ্বিগুণ, একই সঙ্গে বৈষম্যও বেড়েছে। কিন্তু দেখার বিষয় আয় বৈষম্যের চেয়ে সম্পদের বৈষম্য বেড়েছে দ্বিগুণ হারে। আয় বৈষম্য ১.৪ শতাংশ বেড়ে থাকলে সম্পদের বৈষম্য বেড়েছে ৩ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ সম্পদের বৈষম্য ক্রমান্বয়ে ঘনীভূত হচ্ছে ও বৈষম্য কয়েকগুণ হারে বাড়ছে।
তিনি বলেন, সম্পদ কর আহরণের সঙ্গে উন্নয়নের একটা সম্পর্ক আছে। যদি জিডিপি বাড়ে, মাথাপিছু আয় বাড়ে, তাহলে সম্পদ করও বাড়ার কথা। বাংলাদেশে কি তাই হচ্ছে? যদি ১ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয় তাহলে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ সম্পদ কর বাড়ার কথা। যেহেতু আয়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্পদও বাড়ে। তাহলে নামিকভাবে যদি ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয় এবং ৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি থাকে তাহলে মিলিয়ে ১২ শতাংশ। ১২ শতাংশ যদি প্রবৃদ্ধি হয় তাহলে বছরে ৬ হাজার কোটি টাকা বাড়তি সম্পদ কর আসার কথা ছিল। সেটা তো আমরা পাইনি।
যথাযথ ব্যবস্থায় সম্পদ কর আদায় করতে পারলে অর্থনীতিতে ‘শুভচক্রের’ দেখা মিলবে বলে জানান দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘সম্পদ কর যদি আমরা আদায় করতে পারি তাহলে অর্থনীতির ভেতরে একটি ‘শুভচক্র’ আমরা দেখব। উন্নতি হবে, প্রবৃদ্ধি হবে, সম্পদ আহরণ হবে, বিনিয়োগ হবে সরকারের পক্ষ থেকে। সামাজিক সেবা বাড়বে, যা উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে আমাদের আরও উচ্চতর প্রবৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাবে।
সিপিডির গবেষণা বলছে, দেশের রাজস্ব আয়ের ৫৫ শতাংশ আসে পরোক্ষ কর থেকে। গত ৫ বছর প্রত্যক্ষ কর ৩৩ শতাংশের ঘরে আটকে আছে। সম্পদ থেকে রাজস্ব বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এটাকে কাজে লাগানো প্রয়োজন। তাই প্রত্যক্ষ কর আদায়ের জন্য নতুন নতুন খাত সন্ধান করতে হবে।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আইএমএফের শর্ত পূরণ করতেও রাজস্ব খাতে সংস্কার প্রয়োজন। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, দেশে প্রকৃতপক্ষে প্রত্যক্ষ কর মাত্র সাড়ে ৪ শতাংশ। এর বড় অংশ ভূমি উন্নয়ন কর। প্রত্যক্ষ কর না বাড়ার কারণে আয় বৈষম্য বাড়ছে। বাংলাদেশে আয় বৈষম্যের চেয়ে সম্পদের বৈষম্য দ্বিগুণ হারে বেড়েছে। একটি প্রজন্ম সম্পদ আয় করে ও পরবর্তী প্রজন্ম তা ভোগ করে। তাই সেখানে সম্পদের বৈষম্য হ্রাস করে ন্যায্যতা নিয়ে আসতে হবে। ওই বৈষম্য হ্রাস ও রাজস্ব আদায়ে বাংলাদেশে উত্তরাধিকার কর প্রচলন অত্যন্ত প্রয়োজন।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য তার প্রবন্ধে বলেন, বাংলাদেশ পাঁচ ধরনের ট্যাক্স চলমান রয়েছে ভূমি উন্নয়ন কর, ওয়েলথ সারচার্জ, হোল্ডিং ট্যাক্স, ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স ও গিফট ট্যাক্স। এর মধ্যে স্থাবর সম্পত্তি যখন নিজেদের মধ্যে দান বা হেবা হয়, সেখানে কোনো ট্যাক্স নেই। আমরা এ বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে বলেছি। শুধুমাত্র উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই ট্যাক্স অব্যাহতি দেওয়া যেতে পারে।
