সঙ্গী হলেন চুমকিদের পথ হলো আনন্দের

তিনি আসবেন। দেশ রূপান্তর অফিসে, মধ্যদুপুরে। কিন্তু আসছেন না। ফোন করা হচ্ছে, মুহুর্মুহু। এদিকে ইনহাউজ প্রস্তুতি শেষ। জম্পেশ আড্ডা হবে, ডিজিটাল স্টুডিওতে। কিন্তু তিনিই তো নেই! সবার মুখ শুকনো। কিছুক্ষণ পর ফোন বেজে উঠল। একে একে সবার। তিনি জানালেন, আসছেন। সবার মুখে প্রশান্তির ছায়া। অবশেষে হন্তদন্ত হয়ে এলেন। বললেন, ঘুমাইয়া পড়ছিলাম! তোমাদের ফোনের জ্বালায় টিকতে পারলাম না। প্রায় দৌড়াইয়া আইসা পড়ছি! হাহাহা, চলো চলো। কোথায় যাব?

এই কণ্ঠশিল্পীর বাড়তি পরিচয়ের দরকার নেই। জন্ম নিয়েছেন, ১৯৪৬ সালের ১ আগস্ট। জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায়। কিন্তু শৈশব কাটে পুরান ঢাকায়। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার বড় এই শিল্পী, ১৯৬৭ সালে কলেজ অব মিউজিক থেকে ডিগ্রি নেন। একই সঙ্গে জগন্নাথ কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করেন। সেই বছরই বাংলাদেশ বেতার এবং টেলিভিশনে শুরু করেন গান গাওয়া। ১৯৬৯ সালে ‘আগন্তুক’ চলচিত্রের মাধ্যমে ঢাকাই চলচ্চিত্রে শুরু করেন প্লেব্যাক। বাবুল চৌধুরী পরিচালিত এই চলচ্চিত্রে গান গেয়েই নজর কাড়েন দেশের বিখ্যাত সংগীত পরিচালকদের। এ পর্যন্ত প্রায় ৪০০ ছবিতে প্লেব্যাক করেছেন। তার গাওয়া অসংখ্য জনপ্রিয় গান এখনো মানুষের মুখে মুখে।

স্টুডিওতে ঢুকলেন, খুরশীদ আলম। সঙ্গে ৬ জন আড্ডাবাজ। সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান, সিনিয়র সহ-সম্পাদক মোহসীনা লাইজু, বিনোদন সম্পাদক মাসিদ রণ, সহ-সম্পাদক এনাম-উজ-জামান বিপুল, অনলাইন বিভাগের সহ-সম্পাদক নাজমুস সাকিব রহমান এবং দেশ রূপান্তর ডিজিটাল বিভাগের প্রযোজক লিটু হাসান। খুরশীদ আলমকে টেবিলের মাঝখানে রেখে, চারপাশে ৬ সাংবাদিক। শুরু হলো এলোমেলো কথা বলা। সঞ্চালনা মাসিদ রণ,  গ্রন্থনা তাপস রায়হান

খুরশীদ আলম বললেন আগে একটু জল খাইয়া লই। গলাটা ভিজলে, কথা বলতে সুবিধা হবে। তিনি পানি চাইলেন। দৌড়ে গেলেন অফিস সহকারী। কিন্তু পানি আসে না। খুরশীদ আলম বললেন কই, আমার জল কই? এমন সময় এলেন, দেশ রূপান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোস্তফা মামুন। কুশল বিনিময় শেষে বললেন আড্ডা শেষ হলে খুরশীদ আলমকে তার রুমে নিয়ে যেতে। এই বলে বিদায় নিলেন। কাউকে কোনো প্রশ্নের সুযোগ না দিয়েই, খুরশীদ আলম শুরু করলেন কথা

সুরকার ও সংগীত পরিচালক প্রণব ঘোষের কাছে আমি অসম্ভব কৃতজ্ঞ। তিনি বিনা ভিসায় ঐ পাড়ে নিয়া গেছিলো। গেলাম হেমন্ত বাবুর বাসায়। তিনি ১৩টা গান গাইলেন। আমি যখন তাকে কদমবুসি করতে গেছি, তখন বললাম এতোগুলি গান কীভাবে গাইলেন? বললেন একজন শিল্পী যদি ২০টি গান মুখস্থ না গাইতে পারে, সে কীভাবে দাবি করে, আমি শিল্পী? আসলে, অনেকের কাছেই শিখছি।

তাপস রায়হান : এটা কত সালে?

খুরশীদ আলম : এটা হইলো, ৭৯ সালের কথা। তখন কিন্তু প্রণব ঘোষের বৃহস্পতি তুঙ্গে। তার রমরমা অবস্থা। আমাদের উদ্দেশে বললেন, এইবার বলেন। প্রশ্ন করেন, আমি বলবো। কোয়েশ্চেন অ্যান্ড অ্যান্সার। হাহাহা। তিনি টেবিলে আঙুল নাচাচ্ছেন। মনে হলো, গান গাইবেন। এমন সময় দেওয়া হলো হারমোনিয়াম। নাড়াচাড়া করলেন। দেখলেন, ওটা বাজে না। কোনো স্বর নেই। শুধু ফুসফাস শব্দ। হেসে বললেন এইডা কি শো!

লিটু হাসান : না-না। গত পরশু রাতেও তো বাজলো! বুঝতেছি না, কী হইলো?

খুরশীদ আলম : কই, অহন তো বাজে না! লিটু হাসানের উদ্দেশে বললেন এই ব্যাটা, সাউন্ড কই? এরপর লক্ষ করলেন, হারমোনিয়াম লক। বললেন ও, আইচ্ছা? বুঝতে পারছি। এরপর বাজাতে থাকলেন। বললেন না, ভালো হইছে। হারমোনিয়াম যে আছে, এইডাই অনেক ভালো।  

(টেবিলের কাচে হাত রেখে, আঙুল নাচাচ্ছেন। টুকুর টুকুর টুক ছন্দে। বললেন, পরে গান হবে। এখন কথা বলি।)

লিটু হাসান বললেন একটা গান শুনি? আজকে না হয় ভালোবাসো/ আর কোনোদিন নয়- এই গানটা গাইবেন?

খুরশীদ আলম হাসতে হাসতে বললেন ঐডা তো লাফাঙ্গা গান। তিনি আবার পানি চাইলেন। 

মোহসীনা লাইজু বললেন তাহলে পানি খেয়েই নেন? এরপর আড্ডা শুরু হোক?

খুরশীদ আলম আঙুল নাচিয়ে বলছেন কই, ওয়াটার থেরাপি নাই তো! হাহাহাহা। এমন সময় পানি এলো। অফিস সহকারীকে বললেন কইত্থিকা জল আনছো? এইটা কি সাঁতারপুল থিকা আনছো, বাবা? হাহাহা। ঢক ঢক করে পানি খেলেন।

মাসিদ রণ অফিস সহকারীর উদ্দেশে বললেন আপনারে তো অনেকক্ষণ আগে বলা হয়েছে! চা, বিস্কিট আনেন?

খুরশীদ আলম : (তিনি হারমোনিয়ামে প্যাঁ পুঁ করছেন, আর কথা বলছেন)।  ঘটনা হইছে কী আমি আর রথীন্দ্রনাথ রায় গেছি বেনাপোল বর্ডারের নো ম্যানস ল্যান্ডে। সেই দিন ছিলো ২১ ফেব্রুয়ারি। সেইখানে...! (তিনি থামলেন। বললেন না, থাক। কমু না। হারমোনিয়ামের ওপর হাত রেখে কথা বলছেন আর হাত নাচাচ্ছেন।)

বললেন আমি থাকতাম, পুরান ঢাকার কাজী আলাউদ্দিন রোডে। তখন এক হোল্ডিং নম্বরে ৭-৮টা বাড়ি থাকত। পাশেই ছিল, হাজি সাহেবের বিরিয়ানির দোকান। তখন আমরাই, ছোটবেলায় তার দোকানের সামনে মুরগির কত ছবি আঁকছি। দাম লিখা দিছি দ। এর মানে, ফুল প্লেট বারো আনা। আবার দুইটা টান (।।)-এর মানে হইলো হাফ প্লেট, আট আনা। এখন খাইতাছি ৩০০ টাকা, নো টেস্ট। ওখানেই বেড়ে ওঠা। ঐখান থিকাই আমি নবাবপুর হাইস্কুলে ভর্তি হইলাম। পরে জানলাম, এই স্কুল থেকে খারাপ-ভালো সব ধরনের ছাত্র বের হইছে।