তিনি বলেন, অন্যদিকে সরকার যখন নিজে কোনো প্রকল্প গ্রহণ করেন, যেমন ইকোনমিক জোন কিংবা বড় কোনো প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ করে। তখন তারা ট্যাক্স দেয় না। এখানে সরকার ব্যক্তি খাতের সঙ্গে এক ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি করছে। আবার সম্পদ সারচার্জ ৩৫ শতাংশ রয়েছে। এটাকেও আমরা উচ্চ মনে করছি। ট্যাক্স সিস্টেমের ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের মধ্যেও বৈষম্য রয়েছে। দেশের ভেতরে সম্পদ যেভাবে কেন্দ্রীভূত হয়েছে, যেভাবে আয়ের বৈষম্য বেড়েছে। ন্যায্যতা ও বৈষম্য হ্রাসে সম্পদ করের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির শামীম হায়দার পাটোয়ারী। এ ছাড়াও সম্মানিত অতিথি ছিলেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের করপোরেশন হেড মরিজিও সিয়ান।
এতে প্যানেল আলোচক ছিলেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আব্দুল মজিদ, ড. নাসিরুদ্দীন আহমেদ এবং স্নেহাশিষ মাহমুদ অ্যান্ড কোং-এর পার্টনার স্নেহাশীষ বড়ুয়া।
সাইফুজ্জামান চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে কম। আমরা রাজনৈতিকভাবে দ্বিমত হতে পারি। কিন্তু এই এক জায়গাতে একমত। আমরা যারা রাজনীতিবিদ সরকারে আছি, তারা যখন এই কথাগুলো বলি তখন মানুষ এটাকে নেতিবাচকভাবে দেখে। সরকার আরও কীভাবে ট্যাক্স আদায় করতে পারে, মানুষকে চাপে রাখা যায় সেই চিন্তা করছে। কিন্তু আজকে সিপিডি হুইসেল ব্লোয়ার হিসেবে বিষয়টি আলোচনায় নিয়ে এসে আমাদের কাজটি সহজ করে দিয়েছে।
শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, যে সমস্যাগুলো তুলে ধরা হয়েছে তা সর্বজন স্বীকৃত। আমার ব্যক্তিগত অভিমত, তারপরও এগুলো হবে না। এখানে আমাদের রাষ্ট্রের বড় সমস্যা। খুব সহজ পলিসি, খুব সহজ রিফর্ম হতে চায় না। কারণ, এখানে একটা দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী ও দুর্নীতিবাজ আমলা এই ট্রাইও (চক্র) কাজ করছে। এই ট্রাইও সেই সেই পলিসি নেয় এবং কাজ করে যেখানে দুর্নীতির সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, জিডিপির সঙ্গে আমার কর অনুপাত অত্যন্ত কম। তার মানে আমাদের জিডিপি হিসাব হচ্ছে না অথবা কর কম দেখাচ্ছি। কর কম দেখানোর সুযোগ তো নেই। জিডিপি যেভাবে বাড়ছে কর সেভাবে বাড়ছে না। জিডিপি যেভাবে বাড়ছে কর্মসংস্থান সেভাবে বাড়ছে না। কর্মসংস্থানহীন, করহীন একটা সমাজব্যবস্থা আমরা গড়ে তুলেছি।
ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, সম্পদ করের ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছে। জমি ও বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্টের ক্ষেত্রে যথাযথভাবে কর আরোপ হচ্ছে না। এখানে বৈষম্য রয়েছে। জমির ওপর বিনিয়োগ বাড়ছে, কারণ জমির দাম অস্বাভাবিকহারে দাম বাড়ছে। এটার বড় কারণ এই বিনিয়োগে বড় ধরনের কর দিতে হয় না।