বললেন তখন হইতো কী, ঐ এলাকার স্কুলগুলোতে একটা সিস্টেম ছিল। সেখানে নবাবপুর সরকারি হাইস্কুল, সেন্ট গ্রেগরি হাইস্কুল, কামরুনন্নেছা গার্লস হাইস্কুল, নারী শিক্ষা মন্দির এ ধরনের ভালো ভালো স্কুল ছিল।  

স্কুলগুলার মধ্যে একটা কালচারাল প্রতিযোগিতা হইতো। যে বিষয়ে যে ছাত্র ভালো, তাকে পিক করা হইতো। সেটা আবৃত্তি, নজরুল গীতি, পল্লীগীতি বা ভাওয়াইয়া যে আসলে যে বিষয় ভালো পারে, তাকে বাছাই করা হতো। পাশে ছিল, এডুকেশন ব্রডকাস্টিং করপোরেশন। সেখানেই প্রথম আমি গান শিখি রবীন্দ্রসংগীত। ৫ জনের কাছে রবীন্দ্রসংগীত শিখতাম। এদের মধ্যে, ব্রিগেডিয়ার শাহজাহান হাফিজ আর সানজিদা আপা জীবিত আছেন। এরপর ১৯৬৬ সালে খন্দকার ফারুক ভাইয়ের কাছে, ৭টা আধুনিক গান তুলে নিলাম। এরপর অডিশন দিলাম রেডিওতে। পাশও করলাম। অডিশনে ছিলেন আহাদ ভাই, সমর দাস আর ফেরদৌসী আপা। তখন সমর দাস বললেন গলাটা ভালো, কিন্তু তুই তো একজনরে কপি করস! আমি বললাম সবাই তো করে। তিনি হাসলেন। বললেন আমার বাসায় আয়। পরে গেলাম। তিনি শিখালেন, কীভাবে নিজেরে আলাদাভাবে তৈরি করা যায়। ৬ মাস পরে, তিনি বললেন এইবার যা। যার সঙ্গেই গাইবি, দেখবি তোর কণ্ঠ আলাদা। আমার জীবনে এই হইলো সমর দাসের কীর্তি।

৬৪ সালে এসএসসি পাস করার পর, আমি ইন্টারমিডিয়েট পড়তে চলে গেলাম কলেজ অব মিউজিকে। এরপর ছায়ানটে গেলাম। সেইখানে উচ্চাঙ্গ সংগীত শিখার সময়, আজাদ রহমানের সঙ্গে আমার চাচার দেখা হয়। চাচা ছিলেন ডা. আবু হেনা সাঈদুর রহমান। ডাক নাম- মাস্তানা। এভাবেই শুরু...।

তাপস রায়হান : আপনি কাকে কপি করেন?

খুরশীদ আলম : সেইটা বলা যাইবো না। হাহাহা...

(এমন সময় এলো, অফিস সহকারী। খুরশীদ আলম বললেন দুধ চা নাই? চিনি দিছেন তো? মোহসিনা লাইজু বললেন না না, এটা কফি। বাহ্, দেশটা কিন্তু খাইয়াই মরলো। দেন, আমিও খাই! তিনি বিস্কিট খাচ্ছেন আর কথা বলছেন। রণ বললেন আবার কফি নিয়ে আসেন, দুধ দিয়ে।)

বললেন আমি তখন ‘সি’ গ্রেডের শিল্পী। কমার্শিয়ালে গান করতে পারি না। কিন্তু আজাদ রহমান সব ব্যবস্থা করলেন। রেডিওর তৎকালীন আঞ্চলিক পরিচালক ছিলেন সৈয়দ জিল্লুর রহমান সাহেব। তার ছেলে হচ্ছে মোস্তফা কামাল সৈয়দ। তিনি বিটিভির জিএম ছিলেন। তখন আজাদ রহমানের সহযোগিতায় প্রথম গান গাইলাম রেডিওতে। ১৯৬৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান রেডিওতে প্রচারিত আমার প্রথম গান ছিল, সিরাজুল ইসলামের লেখা ও আজাদ রহমানের সুরে তোমার দুহাত ছুঁয়ে শপথ নিলাম/ থাকবো তোমারই আমি কথা দিলাম। এই গানটি পুরো পাকিস্তানে, ডিস্ক বিক্রিতে সপ্তম স্ট্যান্ড করে। এরপর আজাদ রহমান ‘আগন্তুক’ ছবির জন্য আমাকে গান করতে বললেন। ‘বন্দী পাখির মতো’ গানটি করলাম, আজাদ রহমানের সুরে। তখন কিন্তু আমার খাওয়া-দাওয়া, সবকিছুই তার বাসায়।

তাপস রায়হান : ‘তোমার দুহাত ছুঁয়ে শপথ নিলাম’ গানের সুর মনে আছে?

খুরশীদ আলম :  থাকবো না ক্যান? (তিনি গান গাইতে থাকলেন। চোখ বন্ধ করে, সবাই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছে।)

এনাম-উজ-জামান বিপুল : আপনি যখন রেডিওতে এই গান গাইলেন, তখন সম্মানী পেয়েছিলেন?

খুরশীদ আলম : হ, পাইছিলাম। খুবই নগণ্য, জঘন্য। দুইটা গানে ২০ টাকা। আমি তো ছিলাম, ‘সি’ গ্রেডের শিল্পী। আর ‘এ’ গ্রেডের শিল্পী, ফেরদৌসি রহমানরা পেতেন প্রতি গানে মনে হয়, ১৭৫ টাকা।

তাপস রায়হান : তখন চালের কেজি কত ছিল? 

খুরশীদ আলম : ঠিক মনে নাই। সম্ভবত আট আনা। তখন আমি ইন্টারমিডিয়েট পড়ি। এটা ৬৯ সালের কথা।

নাজমুস সাকিব রহমান : এই টাকা দিয়ে কী করেছিলেন?

খুরশীদ আলম : হাহাহা। মনে নাই তো! আমি একটু অন্য কথা বলি। আমারে যেমন দেখতাছেন, আমি কিন্তু এইরকম না। স্বভাবে কিন্তু ত্যাড়া। জীবনে অনেক অপ্রাপ্তি আছে। অনেক ক্ষোভ আছে। মানুষের সাধারণ চাহিদা পূরণ না হলে, এইরকম হয়। আমারও হইছে। যে স্কুলে পড়তাম, সেখান থেকে আর্মি চিফ, নেভাল চিফ আছে। আমারও শখ ছিল বড় কিছু হওয়ার। বন্ধুরা অনেক ওপরের পোস্টে গেছে। কিন্তু আমি পারি নাই। হইতে পারি নাই বইলা, ঐ মেজাজটা রইয়া গেছে। এইটাও বিশ্বাস করি, আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই। এনিওয়ে, এসব বইলা লাভ নাই।

মাসিদ রণ : আপনি তো গান গাওয়ার পাশাপাশি চাকরিও করতেন?

খুরশীদ আলম : আসলে একটা সময় আসলো, যখন দেখলাম গান গাইয়া সংসার চালানো কঠিন। আমার তো লেট ম্যারেজ। ৮৬ সালে বিয়া করছি। আমার ২ মেয়ে। চাকরি তো করতেই হবে।

প্রসঙ্গ পাল্টে বললেন, ফিল্মে আমার সেকেন্ড গান হলো ‘পিচ ঢালা পথ’ ছবির। এই ছবির সংগীত পরিচালক ছিলেন রবীন ঘোষ। সেই ছবির গানটি খালি গলাতেই গাইলেন। বললেন রেকর্ডিং হইছিলো এফডিসিতে। গানটি হচ্ছে এই আমি পাগল/ পাগল পাগল দুনিয়ায়/ মানুষ চেনা দায়। এরপর তো একের পর এক সংগীত পরিচালক আমাকে ডাকতে থাকলেন। সমর দাস, সুবল দাস, সত্য সাহা, খন্দকার নুরুল আলমসহ অনেকেই। আর আজাদ রহমান তো আছেই।

এরপর সত্য সাহার ছবিতে গান করলাম। ‘মানুষের মন’ ছবিতে। গাজী মাযহারুল আনোয়ারের লেখা গানটি হলো ছবি যেনো শুধু ছবি নয়/ আজ কেনো তাই মনে হয়/ এ যেনো ওগো দুটি প্রাণের/ কথা বিনিময়। এরপর আর পেছন তাকাতে হয় নাই।

মোহসিনা লাইজু : এরপর তো প্লেব্যাকে আপনার ব্যস্ততা বেড়ে গেল। কতগুলো গান গাইলেন?

খুরশীদ আলম : আমি ৪৭৫টি ছবিতে প্লেব্যাক করছি, ২০১৫ সাল পর্যন্ত।

তাপস রায়হান : গানের সংখ্যা কেমন হবে?

খুরশীদ আলম : হাহাহা, জানি না। ঐ হিসাব নাই।

তাপস রায়হান : কয়েক হাজার তো হবে, নাকি?

খুরশীদ আলম : তা হবে। সাবিনা ১০০০০ গান গাইছে। আমি অত না গাইলেও, কমতো গাই নাই!

মোহসিনা লাইজু : সাবিনা ইয়াসমিনের সঙ্গেই তো আপনার প্লেব্যাক বেশি, নাকি?

খুরশীদ আলম : হ্যাঁ। সাবিনা হচ্ছে, সুপার টেলেন্টেড শিল্পী। একবার হইলো কী বিদেশে আমরা গেছি। সবাই সবার গান নিয়ে গেছে। মেকআপ রুমে  চায়না একটা মেয়ে, গুনগুন করে গান গাইছিলো। ওদের দেশের গান। সাবিনা মেকআপ নিচ্ছিলো। বললো, এটা কী গান? মেয়েটি বললো, ফোক গান এটা আমাদের দেশের জনপ্রিয় একটি গান। সাবিনা বললো এইটা লিখে দাও। সেখানে থাকা ইন্টারপ্রেটার সব বললো। ওটা তখনই বাংলায় লিখে, সাবিনা স্টেজে পারফর্ম করলো! এইটা সবাই পারে? সাবিনা ইয়াসমিন মারাত্মক মেধাবী শিল্পী।

মাসিদ রণ : সে সময় প্লেব্যাকে সুপারস্টার কণ্ঠশিল্পী কে কে ছিলেন?

খুরশীদ আলম : সে সময় সুপারডুপার শিল্পী ছিলেন মাহমুদুন্নবী, খন্দকার ফারুক, বশীর আহমেদ, আব্দুল জব্বার, সৈয়দ আব্দুল হাদী, আনোয়ার উদ্দীন খান। এরা সবাই আমার সিনিয়র। সমসাময়িক ছিলেন প্রবাল চৌধুরী। এরপর আসলো সুবীর নন্দী, এন্ড্রু কিশোর। সে সময় মেধা ও যোগ্যতার একটা প্রতিযোগিতা ছিলো। কারও সঙ্গে কারও দ্বন্দ্ব ছিলো না।

তাপস রায়হান : আপনাদের সময় সুরকার, গীতিকার এবং কণ্ঠশিল্পীর মধ্যে একটা শক্ত বন্ধন ছিল, এখন তা নেই। হঠাৎ করে কী এমন হলো?

খুরশীদ আলম : এইটা হঠাৎ করে হয় নাই। আসলে যার যে জায়গায় থাকা উচিত, সে সেই জায়গায় নাই। যে খেলার ছেলে, সে আসতেছে গানে। আর যে সত্যিকারের শিল্পী, সে নেই। অভিমান হোক, ক্ষোভ হোক বা যে কারণেই হোক অনেকেই বিদেশ চলে গেছে। আমার এখন বয়স ৭৭। আমি বিশ্বাস করি, মেধাবীকেই প্রথম জায়গা দেওয়া উচিত। আর কিছু বললাম না, বুইঝা লন।

মাসিদ রণ : বর্তমানে গান যেভাবে রেকর্ডিং হচ্ছে, এর সঙ্গে আপনাদের সময়ের তো কোনো মিল নেই?

খুরশীদ আলম : এখন তো প্রিন্সিপাল, ভাইস প্রিন্সিপালের ঠিক নাই। কোনো শিক্ষকতা নাই। আমরা যখন গান করতাম তখন যে কতোবার উচ্চারণ ঠিক করতে হইছে, তার হিসাব নাই।

মোহসিনা লাইজু : আপনার কাছে, বিটিভির গল্পটা শুনতে চাই?

খুরশীদ আলম : এর আগে আপনাকে যেতে হবে। ডিআইটি বিল্ডিংয়ে, সেই পাকিস্তান আমলে টেলিভিশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জামিলুর রেজা চৌধুরী, কলিম শরাফী, কাইয়ুম চৌধুরী, মোস্তফা মনোয়ার, ড. মো. ইউনূস, ড. মিজানুর রহমান শেলীর মতোন মানুষ। মেধা যখন একটা শিল্পে থাকে, তার বিকাশ তো হবেই। তখন তারা শুধু দিতেন, আর এখন নেওয়া হয়। পুরোপুরি রিভার্স। তখন কিন্তু আলাদা আলাদা রুম ছিলো না। একটা অনুষ্ঠান প্রচারিত হওয়ার পর, সবাই মতামত দিতেন। পরামর্শ দিতেন। রামপুরায় আসার পর, যেই শুরু হলো আলাদা রুম তখন আর মেধার কোনো মূল্য থাকলো না। শিল্পীদের মূল সমস্যা হচ্ছে তাদের কোনো সংগঠন নাই।

মোহসিনা লাইজু : বর্তমানে সিনেমা নিয়ে কিছু বলবেন?

খুরশীদ আলম : এখন সবকিছু আমি একা করতে চাই।

নাজমুস সাকিব রহমান : আপনি তো অনেকের লিপে গান গেয়েছেন। কিন্তু রাজ্জাক কেন আলাদা হয়ে যায়?

খুরশীদ আলম : সেটা আপনারাই বলেন? হাহাহা 

লিটু হাসান : আপনি যখন গাইলেন ‘চুমকি চলেছে একা পথে’ তখন তো আপনি সুপারহিট। রাস্তায় কেউ কিছু বলত?

খুরশীদ আলম : অনেক সমস্যা হইতো। তবে এনজয় করতাম। 

তাপস রায়হান : আপনার অপ্রাপ্তি নিয়ে কিছু বলবেন? নাকি সন্তুষ্ট? 

খুরশীদ আলম : সন্তুষ্টি তো নিজের কাছে। জীবনে অনেক অপ্রাপ্তি আছে। তবু আমি সন্তুষ্ট। শুধু একটা চিন্তা হয়, আমার বাড়িঘর নাই। আর কিছু না। তবু ভালো আছি, অনেক ভালো।

আড্ডা শেষ হতে চলল। এরপর তিনি বললেন একটা জিনিস মনে রাখা দরকার, লক্ষ্মী আর সরস্বতী একসঙ্গে থাকে না। আমার শুধু আল্লাহর কাছে চাওয়া, যতদিন বেঁচে আছি তাল, লয়, সুরে যেন গান করতে পারি। মানুষের ভালোবাসা হারাতে চাই না।

এরপর স্টুডিও থেকে বের হলেন। বললেন তোমাদের সম্পাদকের রুমে চলো। সেখানে আরেক পশলা আড্ডা হলো। এরপর অনেকের সঙ্গে সেলফি। তখন সন্ধ্যা ৬টা। যাওয়ার বেলায় বললেন আবার দেখা হবে। যদি বেঁচে থাকি। যাই...!

উশকোখুশকো চুলে, সাধারণ পোশাকে একসময়ের সাড়া জাগানো কণ্ঠশিল্পী খুরশীদ আলম মুচকি হেসে বিদায় নিলেন। একটু পর, হাঁটতে হাঁটতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। আবার নীরবে হাসলেন। বিদায় জানালেন হাত নাড়িয়ে। ততক্ষণে লিফট এসে গেছে। সব আড্ডাবাজ তার সঙ্গে। ঘড়িতে শব্দ হলো ঢং ঢং ঢং । লক্ষ করলাম, রাত তখন ঠিক ৮টা।